ডিভোর্স

সোহা ফারাহঃ

ডিভোর্স শব্দটা আজকের সমাজে খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক বিষয়। সব শ্রেণীর সমাজেই ব্যপারটাকে আজকাল সহজভাবে নেওয়া হয়ে থাকে।

কিন্তু ধর্মীয় সমাজটির মধ্যে এই বিষয়টা কেন যেন মানুষ বাঁকা চোখে দেখতে পছন্দ করে! সেখানে ডিভোর্সের মতো কিছু হলে কানাঘুষার শেষ থাকেনা!
ওমা দাড়িওয়ালা হুজুর.. সেও নাকি বৌ ছেড়ে দেয়..! বোরখাওয়ালী মহিলা.. সে কেমনে জামাই ছেড়ে আসে.. ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কথাবার্তার ফুলঝুরি ভেসে বেড়ায়!

আন-নূরের পরিবার মারাত্মক অর্থে গোড়া, ধর্মপ্রাণ। ওর বাবা চাচারা কট্টরভাবে রক্ষণশীল মনোভাবের।
আন-নূরের বিয়ে হয় তাদের ফ্যামিলী স্টেটাসের সাথে মিলে যায় এমনই কারো সাথে।
কিন্তু বাইরের জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞাত, শুধুমাত্র অন্দরমহলে বড়ো হওয়া, সেখানেই মহিলা শিক্ষক দ্বারা অল্পস্বল্প বিদ্যার্জন করে থাকা, কঠিন পর্দানশীন এই মেয়েটির সংসার জীবনে দেখা যাচ্ছিল বনিবনার অভাব। শুধুমাত্র পরকাল মুখী, দুনিয়া বিমুখ তার দাড়িওয়ালা পবিত্র চেহারার লম্বা জুব্বাধারী স্বামীও হাঁপিয়ে উঠছিল তাদের বিবাহিত জীবনে!
তারা এমনিতে দুজনেই খুব ভাল। কিন্তু নিজেদের ভেতর দোষ বা স্বভাবের কারণে বা যে কোনও কারনে আপোষ হয়ে উঠেনা! মুরুব্বী কুল গত দু বছরে মধ্যস্থতা করে দিতে দিতে এক পর্যায়ে নিশ্চুপ হয়ে যেতে বাধ্য হন। ফলাফল ডিভোর্স।
কিন্তু আন-নূর বাপের ঘরে ফিরেই একঘরে হয়ে পরে! আত্মীয় স্বজন বা আশেপাশের সবারই কেবল এক কথা, এমন পরিবারে ডিভোর্স কেমনে হয়! এমন পর্দানশীন মেয়ে স্বামীর ভাত খেতে না পারার কারণ কি!
সেকেন্ড বিয়ে না হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়গুলো আন-নূর মানুষের কথা ও বাঁকাদৃষ্টির যন্ত্রণায় ছটফট করেছিল শুধু!

এমনই আরেকজন তোহফা। কওমি মাদ্রাসার মহিলা শাখা থেকে মাওলানা। মাদ্রাসার শিক্ষিকাও সে। তার পুরো পরিবারের সবাই কেউ হাফেজ, মাওলানা বা মুফতি। খুব সাধাসিধে জীবন যাপনকারী পরহেজগার বাবা অত্যান্ত ভালো মানুষ। তাঁর সব সন্তানকে ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন কেবল। তাদের পরিবারে ধর্মকর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে পথ চলা হয়ে থাকে।
সেই তোহফাই সংসার জীবনে তার অতি পরহেজগার, ধর্মীয় পন্ডিত স্বামীর ঘরে নানা কারনে অশান্তিতে ভুগে। মন- মানসিকতায় মিলেনা কারও। তোহফার বাবার পরিবারে লৌকিকতা, রসম- রেওয়াজকে বড় করে দেখা হয়না। কিন্তু শশুড় পরিবার এগুলোর গুরুত্ব রাখে। স্বামী বেচারারও চেষ্টার অন্ত ছিলনা দুই পরিবারে সমঝোতা আনতে। তোহফা সব সময় শশুড় বাড়ির লোকজনের কথায় অপমানিত বোধ করতে থাকে। এভাবে একসময় সম্পর্কটা ডিভোর্সে গড়িয়ে ক্ষান্ত হয়!
তোহফা বাবার ঘরে ফিরে আসলে পাড়াপড়শির ভেতর সেই একই গুঞ্জন, এতই ইসলামি জ্ঞান.. তবুও তো ধৈর্য ধরে স্বামীর সংসার করতে পারলনা। মানিয়ে নিতে পারলনা সামান্য কথাবার্তার সাথে! কেমন হুজুরনি সে মাদ্রাসার!!
অপমান থেকে বাঁচতে ফিরে আসলেও অপমান যেন তার আর পিছু ছাড়েনি। যে ক’দিন বাবার ঘরে ছিল সে, এমন সব লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে মনোকষ্টে তার দিনগুলো কেটেছে।

এবার বলি উমায়রার কথা। এতটাই কঠোর ইসলামি পরিবার তাদের, উমায়রাদের পাঁচ বোনের  কাউকেই ছয় বছর বয়সের পর কোন বেগানা পুরুষ মানুষ দেখতে পায়নি। এত লক্ষী মেয়েগুলো, যে কেউ তাদের প্রতি মুগ্ধ না হয়ে পারেনা। সব কিছুতেই তারা ঘরমুখী। বাহিরের জগৎ বা বাহিরের মানুষ সম্পর্কে তারা খুব স্বল্প মাত্রই জানে। বাসার ভেতরে থেকে তারা তার বাবার নিকট যা পড়ালেখা শিখেছে। তাদের পরিবারেও দুনিয়াদারীকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয়। অল্প বয়সে উমায়রাদের পরিবারে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার নিয়ম। সে হিসেবে উমায়রা স্বামীর ঘরে পা রাখে একেবারেই বালিকা বয়সে।
বিশাল পরিবার, ডজন খানেক ছোট ছোট দেবর, ননদ। পরিবারের বড় বউ হয়ে এসেছে সে। শশুড়- শাশুড়ী, স্বামী সহ পরিবারের সকলেরই যত্নআত্তির ব্যাপারে সদা সচেষ্ট থাকতে হয়। দিনরাত কাজকর্মের চাপে পিষ্ট হলেও ছোট্ট এই বালিকাটির মুখে সবসময়ই হাসি লেগে থাকে।
এতকিছু করেও তার কপালে সুখ আসেনা! জায়গায় জায়গায় দামী গাড়ি হাঁকিয়ে গিয়ে ধর্মীয় ওয়াজ- নসিহত করে ফেরা ব্রিলিয়ান্ট স্বামী আবার বিয়ে করে!
উমায়রার কেলে তখন ছোট্ট ছয় মাসের বাচ্চা। তার কেবল মনে হতে থাকে, সে বোধকরি বাসায় কাজের ঝিয়ের মতো কেউ একজন। একবুক কষ্ট নিয়ে বাচ্চা কোলে ফিরে আসতে বাধ্য হয় বাবা মা’র কাছে। দু পরিবারে শুরু হয় দরকষাকষি।
সম্পর্কের ভাঙনে বাচ্চাটি হয়ে থাকে টলোমলো দেয়াল। মেয়ের মনের অবস্থা দেখে মা তাকে বাচ্চা সহ দুরে গ্রামে নানার বাড়ি পাঠিয়ে দেন। মাঘের কনকনে শীতের রাতে বাচ্চাটার সেখানে হঠাৎ অস্বাভাবিক ডায়রিয়া শুরু হয়। বাচ্চাটা চলে যায় চিরতরে, তিক্ত সম্পর্কের স্রোত সময়ের পথ যেন নষ্ট না করতে পারে সে ব্যবস্থা করে।
এত স্বাদের স্বামী, সংসার, সন্তান হারিয়ে উমায়রা উদভ্রান্তের মতো।
তবুও মানুষ ফিসফাস করতে ভালবাসে। জীবনেও কোন পুরুষ মানুষ দেখেনি এমন মেয়ে কত ঘাটের পানি খায়! উমায়রার চোখের জল দেখলে যে কারোই ভেতরটা আর্দ্র হতে বাধ্য। কিন্তু পাষণ্ড সমাজ তাকে নিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেয় হাসিই হাসতে থাকে কেবল!!

উপরের তিনটি ঘটনাই সত্য। খুব কাছ থেকে দেখা আমার।
সর্বক্ষেত্রে না হলেও অনেকাংশেই সম্পর্কে ডিভোর্স অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। এটা নিতান্তই নিয়তি। এরজন্য কাউকে দোষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা উচিৎ নয়।
ধর্মীয় পরিবারের মেয়েরা বৈবাহিক জীবনে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতেই পারে। এজন্য তাদের খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
স্বামী স্ত্রীর মাঝে সাধারণ কারণে ভাঙন অবশ্যই ভালো কিছু নয়। এটা সব শ্রেণী, সব সমাজ ও সব ধর্মের জন্যই। কিন্তু একান্ত প্রয়োজনীয়তায় অপারগ ক্ষেত্রে ডিভোর্সের অপশন আছে।
ধর্মীয় পরিবারগুলোতে ডিভোর্স হতে পারেনা, তালাক এমনই নোংরা ব্যাপার! তাদের সবকিছুতে মুখ বুজে হাসিমুখে থাকতে হবে। সর্বাবস্থায় লোকজনের সামনে তাদের পজিটিভ থাকতে হবে, এরকম চিন্তাভাবনা মনে আনাটাই ভুল।
তারাও মানুষ। তাদেরও সুবিধা অসুবিধা থাকতে পারে।
আমরা একটু ইসলামের স্বর্ণযুগের দিকে ফিরে তাকালেই দেখতে পাব, সাহাবা (রাঃ) দের ভেতরেও কিন্তু তালাক হয়েছিল। অথচ তাঁদের দ্বীনদারির মধ্যে কি সন্দেহের অবকাশ আছে?
এমনকি রাসূল (সাঃ) ও একজন উম্মুল মু’মিনীনকে তালাক দেবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন।
এতে কি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয় না পুরুষ কিম্বা মহিলা দ্বীনদার হওয়ার পরও ডিভোর্স হতে পারে। দ্বীনদার হলে ডিভোর্স হতে পারেনা অথবা ডিভোর্স হলে দ্বীনদার থাকেনা এরকম চিন্তাচেতনা মূর্খতা বৈ কিছু নয়।

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন