সমাজের হাজারো আহমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ

সরকার আফরিন জাহান

আমার মায়ের স্বামী আমাকে মোটেও ভালোবাসে না। মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করলেই কেবল মায়ের স্বামীর বাড়ী যাই । আমার মায়ের স্বামী আমার সাথে একটু কথাও বলেন না; আমাকে ভুল করেও কোনোদিন জিজ্ঞেস করে না ” আহমাদ কখন এসোছো ?”

আমার বাবা – দাদারা উচ্চ শিক্ষিত ,অঢেল সম্পদের মালিক; গ্রামের নামকরা মানুষ।
আমার বাবা আগে আরেকটি বিয়ে করেছিলেন;তার সেই স্ত্রী এতটাই রূপবতী ছিলেন! যার প্রশংসা করলেও কম হবে ! রূপের সৌন্দর্য চরিত্রের কলুষতায় হার মেনে যেতে মাস খানেক ও লাগেনি । বাবার ঐ স্ত্রী পূর্ব পরিচিত ছেলের সাথে পালিয়ে যায় !

আমার মা তখন অনিন্দ্য সুন্দরী; গুণবতী; একজন ষোড়শী যুবতী ।
মার সাথে বাবার বিয়ের কথা হয়; মা ,যখন শুনতে পেল পাত্রের আগে একটা ব‌উ চলে গেছে;
” আমাকে গরীব ঘরে প্রয়োজনে রিক্সা চালকের কাছে বিয়ে দাও,তবু একবার বিয়ে করেছে এমন পাত্রের ঘরে দিওনা” বলে
নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিল ।
অপরদিকে মাকে যে ছেলেটি পছন্দ করত সে বেকার বিয়ে করার যোগ্যতা নাকি নেই! তাই নিরুদ্দেশ; নানাজি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল ; ছেলের বাবা দায়িত্ব নেবে না।

একদিকে নানাজি ভীষণ রেগে আছে অপরদিকে আমার বাবার অঢেল সম্পদ,উচ্চ শিক্ষিত ; বাবা আর তার একটি বোন; বোনটির স্বামী সেনাবাহিনী তে উচ্চ পদে আছে ।
নানাজি এমন পাত্র হাত ছাড়া করলো না ; আজকাল মেয়েদের পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব আছে!
বাবার সাথে মার শেষ পর্যন্ত নিকাহ হয়েই গেলো ।

দিন কয়েক যেতে না যেতেই সমস্যার উদয় হলো ” হেড কোয়ার্টারে” দু’জনের মনের মিল হয় না ।
আমার মা ফুরফুরে মেজাজের ,নরম মনের, সৌখিন মানুষ !
অপরদিকে বাবা হাড় কিপ্টা!
আমার দাদা আরো……
পোশাকের অভাব দেয় না কিন্তু পনের দিনে একদিনও বাজার থেকে বড় মাছ; গরুর মাংস কেনে না । আমার মায়ের খাদ্যাভ্যাস ও বাবার খাদ্যাভ্যাসের ফারাক আসমান – জমিন ।
মা একটু আহলাদি; বাবা গোমড়া স্বভাবের !
আমার মা নতুন ব‌উ ; যেহেতু বাবার আগের একটি ব‌উ চলে গেছে; সেইজন্য হলেও একটু আধটু সহানুভূতি বেশি করার কথা ছিল কিন্তু হয়েছে উল্টো।মাকে কখনো কিছু কিনে এনে দিবে তো ছাই! যদি এক প্যাকেট চানাচুর আনে! আমার মায়ের সামনে বসে পুরো প্যাকেট একাই সাবাড় করে ; মাকে একটু সাধেও না !

বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর মা ও বাবাকে দাদা আলাদা করে দেন। দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো ছিলো না; কথা কাটাকাটি হতো । আমার নানা শুনতে পেয়ে ; মা যখন নানা বাড়ী বেড়াতে আসলো; মাকে আর তার শশুর বাড়ী যেতে দেয়া হয় না ।বাবা আসলে নানা আমার দাদাকে এসে নিয়ে যেতে বলে; বাবার কাছে মাকে ছেড়ে দিবে না ।
পরপর বাবা কয়েক দিন আসার পর ,বাবা ও নানার সাথে বাকবিতন্ডা হয় এবং অনেক দূর গড়ায়…..
এদিকে আমি আম্মুর পেটে চলে এসেছি!
সম্পর্ক মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায়…
উভয় পক্ষের লোক জেল হাজত খাটে……

আমার মা সারাদিন নানার বাড়ি কাজ করে তবুও নানার মন ভরে না ।একটু পান থেকে চুন খসবে তো দূরের কথা !পানে চুন লেগে আছে দেখেও খারাপ আচরণ করত।
আমার মা এমন‌ই কাজ করতেন যে, যেদিন আমি জন্ম নেই সারাদিন ধানের মাড়াইয়ের কাজ করে ; রাতের খাবার রান্না করে; নানুকে শীতের সন্ধ্যায় গোসলের গরম পানি করে দিয়ে; আমার ছোট মামা খালাকে রাতের খাবার প্লেটে দিয়ে ; ওয়াশরুমে যায় ! ওয়াশরুমেই আমার জন্ম হয়।

আমার জন্মের পর বাবা বেশ কিছু দিন পর নতুন জামা কাপড় পাঠিয়েছেল কিন্তু খোঁজ নিতেন না । আমার জন্মের পর নানাজির ক্রমেই খারাপ আচরণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মা আমাকে নিয়ে নানাজির রান্নাঘরে আলাদা থাকা শুরু করে; ছোট একটি চাকরি নিয়ে ।
তবুও নানাজির আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে আমায় নিয়ে বাবার কাছে চলে যায় ।
মেয়েরা স্বামীর বাড়ী অবহেলিত হলে তার কপালে বাবার বাড়ী লাঞ্চনা ছাড়া কিইবা জোটে!
আর যদি হয় স্বামী পরিত্যক্তা! তবে তো কথাই নেই!

আমার দাদার বাড়ীর লোক এই সুবর্ণ সুযোগ হাতিয়ে নেয় ; আমার মায়ের মাধ্যমে মামলা তুলে নিলো। বাবা যেহেতু স্কুলে চাকরি করতেন; সেই সুবাদে সাথে করেই মাকে কর্মস্থলে নিয়ে গেলেন।
মা কর্মঠ মানুষ; চাকরি করতে চাইলেন।বাবা একটি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে দিলেন।
আমার মায়ের অনেক ভালো মানের বেতন আসতো,বাবা বেতনের টাকার খামটি নিয়ে নিতেন; পাঁচ হাজার টাকাও হাতে দিতেন না; সখের বশে খরচের জন্য !
অথচ ইসলাম নারীর উপার্জনের পুরোটাই নারীর বলেছেন।

মা বাবার প্রতি আবার অসন্তোষ হতে থাকলেন;
বাবা বেরসিক মানুষ; এ অভিমান বোঝেন না।

মাকে যে ছেলেটি আগে পছন্দ করতো,সে ছেলেটিকে তার বাবা মা নিকাহ করিয়েছে; মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।
ছেলেটি বিবাহিত জীবনের ছয় বছরে প্রায় কয়েক বার স্ত্রী তালাক দিয়েছে, তার বাবা আরেকদিকে ব‌উ বাড়ী তুলেছে ।

সে আবারো স্ত্রী তালাক দেয়; অপরদিকে আমার মায়ের সাথে নিকাহের যোগাযোগ করে ! তার বাবা মা নিয়ে এবার কোর্টের মাধ্যমে আমার মায়ের সাথে নিকাহ হয় ; বাবার সাথে তালাকের পর ।

আমি একটি সরকারী ইয়াতিমখানায় পড়ালেখা করি ! হ্যাঁ ইয়াতিমখানায় !
আমার বাবা আমার খোঁজ নেন না; দাদা দাদী ও না ।
আর নানাজি যেখানে আমার মায়ের সাথেই উত্তম আচরণকারী নয় ! সেখানে আমি কিভাবে উত্তম আচরণ পাবো! তার তো দায়িত্ব ও না।
মা মাঝে মাঝে গোপনে দু – চারশো টাকা দেয়; নতুন জামা নয়ত ভালো কিছু খেতে।
আমার খুব ইচ্ছে হয় মাকে জড়িয়ে ধরে একটি রাত ঘুমোতে!
বাবার হাত ধরে বেড়াতে….
আমি পারি না……
হয়তো নানী মারা গেলে আর নানা বাড়ীর কোনো অধিকারই থাকবে না ।

আমার চারপাশ সব সময় আঁধারে ঘেরা থাকে ; আমি কি পেলাম? না বাবার আদর! না মায়ের ভালোবাসা!
আচ্ছা; কেনো এ সমাজের মানুষ গুলো ” মেয়েদের অপছন্দের সত্ত্বেও জোর করে পাত্রস্থ করে”?
কেনো স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ফেসাদ  বাঁধলেই বাবা মা হস্তক্ষেপ করে সংসার ভেঙ্গে দেয়?
কেনো দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো না হলেই পরিবারকে জানাতে হয়?
কেনো সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই তালাক দেয় না?
আমি জবাব চাই।
আজ আমার মত অসংখ্য ছেলেমেয়ে সমাজের আনাচে কানাচে। আমাদের জীবনের এহেন পরিস্থিতিতে কি আপনাদের বোধোদয় হবে?
আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের মত অসহায় জীবনের পথে আপনাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিবেন না; মনে রাখবেন; আপনার সন্তানের দীর্ঘশ্বাস আপনাকে কখন‌ই সুখী হতে দিবে না; যেমনটি পারেনি আমার বাবা…….!

বিঃদ্রঃ আমার উপরিউক্ত লেখাটি আমার একান্ত কাছের ছোট্ট শিশুর জীবন থেকে নেয়া। আমার পাঠকদের প্রতি অনুরোধ ; আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার সন্তানের জন্য আপনি অভিশাপ হয়ে স্মরণীয় হবেন না ।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন