পেসমেকার

অলভ্য ঘোষ

ডলি সকাল থেকেই মুখ গোমরা করে বসে আছে।অতীনের ওর দিকে নজর দেওয়ার বিশেষ সুযোগ না থাকলেও;লোকচক্ষুর শিথিলতায় বৌয়ের অভিমানী হৃদয়ে প্রেমাক্রান্ত বাক্যের মলম লাগাবার চেষ্টা করেছে।কিন্তু প্রতিবারের মত সে চেষ্টা বিফলে গিয়েছে।ঘরে তৃতীয় কোন ব্যক্তির এসে পড়ায়!বাড়ি ভর্তি লোক।কাল বাবার থার্ড হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে।

ডঃ বোস বারবার বলেছিলেন;
– “এক্সাইটমেন্ট; আপনার বাবার পক্ষে ভালো নয়।”

বাবা মজা করে বলেছিলেন;
-ডাক্তারবাবু তাহলে আমাকে এমন একটা ঔষধ দিন; যাতে জড় পদার্থ হয়ে যাই।

অতীন কাল বৌয়ের কথা মতো বাবাকে বলতে গিয়েছিল তার পক্ষে এ বাড়িতে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।অফিসের কাছাকাছি সে একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে।

বাবা বলেছিলেন;
– আমার কি হবে?

অতীন তুতলিয়ে উচ্চারণ করেছিল;
-“আমি কি করি বলো, আজ ছ বছর তোমার ভরণপোষণ করে চলছি।

-ভার?

-সুধাতো বিয়ের পর এ বাড়ির চৌকাঠ পাড়ায় না। তাছাড়া আমি শখ করে যাচ্ছি না। কাজের খাতিরে যাচ্ছি।

-অতীন ভুলিস না পঁচিশ বছর শরীরের ঘাম রক্ত ঝরিয়ে তোদের শিক্ষিত করেছি।তারপর আরও পাঁচ বছর বেকারত্বের জ্বালা বুঝতে না দিয়ে বসিয়ে খাইয়েছি।সামান্য সঞ্চয়ের কটা পয়সা সুধার বিয়েতে খরচ করেছি।শুধু তোদের সুখী করার জন্য।হয়তো ঐ টাকা কয়টা থাকলে তোর মাকে ক্যান্সারের হাত থেকে আর কদিন বাঁচান যেত।

-দেখ বাবা যা করেছ বোনের জন্য আমার জন্য নয়; তাছাড়া সেটা তোমার কর্তব্য ছিল।

-বুড় বাবাকে দেখা কি ছেলের কর্তব্য নয় ?

-দেখবো না এ কথা তোমাকে কে বলল?তোমার জন্য রাজার হাটে একটা ভালো বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা করেছি।
ওখানে গেলে সমবয়সী আরও দু চার জনকে পাবে। সময় কেটে যাবে বেশ।আমি ভেবে দেখলাম এ বাড়ী বিক্রি করলে যা টাকা পাওয়া যাবে তাদিয়ে তোমার আশ্রমের খরচ বাবদ রেখে বাকীটা তোমার হবু নাতী র জন্য ফিক্সড ডিপোজিট করে দেবো। অবশ্য সুধা যদি ভাগ বসায় সেটা অন্য ব্যাপার।

-তোর মায়ের স্মৃতিটুকু বেচে দিবি।

-আজকাল ঐ সব মিথ্যে সেন্টিমেন্টের কোন দাম নেই। নিজে বাঁচলে বাপের নাম।

-ঠিক বলেছিস অতীন। আমার এ কথাটা বুঝতে এত দেরি হল কেন বলতো! বত্রিশ বছর আগে আমি যদি বুঝতে পারতাম;আমাকে আমার হৃদয়ের স্পন্দন এই সন্তানদের ছেড়ে বাঁচতে হবে তাহলে বুকের ওপর পাথর চাপিয়ে নিতাম।

সত্যিই পাথরটা বুকের ওপর পড়লো।বুকের কাছের পাঞ্জাবীটা মুঠো করে চেপে ধরে আর্তনাদ করে চেয়ার থেকে নিচে পড়ে যায় বাবা।তারপর অ্যাম্বুলেন্সে পি জি হসপিটাল।

মোবাইল বেজে উঠল;
-মিস্টার চৌধুরী টাকাটা কি জোগাড় হয়েছে?
-আজ্ঞে হ্যাঁ।
-পেসমেকার না বসালে যখন তখন হার্ট অকেজো হয়েয়েতে পারে।ভাল্ব গুলো একেবারে দুর্বল হয়ে গিয়েছে।

ডলির এ ব্যাপারে যত রাগ; নতুন গৃহের ফার্নিচারের জন্য যে টাকাগুলো সে গত পরশু ব্যাংক থেকে তুলে এনেছে।সেই টাকায় শ্বশুরের পেসমেকার বসবে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।মোবাইল রেখে দরজা বন্ধ করে অতীন!

-ডলি রাগ করো না। দাও লকার থেকে টাকাটা বের করে দাও। বাবার অবস্থা খুব সিরিয়াস।

ডলি চিৎকার করে;
-না আমি ওই টাকা দেবো না।

-কি ছেলেমানুষি করছ; পিসিমা, মামা সকলে এসেছেন।বাড়ি ভর্তি লোক।

ডলি আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে।
-ঐ বুড়োটার জন্য আমি এক পয়সাও দেব না; কি দিয়েছে বুড়টা তোমায়।চাকরিটা আমার বাবার সুপারিশে পাওয়া ভুলে যেও না।

অতীন ডলিকে ঝাঁকিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে বিছানার ওপর।ডলি কাতারাতে থাকে; সে যে সন্তান সম্ভবা, মুহূর্তের জন্য অতীন প্রায় ভুলে বসেছিল।আবার এ্যাম্বুলেন্স তবে এবার সরকারি হাসপাতাল নয় নার্সিং হোম।

শ্বশুর-মশাই অতীনের জামার কলার চেপে ধরে;
-আমার মেয়ের যদি কিছু হয় তোমাকে হাজত বাস করিয়ে ছাড়বো।

ওটি রুমের থেকে ডাক্তার বেরিয়ে জানালো;
– আপনার ছেলে হয়েছে। মা ছেলে দুজনেই ভালো আছেন।

সাথে সাথে মোবাইলটা বহু পরিচিত কনসার্ট করে আবার বেজে উঠল-
-হ্যালো!
-মিস্টার চৌধুরী; আই এম সরি।

কানের সামনে সে যেন টিক—টিক…. টিক পেসমেকারের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।সেটা কি সময়ের যন্ত্র না হৃদয়ের বুঝে ওঠার আগেই স্তব্ধ হয়ে যায় অতীন। শব্দটা থেমে গেল নবজাত এক শিশুর কান্নার আওয়াজে।

একদিকে বাহাত্তর বছরের আবর্ত সঙ্কুল নিভে যাওয়া প্রাণ, আর একদিকে প্রদীপ শিখার মত বিশুদ্ধ ঝরনার মতো উচ্ছল নব প্রাণের আবির্ভাব।তুলোয় মোড়া নবজাতক কে নার্স নিয়ে এলো অতীনের কাছে। অতীন দুহাতে তাকে বুকের কাছে চেপে ধরে! অতীনের বুক কাঁপতে থাকে। এও যেন একটা ছোট্ট পেসমেকার যন্ত্র।অতীনের হৃদপিণ্ড তার হৃৎস্পন্দন।কিন্তু এই হৃদপিণ্ডটা কে যদি কেউ কখনও তার বুকের থেকে উপড়িয়ে নেয়।অতীনের দুচোখ বেয়ে জল এলো। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন চলল বেড়ে।

লেখকঃ ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন