বাবার স্মৃতি !!!

মোসা: নাছরিন সুলতানা

আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বা একমাত্র পুরুষ যার বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই! সন্তানের কাছে সব বাবায় হয়ত এমন তবুও আমি বলব আমার বাবায় শ্রেষ্ঠ !! কারণ আমি তো শুধু আমার বাবার গল্প জানি! ছোটবেলা থেকেই আমি ছেলেদের খুব অপছন্দ করতাম শুধু আমার বাবাকে ছাড়া! যাকেই আমি একটু ভাল বলে মনে করতাম কিছু দিন গেলেই দেখতাম সে এমন একটা কাজ করত যার ফলে ঘৃণা চলে আসত তার প্রতি ! আর সব পুরুষের সাথে আমার বাবাকে তুলনা করতাম তাই আরো মনে হতো আমার বাবায় ভাল । কারণ আমি দেখতাম গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষেরা তাদের বৌদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার আর মানসিক নির্যাতন করত! যা কোনদিন আমার বাবার মধ্যে দেখিনি।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়টা ছিল অনেকগুলো বাড়ির মাঝখানে । তাই স্কুলে যেতে আসতে শুধু মহিলাদের কান্না শুনতাম! আর যখন কাছে গিয়ে জানতাম তখন শুনতাম তাদের স্বামী মেরেছে । কারণগুলো থাকতো খুব সামান্য ।  যেমন সময় মতো ভাত রান্না হয়নি, বা তরকারিতে লবণ বেশি কেন? বাচ্চা কান্না করে কেন? ইত্যাদি কারণে! ছোট বেলা শুধু একটাই স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে শুধু ছেলেদের মারব, ক্যারাটি শিখব! ঔ সকল চাচী, ভাবি, বোনদের প্রতিশোধ নিব। আর আমার এসকল রাগ ক্ষোভের ঐষধ ছিল আমার বাবা! যখন যেখানে এমন দেখতাম মানতে পারতাম না গজগজ করতে করতে বাড়ি এসে আব্বাকে বলতাম এ এটা করছে, ও ওটা করছে । এটা ঠিক না; ওটা ঠিক না ইত্যাদি ইত্যাদি । আব্বা আমাকে বুক জড়িয়ে ধরে শান্ত করতেন আর বলতেন- এসব দেখে শিখেই বড় হতে হবে রে মা এবং বড় হলে সব প্রোটেস্ট করতে পারবে!

কিন্তু অন্যজনেরটা কিছুটা মানতে পারলেও আমার বোনদের কেউ কিছু বললে আর রক্ষা নেই! সাথে সাথে মাইর আশে পাশের চাচাতো ভাইরা মাঝে মাঝে একটু দুষ্টুমি করতো আর আমার মাইর খেত! হয়তো আমি রেগে যেতাম বলে ওরা আরো রাগাতো! আব্বা যখন ওদের বলত কেন ওকে রাগাও তোমরা? ওরা বলত ওর মাইর খেতে মজা লাগে কাকা! এগুলো ওদের কাছে মজা হলেও আমার কাছে মজা ছিল না মোটেও, প্রচণ্ড ক্ষোভ থাকত আমার ভিতরে!

আমার এক ফুফাতো ভাই আমাকে বৌ বলে ডাকতো, খুব বিরক্ত করতো আমায় আমি তাকে পেলেই মারতাম, একদিন স্কুল থেকে শুধু বাড়ি এসেছি, সে আমাদের ঘরেই ছিল কি যেন একটা বলল আর আমার মাথা গেল গরম হয়ে, ঘরের দরজার পিছনে ছিল একটা লাঠি আর তা দিয়েই তার মাথায় দিলাম বাড়ি!তার মাথা ফেটে সে কি রক্ত আমি তো মাথা ফাটিয়েই দৌড়!!! পরে তার তিনটা সেলাই লেগেছে! সে যখন বাড়ি গেল ফুফু দেখেতো রেগে আগুন, রাগে কিটমিট করতে করতে আমাদের বাড়িতে এসেছিল । আব্বা টের পেয়ে আমাকে ধানের জাবারে লুকিয়ে রেখেছিল! ফুফুও একটা লাঠি নিয়ে এসেছে আমার মাথা ফাটাবে তাব । আমার এতো বড় সাহস তার ছেলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি! যাই হোক পরে আব্বা তাকে বুঝালেন তার এতো বড় ছেলে কেন তার ছোট মেয়েটাকে রাগায় ইচ্ছা করে; সেজন্য এমনটা হয়েছে । পরে আমাকে বুঝাবে ।

এখন রাগ কমাও । ওকি বসে আছে তোমার জন্য যে ওর মাথা ফাটাবা সারাদিন খুঁজেও তুমি ওকে পাবানা! পরে তাকে চা পান খাইয়ে বিদায় করেছে!

সেদিন বিকালে বাবা আমাকে মাঠে নিয়ে যায় এবং খেত নিরাতে নিরাতে আমাকে বুঝায় মা এগুলো শুধু দুষ্টুমি । ওরা তোর চেয়ে অনেক বড় । তুই একদিন পড়াশোনা করে অনেক বড় হয়ে যাবি। ততোদিনে এরা বিয়ে শাদী করে বাচ্চা কাচ্চা হয়ে যাবে! তোর মাইরে ওদের কষ্ট হয় কাউকে কি কষ্ট দেওয়া ঠিক, বল? তোর না অন্যজনের কষ্ট দেখলে কষ্ট হয়  । তাহলে ওদের কষ্ট দিস কেন? সেদিন বাবাকে বুঝাতে পারিনি যে ওরা আমার সাথে দুষ্টুমি না করলে তো আমি মারতাম না! কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম এটা ঠিক না । আর কোনদিন মারিনি ওদের, ভাইয়া আসলেই আমি সামনে থেকে চলে যেতাম বা লুকিয়ে থাকতাম যেন কিছু বলতে না পারে!

বাবা ছিল আমার ছায়া, সব বিপদের সঙ্গী ! আমাদের একটা পাগলা গরু ছিল সেটা ছুটে গেলে সামলানো খুব কঠিন ছিল । আম্মা প্রায়ই বলত আব্বাকে ওটা বিক্রি করে দিতে । আব্বা ছাড়া কেউ সামলাতে পারত না! একদিন আব্বা ঘরের চালের উপর উঠে ছিম গাছে ঐষধ দিচ্ছিল । আমি উঠানে খেলা করছিলাম সবার সাথে । হঠাৎ গরুটা ছুটে যায় । একটা গর্জন দিতেই সবাই দৌড়ে পালায় ।আমি ছোট বলে বুঝতেও পারিন, পালাতেও পারিনি । গরুটা এসেই আমাকে তার সিং এ তুলে ঘুরা‌তে লাগল । আমার মা এটা দেখেই এক চিৎকারে ফিট হয়ে গেল। আব্বা ঘরের চাল থেকে একলাফে সুপারম্যান এর মতো নেমে আমাকে কোলে তোলে নিল যখন গরুটা ফেলে দিচ্ছিল! নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করল। কিন্তু সেই ভয়ে আমার এমন জ্বর আসলো আর কমানো যাচ্ছিল না । তখন বাবা রাগ করে গরুটা বিক্রি করে দিল! একমাস পর আমার জ্বর ভাল হলো!

ছোট বেলায় আমি ছিলাম খুব ডানপিটে নদী-নালা, খাল-বিল, বন-জঙ্গল এমন কোন জায়গা নেই যেখানে খেলা করতে যেতাম না! এসব জায়গায় খেলতে গিয়ে কখন যে সাপকে ব্যাথা দিতাম জানি না! সাপকে ব্যাথা দিলে সাপ কিন্তু প্রতিশোধ নিতে আসতো, জানেন কি? দিনে যদি কোন কারণে কেউ ব্যাথা দিয়ে থাকে রাতে তার গন্ধ শুকেশুকে চলে আসত কামড় দিতে! একদিন আব্বা মাগরিবের নামাজ পড়ছে আর আমি নামাজের বিছানায় বসে বসে আব্বার সাথে নামাজ পড়তাম । আব্বা নামাজ শেষ মোনাজাতের সময় আমাকে সামনে বসিয়ে নিতো, আব্বা মোনাজাত করতে করতে হঠাৎ আমাকে ছো মেরে লাফদিয়ে খাটে উঠে গেল আমি কিছু বুঝার আগেই! এরপর অনেক কষ্ট করে আব্বা সাপটিকে মারল! সাধারণত আব্বা চোখ বন্ধ করেই মুনাজাত করতো । আমি ও চোখ বন্ধ করে আব্বাড় সাথে মোনাজাত ধরতাম । তাই আমি কিছুই দেখতে পাইনি । কিন্তু আব্বা বলল সাপের হাটার নাকি একটা শব্দ হয় । আব্বা চোখ বন্ধ থাকলেও শব্দটা পেয়ে চোখ খুলে দেখে সাপ ছোবল দেওয়া জন্য পোজ নিচ্ছে! আর তখনই আমাকে সরিয়ে ফেলল! আসলে বাবারা কতকিছু জানে তাই না! এমন অনেক দিন সাপের হাত থেকে রক্ষা করে পরে কোন এক খুজুরের কাছ থেকে সাপের বান দিয়ে আমাকে তাবিজ দিয়ে রাখে। আস্তে আস্তে বড় হই আর দুষ্টুমিও কমে যায় । সাপের হাত থেকেও রক্ষা পাই!

আব্বা প্রায় সময় খুব সকালে পুকুরে বা খালে মাছ ধরতে যেত  । আর আমি যেতে চাইতাম মাছের ডুলাটা রাখতে । কিন্তু আম্মা সাপের ভয়ে দিতে চাইত না  । কিন্তু আব্বা, আম্মাকে ঘুমে রেখে আমাকে চুপ করে তুলে নিয়ে বের হয়ে যেত! আর আমার বিশ্বাস ছিল, আব্বা থাকতে আমার কিছু হবে না! পরে ফিরে আসলে যখন আম্মা রাগ করতো ।  আব্বা বলত- ওকে নিলে বেশি মাছ পাওয়া যায় । আল্লাহ বরকত দেয়! আম্মা পরে হাসত! মাছ ধরতে গেলে আব্বা বলত চুপচাপ খালের পাড় বসে থাকবি, নড়াচড়া করবি না! আমি যেহেতু ছোট সাঁতার জানি না, তাই পড়ে গেলে উঠতে পারব না! কে শুনে কার কথা । আব্বা যখন জাল টানতো আর মাছ দেখা যেত খুশিতে লাফাতে লাফাতে পানিতে পড়ে যেতাম । আর আব্বায় ওঠাতো ।  আর এভাবে দুই-তিন দিন পড়ার পর আব্বা আমাকে সাঁতার শিখালো ।  আম্মা বলতো এতো ছোট মানুষকে কেন সাঁতার শিখাচ্ছ? আম্মা সাঁতার পারতো না বলে ভয় পেতো । যদি ডুবে যাই ! আর আব্বা বলতো তোমার বাবাতো তোমাকে সাঁতার শিখায় নাই তাই এখনো ভয় পাও । তাই আমি আমার মেয়েকে আগেই শিখিয়ে রাখি । যাতে পরে ভয় পেতে না হয়! আম্মা অনেকপরে জেনেছে যে আমি তিন দিন পানিতে পড়েছি বলে বাবা তাড়াতাড়ি সাঁতার শিখিয়েছে আমার আত্ম রক্ষার জন্য! পরে অবশ্য এতে খুব সুবিধা হয়েছে আমার । যদি কখনো স্কুলে যেতে ইচ্ছা না হতো স্কুলে যাওয়ার সময় নৌকা ডুবিয়ে দিতাম! ব্যাস বই খাতা জামা কাপড় সব ভিজে যেত । আর এগুলো শুকাতে দুই দিন লেগে যেত । আর সে দুদিন স্কুল বন্ধ। আব্বা বুঝতে পারত আমার এসব চালাকি । কিন্তু কখনো কিছু বলত না! আম্মা কেন কেন করত,  তুমি থাকতে নৌকা ডুবে কি করে? আব্বা কিছু না বলেই চলে যেত!

একদিকে আমি ছিলাম আমার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট এবং বেশি সময় পর্যন্ত বাবা-মার কাছে ছিলাম । তাই আমার অনুভূতিগুলোও একটু অন্য রকম! বাবার পিঠে ঘোড়া চালানো, বর্ষার অর্থই জলে ভেসে বেড়ানো, যখন তখন বৃষ্টিতে ভেজা, গরু, ছাগল, হাস মুরগীর সাথে মিতালী করা ইত্যাদি হাজারও স্মৃতি আছে আমার; যা বলে শেষ করা যাবে না!
ছোট বেলার স্মৃতিগুলো বেশি মজার। কারণ তখন চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটা ছিল খুবত সীমিত! আটানার আইসক্রিম, এক আনার চকলেট, হজমি এইতো! কেউ দশ টাকা বকশিস দিলে এক টাকা খেয়ে নয় টাকা জমিয়ে রাখতাম কিছু কিনব বলে; কিন্তু আর কিছু কিনা হতো না । বড় ভাইবোন বুজিয়ে শুজিয়ে নিয়ে নিত । বিশেষ করে আমার ছোট্ট ভাই যার সাথে আমার বয়সের অনেক পার্থক্য হলেও মনের দিক দিয়ে অনেক মিল ছিল । একমাত্র ও আমাকে কনভেন্স করতে পার । ও ছিল আমার সবকিছুর অংশীদার! আমি নিশ্চিন্তে ওর কাছে সব টাকা, আমার শখের সব জিনিস জমা রাখতাম  । এছাড়াও নিজেও আমার শখের অনেক কিছু এনে দিত, নতুন নতুন সব টাকা ওর কাছে জমা ছিল । যে টাকা ফেরত পাইনি কখনো, এখনো মাঝে মাঝে মনে হয় ওকে গিয়ে বলি ভাইজান আমার জমানো টাকা কিন্তু সূদে-আসলে ফেরত চাই । এখন ব্যাংক হয়ে গেছে ফেরত দেও!!!! আমার কিন্তু সব মনে আছে ভুলিনি কিছুই! পৃথিবীতে সব ভাইবোনদের যদি এতো মধুর সম্পর্ক থাকত, তাহলে হয়ত সবার জীবন আরো সুন্দর হতো!

যাক আসলে পৃথিবীর সব বাবারাই হয়ত এভাবে রক্ষাকবজ হয়ে আগলে রাখে তাদের সন্তানদের! ছোট বেলার স্মৃতিগুলো এতটাই মধুর যা আমাকে আকড়ে আছে আষ্টেপিষ্টে! আমি এখনও কোন বিপদে পড়লে মনে হয় বাবা আছে আমার পাশে ছায়া হয়ে! আমি বিশ্বাস করি বাবার সাথে আমার আবার দেখা হবে । বাবা তার সব জমানো গল্পগুলো আমাকে শুনাবেন । আর আমি বাবার কোলে মাথা রেখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাব! আজ এই বাবা দিবসে সবার কাছে সন্তান হিসেবেও একটায় চাওয়া আমার বাবাসহ পৃথিবীর সকল বাবারা যেন ওপারেতেও ভাল থাকে; খুব ভাল!

লেখকঃ কলামিস্ট ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
লালবাগ, ঢাকা।

 

আরও পড়ুন