বাবা দিবসে বাবার কাছে খোলা চিঠি…

হাফিজা শারমীন সুমী

শ্রদ্ধাবরেষু বাবা

প্রায় রাতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাতের চাদরে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠি আমি। কোথায় যেন অসম্ভব শূন্য এ পৃথিবী। সব আলোর ছটা যেন ম্রিয়মান হয়ে যায় একটা জায়গায় এসে। তুমি যে চলে গেছো না ফেরার দেশে। খুব জানতে ইচ্ছ করে কেমন সেই পৃথিবী? সেখান থেকে তুমি কি আমাদের দেখতে পাও বাবা?

তুমি কি দেখতে পাও তোমার স্বার্থপর ছেলেমেয়েদের। যাদের না খাইয়ে একবেলাও খাওয়ার কথা ভাবতেও পারতে না তুমি। অবসম্ভব মমতায় তোমার বুকে ঘুমিয়ে পড়তাম সকল পৃথিবীর অজানা গল্প নিয়ে। একদিনের জন্যও দায়িত্বে অবহেলা করোনি তুমি। আর তাইতো আমি বড় হওয়ার পরেও তুমি তোমার নাতী-নাতনীদের গল্পের পসরা মেলে দিতে। অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে দুপরে খাবার টেবিলে অপেক্ষা করে থাকতে কখন আমি অফিস থেকে লাঞ্চ ব্রেকে এসে তোমার সাথে খাবো। তোমার রুটিন ছিল খুব সাদামাটা, অনাড়ম্বর, ছকে বাঁধা। আর আজ আমাদের জীবন যাপন এতোটাই যান্ত্রিক যে তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতেও আমরা একসাথে হয়ে মায়ের পাশে সমবেদনা জানাতে পারি না। কিন্তু তোমার লাগানো ফুল গাছটা একটুও ভুলে যায়নি ফুল ঝড়াতে। প্রতি শরতে ভরিয়ে দেয় আমাদের উঠান। তোমার লাগনো আম, কাঁঠাল গাছ জ্যৈষ্ঠ্য মাসের মধুতে ভরিয়ে দেয়। অথচ কতটা নির্বোধ আর স্বার্থপর হলে আমরা ভুলেই যাই কতদিনের কত স্মৃতি বহন করছে তোমার ছোঁয়ায় তোমার লাগানো গাছগুলো। নির্লজ্জের মতো গাছগুলো কেটে বহুতল দালান বানানোর জন্য তোমার স্মৃতিচিহ্ন টুকু মুছে ফেলতেও কুণ্ঠা করি না আমরা। শিউরে উঠি আমার অপরাগতায়। প্রতিবার টহরংাবৎরংঃু যাওয়ার সময় অসম্ভব কুয়াশায় কাঁপতে কাঁপতে চাদর মুড়ি দিয়ে তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে অপলক নয়নে, আমাদের বাসা থেকে অনেক দূরের একটা মোড়ে। সেখানে বাস থেকে আমাকে এক নজর দেখে হাত নাড়বে বলে। কত বোকা আমি তখনও বুঝিনি তোমার মুখটাই যেন হারিয়ে যাবে চিরতরে আমার জীবন থেকে।  আমি যে বছর “নতুন কুঁড়ি” তে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম তুমি ফোন পেয়ে শুধু কাঁদছিলে আর কাঁদছিলে। মাসের শেষ দিন। শিক্ষকতার যৎসামান্য টাকা দিয়েই সততার আনন্দে তুমি তোমার কলিগদের পেট পুরে খাইয়েছিলে। বোঝেনি অবুঝ মন সেই দিনের উত্তাল আবেগ। শুধু এতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি, এই রক্ষণশীল সমাজে এত অভাবের মাঝেও আমার প্রতিভাকে এগিয়ে নিতে তুমি আর মা কতোটা সোচ্চার ছিলে, আন্তরিক ছিলে। কিছুই চাওনি কোনদিন বিনিময়ে। সারাজীবন শুধু আমাদের সাবলম্বী সৎ অবস্থানে দেখেতে চেয়েছো। তাইতো শিক্ষকতার পাশাপাশি টিউশনী করে আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে সমাজের সর্বোচ্চ শিক্ষায় সুশিক্ষত করেছো। কিন্তু আদৌ কি আমরা সুশিক্ষিত হয়েছি বাবা।

কোনদিনও কি তোমাকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। কখনও কি তোমাকে তোমার মত করে সময় দিয়েছি। এত কাজ, এত ব্যস্ত আমরা যে, জামা-কাপড়, শাড়ী, পাঞ্জাবীর দায়িত্ব থেকে বের হয়ে তোমাকে কোনদিন বেড়াতে নিয়ে যেতে পারিনি তোমার পছন্দের জায়াগায়। কোনদিনও জানতে চাইনি তোমার ন্যায্য ইচ্ছেগুলো। মৌলিক চাহিদার বাইরেও তুমি যে সৌখিন মানুষ, স্বার্থপরতায় তা ভুলেই গিয়েছি আমরা। আর তাইতো অভিমানে কাউকে কিছু না বলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে তুমি চলে গেছো না ফেরার দেশে। নিশ্চয়ই ভালো আছো তুমি সেই দেশে। কেননা সেখানে নেই কোন স্বার্থপরতা, জটিলতা, সম্পত্তির হানাহানি আর অবহেলা। কোথাও বেড়াতে গেলে মনে পড়ে প্রকৃতির এই গাছগুলো, পাখিগুলো, রংধনুর সাতরঙ্গা পৃথিবীর বর্ণিল সৌন্দর্য আমি চিনেছিলাম তোমার হাত ধরে। বাচ্চাকে পড়াতে বসালে মনে পড়ে ইতিহাস ভূগোল এর পার্থক্য চিনেছিলাম তোমার চোখে। ন্যায়নীতি মূল্যবোধ দেখেছিলাম তোমার ন্যায়পরায়ণ সততার হাসিতে। উদার মমতা দেখেছিলাম তোমার কলমের কালিতে। কঠোর প্রতিবাদ শিখেছি তোমার দৃঢ়তা মেশানো শান্ত সৌম্য ব্যক্তিত্বের প্রষ্ফুটনে। উদারতা শিখেছি তোমার দুহাতের উজার করা দানে। গ্রহণ যত করেছো ঋণী করে গিয়েছো আমাদের ততোধিক। আজ অভিমানে চোখ ভিজে গেলে কেউ কেন তোমার মত করে চোখ মুছিয়ে দেয় না বাবা। অপরাহ্নের আধো অন্ধকারে শুয়ে থাকলেও কেউ বলে না “ মা এ সময় শুয়ে থেকো না, ঘরে রহমতের ফেরেশতা আসে।” রাগ করে থাকলে কেউ তোমার মত করে আদর করে খাইয়ে দেয় না কেন বাবা?”।

কেন আমার মাথার ওপর থেকে শক্তপোক্ত ছায়াটা মেঘের মত সরে গেলো। কেন আমার দুঃখ-সুখে দোয়ায় পরিপূর্ণ দুটি হাত কমে গেল। কেন অন্যদের বাবাকে দেখলে কিংবা তোমার মত কাউকে দেখলে আমি ভিখেরীর মত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। কেন মাথায় হাত দিয়ে কেউ দোয়া করে দিলে আমার চোখ ভিজে যায়। কেন জন্মদিন, ঈদ, বিশেষ দিনগুলোতে তোমাকে কদমবুচি করার জন্য ব্যকুল হয়ে ফিরি। কেন সারাদিন, সারা বছর, সপ্তাহ কিংবা একটু ক্ষণের জন্য তোমার স্মৃতি ভুলতে পারি না আমি। ছায়াসঙ্গীর মত কেন হাতড়ে বেড়াই আমি তোমাকে আমার অদেখা ভূবনের বাবাকে। ছেলেকে সুবিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলি, আকাশের সবচেয়ে উঁচু নক্ষত্রটাই তোমার নানু ভাই।

আমি জানি আমি তোমার যোগ্য সন্তান হতে পারিনি কিন্তু তুমি তো পূণ্যবান ভালো মানুষ। কেন তুমি তোমার অযোগ্য সন্তানদের ক্ষমা করে থেকে গেলে না বাবা। আর কটা দিন তোমার হাসিমাখা মুখটা দেখতে পেতাম।

তুমি বৃষ্টি ভালোবাসতে। শ্রাবণের আকাশ দেখলে তুমি কবিতা পড়ে শোনাতে। তুমি চলে যাওয়ার পরে বৃষ্টি দেখলে আমি ভয়ে শিউরে উঠি। কালো আকাশ, ঝড়ের রাতে তুমি দরজা জানালা লাগিয়ে দোয়া পড়তে। এখন বৃষ্টি এলে অজানা এক ভয়ের ভূত আমাকে গ্রাস করে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে তোমরা কে কোথায় আছো আমার বাবার কবরটা যে ভিজে যাচ্ছে। আমার বাবা ভিজে যাচ্ছে। আমার বাবা ভিজে যাচ্ছে…

লেখকঃ সংগীত শিল্পী ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন