আমার আব্বা

মোস্তফা মাসুম তৌফিক

আমার মা, আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন ক’দিন আগে, ১০ জুন। এতে আমার আব্বা ভীষণ ভেঙে পড়েছেন। বাইরে থেকে কাউকে কিছু বুঝতে দিতে চান না। তবে সত্যি সত্যি খুব ভেঙে পড়েছেন ভেতর থেকেই। যেদিন মা মারা গেলো, সেদিনও আব্বা স্মার্টলি তার নাতি নাতনি দের সাথে কথা বলতে বলতে আমাদের সবার সামনে বললেন, “আমার তিন ছেলে দায়িত্ব নিয়ে সব করছে, আমার কোন দায়দায়িত্ব নেই। একটু হেসেও দিলেন কথাটা বলে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি কতটুকু ভেঙে পড়েছেন, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাওয়া গেলো। মায়ের খাটিয়া বাসার নীচের ফ্লোরে রাখা ছিল। গোসল করিয়ে নিয়ে আসার পরে, জানাজায় নেবার আগে পর্যন্ত ওখানেই ছিল। সবাই দেখে যাচ্ছে। কেউ কেউ দুআ পড়ছে, তিলাওয়াত করছে পাশে। আমার আব্বা হঠাৎ বললেন, আমি একটু দেখতে যাবো। বলে তৈরি হয়ে ছয়তলা থেকে লিফটে নামলেন। লিফটে আমিই ছিলাম আব্বার সাথে। আব্বাকে খাটিয়া দেখিয়ে আমি অনতিদূরে আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলতে গেলাম। কয়েক মুহূর্ত পরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, আব্বা ওখানে নেই। পরে ছোট বোনের কাছে শুনলাম, মায়ের মুখটা দেখার সাথে সাথে তিনি ঘুরে গিয়ে লিফট চেপে আবার ছয়তলায়, একেবারে তার বিছানায় চলে গেছেন। মানে, মায়ের ঐ অবস্থায় দেখে তিনি সহ্য করতে পারেননি; তার মতো শক্ত মনের মানুষের পক্ষেও সহ্য করা সম্ভব হয়নি। আসলে প্রায় ৬২ বছরের সংসার! মা বেঁচে থাকলে আগামী ২৪ অক্টোবর তাদের ৬২ বছর পূরণ হতো। আমি আব্বা মায়ের বিয়ের তারিখটা আগে জানতাম না। তখনই শুনলাম। এরপর থেকে আমরা তিনভাই পালা করে আব্বার সাথে রাতে থাকছি।

আমার আব্বাকে নিয়ে ছোট পরিসরে কিছু লেখা সম্ভব না। তিনি সবদিক দিয়ে অনেক বড়মাপের মানুষ। আমার দেখা শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব নিঃসন্দেহে আমার আব্বা। তিনি একাধারে সৎ, নির্লোভ, মেধাবী, দেশপ্রেমিক, কর্মঠ, সাহসী, সজ্জন, অমায়িক, মিশুক, মানবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রজ্ঞাবান, সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ।

তবে, আমরা ছোট বেলায় আব্বাকে ভীষণ ভয় পেতাম। তার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করতাম, বলা যায় পালিয়ে থাকতাম। আমরা একটু ফাঁকিবাজ টাইপ ছিলাম। আব্বার সামনে পড়তে বসলে ফাঁকিবাজি ধরা পড়ে যাবে, ভয়টাই আমাদের তাড়া করে ফিরতো। আব্বা যে আমাদেরকে খুব কড়া শাসন করতেন কিংবা মারধর করতেন, তা কিন্তু নয়। আমরা তাকে এমনিতেই ভয় পেতাম। তিনি বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। ভয়টা ছিল ওখানেই। মারধর করা লাগতো না, আব্বার কড়া ধমকেও অনেক সময় আমাদের কাপড় নষ্ট হয়ে যেত। আমরা ছোট বেলায় আব্বার কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়েছি। নির্দিষ্ট সময়ে ঘরে ফেরা, পড়াশোনা করা, আব্বা মায়ের কথা মেনে চলা, মুরুব্বীদের কথা শোনা, গুরুজনদের সাথে বেয়াদবি না করা, কারও সাথে মারামারি গন্ডগোল না করা – এসব মিলেই ছিল কঠোর অনুশাসন। আমরা কারও কাছে মার খেলেও আব্বাকে বিচার দিতে পারতাম না। বিচার দিলে আগে মার কিংবা বকুনি খেতে হতো আমাদেরই। উনি মিথ্যা বলা একদমই পছন্দ করতেন না। আমি অনেক ছোটবেলায় বাজারে যেতাম। একদিন মালিবাগ বাজারে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করার আগেই আমি টাকা হারিয়ে ফেললাম। ভয়ে ভয়ে বাসায় এসে আব্বাকে বললাম। আব্বা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপরে বললেন, “money loss nothing loss, health loss something loss, character loss everything loss”. এই হলো তার ট্রিটমেন্ট। তিনি মহানবী (সাঃ) এর জীবনী থেকে নানা ঘটনা তুলে ধরতেন, হজরত উমর (রাঃ) এর জীবনী থেকেও অনেক চমৎকার মানবিক ঘটনা তুলে ধরতেন, আবার সক্রেটিস এর জীবনী ও উপদেশমালাও আমাদেরকে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতায় তুলে ধরতেন। আবার আব্বা আমাদেরকে খুব আদরও করতেন। বিশেষ করে একটা স্মৃতি ভীষণ মনে পড়ে, আমি ছোটবেলায় রাগ হলে না খেয়ে থাকতাম। আব্বা এসে আমাকে কোলে করে খাওয়ার টেবিলে নিয়ে কোমল গলায় যখন খেতে অনুরোধ করতেন, তখনই আমি রাগ ভেঙে খেতে বসতাম। আব্বা আমাদের সাথে লুডু খেলতেন, মজার মজার গল্প বলতেন, গল্পের ছলে উপদেশ বাণী শোনাতেন। নানা ধরনের গল্পের বই এনে দিতেন। এরপর ধীরে ধীরে যখন বড় হতে থাকি, আব্বাও ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধু হয়ে গেলেন। আমরা বাসায় ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করি, আড্ডা দেই — ঠিক বন্ধুর মতো। ছোট বেলার কঠিন অনুশাসন থেকে ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

আমার আব্বা খুব পড়ুয়া ছিলেন। আমাদের সময়ে যেগুলোকে আউটবই বলতো, আমাদের বাসার সবখানে তা ছড়ানো ছিটানো থাকতো। বই এর জন্য দুটো কাঠের বুকশেলফ আলমিরা ছিল, কিন্তু বই ছিল ধারণ ক্ষমতার অন্ততঃ দ্বিগুণ বা আরও বেশি। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে আমি তৃতীয় বুকশেলফ অর্ডার দিয়ে বানাই, কিন্তু তারপরেও বিপুল পরিমাণ বই বাইরেই পড়ে থাকতো। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, জীবনী, ধর্মীয় বই, কম্যুনিজম এর উপর বই, অনুবাদ বই এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রচুর বই ছিল আমাদের। আরব্য রজনী বাদে যে কোন বই পড়ার স্বাধীনতা ছিল আমাদের ছোটবেলা থেকেই। আমাদের বাসায় একসময় কোন ফার্নিচার কিংবা বিলাস সামগ্রী এমনকি নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই ছিল না। শুধু খাট বা চৌকি, একটা রেডিও, কিছু টেবিল চেয়ার, মিটসেফ, ট্রাঙ্ক, সুটকেস এসবই ছিল বাসায়। টিভি, ফ্রিজ, সোফা, শোকেস, এমনকি সিলিং ফ্যান — কিছুই ছিল না আমাদের বাসায়। কৃচ্ছসাধন কিংবা কঠোর জীবন যাপনকে আব্বা শুধু তাত্ত্বিকভাবেই মানতেন না, রীতিমতো তার ব্যবহারিক প্রয়োগও করে দেখাতেন। সব ধরনের খরচই অত্যন্ত সীমিত আকারে করতেন আব্বা। শুধুমাত্র পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ নিয়ে আব্বা কখনও কার্পণ্য করেননি। যা প্রয়োজন, তাই খরচ করেছেন। টাকা হাতে না থাকলে ধার করে হলেও ঐ প্রয়োজন মিটিয়েছেন।

আমার আব্বা খুব ছোটবেলা থেকেই বাড়ির বাইরে থাকতেন। ক্লাস ফোর লেভেলেই আব্বা পদ্মার ওপারে পাবনার সুজানগরে গিয়ে জায়গীর থেকে পড়াশোনা করেন। ম্যাট্রিক পাশ করেন ফরিদপুর ময়েজউদ্দিন হাইমাদ্রাসা (বর্তমানে ময়েজউদ্দিন হাই স্কুল) থেকে। সারা বাংলাদেশে ফার্স্ট হয়েছিলেন তিনি। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন ঢাকার ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) থেকে। ওখানেও মানবিক বিভাগ থেকে মেধাতালিকায় পঞ্চম হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হন। পরে সাবজেক্ট পরিবর্তন করে প্রথমে অর্থনীতি ও পরে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু আব্বা ভীষণরকম রাজনীতি সচেতন ছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েন মহান ভাষা আন্দোলনে। ভাষা আন্দোলনের স্থপতি সংগঠন তমদ্দুন মজলিস যোগ দেন আব্বা। এক পর্যায়ে তমদ্দুন মজলিস থেকে কয়েকজন সার্বক্ষণিক কর্মী আহবান করা হলে, আব্বা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালে আব্বা তমদ্দুন মজলিস থেকে প্রকাশিত, ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র সাপ্তাহিক “সৈনিক” পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং এই সুবাদে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২, রাতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ১৫ জন্য সদস্যের মিটিংএ আব্বাও ছিলেন অন্যতম। ছিলেন পরদিন ফজলুল হক হলের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত আমতলার ঐতিহাসিক মিটিংয়েও। ১৪৪ ধারা ভেঙেছেন একসাথে সবাই মিলে। এর পরদিন সাপ্তাহিক “সৈনিক” পত্রিকার প্রথম পাতায় লাল ব্যানার হেডিং এ আব্বা লেখেন কড়া সম্পাদকীয়, “বাংলা ভাষার উপর শয়তানের হামলা”। একদিনে ঐ “সাপ্তাহিক সৈনিক” পত্রিকা কয়েকবার ছাপা হয়েছিল। তারপর যথারীতি হুলিয়া এবং পুলিশ রেইড। আব্বা জীবনের প্রথম ও শেষবারের মতো দাড়িগোঁফ কামিয়ে, বোরকা পড়ে, পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আব্বা এর আগে রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা সভাতেও ছিলেন। ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ হবার মিটিংয়েও। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আব্বা ছিলেন অন্যতম সমন্বয়ক। আবার মওলানা ভাসানীর কাগমারী সম্মেলনেও আব্বা ছিলেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে আব্বা বিএ (পাশ) করেন জগন্নাথ কলেজ থেকে এবং স্নাতকোত্তর এমএ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট থেকে। এমএ পাশ করার আগেই আব্বা বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। এমএ পাশ করার পরে তিনি জেলা সমাজকল্যাণ অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামে চলে যান। কিন্তু দুবছরের মাথায় পাকিস্তানের দুর্নীতিবাজ সরকারের চাকুরী না করার শপথ করে, ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে বিভাগীয় প্রধান, সমাজকল্যাণ — হিসাবে শিক্ষকতা শুরু করেন। আমাদের তিন ভাইয়ের জন্ম ফরিদপুরে। ১৯৭০ সালে রাজেন্দ্র কলেজ সরকারি হয়ে গেলে তিনি শপথ অনুযায়ী চাকুরী ছেড়ে দেন এবং ঢাকায় এসে দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সাংবাদিকতা এবং আবুজার গিফারী কলেজে সমাজকল্যাণে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৭১ এ যুদ্ধ চলাকালীন আব্বা ঢাকায় থেকেই যুদ্ধ সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক ইত্তেফাকে। এরপর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ইংরেজি দৈনিক ” The Daily Peoples” এ কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত আব্বা প্রায় কর্মহীন ছিলেন। টিভি, রেডিও তে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান করতেন, আবুজর গিফারী কলেজে পড়াতেন, কিন্তু প্রায় অধিকাংশ সময়েই বেতন পেতেন না। ১৯৭৯ সালে “দৈনিক দেশ” পত্রিকায় যোগ দেন। এর কিছুদিন পড়ে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশে, প্রকাশনা পরিচালক হিসেবে আব্বা আবারও সরকারি চাকুরিতে চুক্তিভিত্তিক যোগদান করেন। এরপর দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় ফিচার সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে এখনও কর্মরত আছেন।

এর বাইরে আব্বা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে প্রায় সারা জীবনই যুক্ত ছিলেন। তমদ্দুন মজলিসের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। নজরুল একাডেমিতে সহ সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে এখনও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

আব্বা সবসময়ই খুব মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষ। চুয়াত্তর এর দুর্ভিক্ষ চলাকালে আমি খুব ছোট ছিলাম। আমাদের বাসায় একবেলা ভাত ও দুবেলা রুটি হতো। সেই সময়ে আব্বার নির্দেশ ছিল, একজন ভিখারিও যেন খালি হাতে আমাদের বাসা থেকে ফেরত না যায়। একমুঠো চাল, কিংবা একটা রুটি কিংবা পাঁচ/ দশ পয়সা হলেও দেয়া হতো। আব্বা আরও অনেককে সহায়তা করতো; সাধারণত গোপনেই করতো বলে, আমরাও জানতাম না। নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কে বিপদগ্রস্ত, বন্ধু বান্ধব দের মধ্যে, কিংবা লেখক বুদ্ধিজীবী দের মধ্যে কারা আর্থিক টানাপোড়েন দিন কাটাচ্ছে, গোপনে তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করতেন। অনেক পরে হয়তো অন্য কোন ভাবে আমরা তথ্য পেতাম। সেভিংস একাউন্টে টাকা রাখলে যে সুদ হয়, আব্বা তাও হিসেব করে তুলে গরীব দুঃখীদেরকে দিয়ে দিতেন। এবং ঐ টাকাকে কখনও নিজের টাকা মনেই করেননি। তাই ঐ দেয়াকে দান বলতেও তিনি নারাজ ছিলেন।

আব্বা তার সীমিত সামর্থ্য ও খরচেও আমাদেরকে অনেক কিছু দেখিয়েছেন। কবি নজরুল যখন পিজি হাসপাতালে ছিলেন জীবনের শেষ সময়কালে, আব্বা মাঝে মাঝেই তাকে দেখতে যেতেন। আমরাও গিয়েছি আব্বার সাথে কবি নজরুলকে দেখতে। মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, আব্বা আমাদেরকে নিয়ে গেলেন মৌচাক মার্কেটের উল্টোপাশে। রামপুরা টিভি সেন্টারে যাওয়ার সময় মোহাম্মদ আলী খোলা জিপ থেকে হাত নাড়লো, আমরাও আলীকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালাম। একবার চিড়িয়াখানায় নিয়ে গেলেন আমাদের সবাইকে। ফকির মজনু শাহ নামে একটা চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল আমি তখন প্রাইমারি স্টুডেন্ট। আব্বা বাসার সবাইকে নিয়ে বলাকা হলে সিনেমা দেখান। আব্বার সাথে একবার কবি নজরুলের নাতি নাতনি দের বনানী বাসায় যাই। রোজার মাসে, ইফতারি এবং ঘরোয়া সঙ্গীত অনুষ্ঠান। নজরুল গীতির শিল্পী খালিদ হোসেন ছাড়াও বিখ্যাত শিল্পী আবদুল লতিফ, তখনকার উঠতি শিল্পী সামিনা নবী ছিলেন ওখানে।

সবচেয়ে ভালো লাগতো আব্বার সাথে বাড়ি গেলে। আমরা একদিন ভোরে যাত্রা শুরু করে ফরিদপুর, রাজবাড়ি, পাংশা, বেলগাছি এসব এলাকার অনেকগুলো জায়গায় যেতাম। তখন বৃহত্তর ফরিদপুরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক। সড়ক পথে ফরিদপুর রাজবাড়ি ছাড়া আরও কোথাও যাওয়া যেত না। ট্রেন ছিল। আমরা ঐ ট্রেন এবং হাটাহাটি করে একটা জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেতাম। তাও এক দুদিনে অনেক গুলো জায়গায়। আমাদের আত্মীয় স্বজনরা বেশিরভাগই বৃহত্তর ফরিদপুরে ছিলেন। আব্বা চেষ্টা করতেন প্রায় সবার সাথে দেখা করে আসতে।

আমার আব্বা তার শ্বশুর বাড়িতেও খুব জনপ্রিয় ছিল। আমার মা ছিলেন পুরো গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। তাই আব্বা ছিলেন সবার দুলাভাই। আমাদের বাসায় আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, কোন না কোন মামা খালাকে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ মামা খালার বিয়েতে আব্বা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। আব্বা তার বাবামা, ভাইবোন সবার খোঁজ খবর রাখতেন আন্তরিক ভাবে। সবার বিপদে পাশে থাকার চেষ্টা করতেন।

আব্বা ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমরা কে কি সাবজেক্ট নিব, কিংবা কে কোথায় বিয়ে করবো, কে কোন পেশা গ্রহণ করবো — এই জাতীয় বিষয়গুলো কখনও কারও উপর চাপিয়ে দেননি। সবার ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

আব্বা খুব ভালো লেখক। সাধারণত প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখেন। প্রায় আত্মজীবনী টাইপ একটা বইও লিখেছিলেন, “আমার কালের কথা”। প্রথম খন্ডের পরে আর বের হয়নি। ইন্টারমিডিয়েট থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত সমাজকল্যাণ বিষয়ে আব্বার লেখা বই একটা সময়ে সবচেয়ে চালু ছিল। এছাড়া খোদার রাজ্য নামে একটা জনপ্রিয় শিশুতোষ বই লিখেছিলেন। আরও অনেক বই সম্পাদনা করেছেন। নিয়মিত কলাম লেখেন দুই যুগ ধরে। আব্বার লেখার মূল একটা বিষয় হলো নিরপেক্ষতা। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কোন বিষয়ে লেখা আসলেই খুব কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজ আব্বা দীর্ঘদিন করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। তবে, আব্বার বয়স এখন ৯১, এই বয়সেও কলম চালানো আল্লাহর অশেষ রাহমাতে ছাড়া আরও কিছুই না। তবুও, বলতেই হয় আব্বারও ইদানিং স্মরণ শক্তি কমে যাচ্ছে। অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছেন সাম্প্রতিক কালের। আবার হয়তো সত্তর আশি বছর আগের কথাও বলে দিতে পারেন।

আব্বা তার সুদীর্ঘ সময়ের দেশপ্রেমিক সত্তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, একুশে পদকও পেয়েছেন। এছাড়া আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আব্বা সারা জীবনেই। এসব স্বীকৃতির চেয়েও বড় যা পেয়েছেন, তা হলো মানুষের কাছ থেকে সম্মান ও ভালোবাসা। পরিচিতজন তো বটেই, আমাদের অপরিচিত অনেকেই আব্বাকে ভীষণ সম্মান করে, ভালোবাসে। এই সম্মান ও ভালোবাসা আসলেই অমূল্য!

আব্বা শারীরিক ভাবে এখনও যথেষ্ট ফিট। মাঝে ২০০৯ সালে হৃদযন্ত্রের কিছু সমস্যা হওয়ায় স্টেনটিং করে একটা রিং পরিয়ে দেয়া হয়। পরের বছর হার্টে ডাবল চেম্বার পেস মেকার লাগানো হয়। এরপর আব্বা বেশ ভালোই আছেন। তবে, মা মারা যাবার পরে আব্বা খুব ভেঙে পড়েছেন। বাইরে থেকে কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। আসলে ভেতরে ভেতরেই ভাঙনটা বেশ স্পষ্ট। আমরা এখন আব্বাকে একটু বেশি সময় দেবার চেষ্টা করছি। আবার করোনার কারণে আব্বা বাসা থেকেও বাইরে যেতে পারছেন না। বাইরের কেউ বাসায়ও আসতে পারছেন না। আব্বার মতো মানুষের জন্য এমন সময় পাড়ি দেয়া সত্যিই কঠিন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে তাই আমাদের একটাই প্রার্থনা, আমার আব্বাকে নেক হায়াত দান করুন। আব্বা যেন আমাদের সাথে আরও দীর্ঘদিন থাকতে পারেন, সুস্থ জীবন যাপন করতে পারেন, পরম করুণাময়ের কাছে আমাদের এতটুকুই প্রার্থনা। আমিন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন