হিপক্রেটস

পলাশ পুরকায়স্থ

ইরা খুব সুখী ছিল৷ অন্ততঃ তার দু’বছরের বিবাহিত জীবনে জামাই, শ্বশুড়-শ্বাশুড়ীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সে৷ ইরার বাবা মাও সুখী মানুষের চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন৷ ছেলে আমেরিকায় থাকে৷ সুশিক্ষিত মেয়ে শ্বশুড় বাড়ীতে শান্তিতে আছে৷ তাদের আর কি চাইবার থাকে৷ ইরা জব করতো৷ একদিন আসতে আসতে একটু দেরী করে ফেলল৷ মনে তার নানান চিন্তা৷ শ্বাশুড়ী কি বলেন জামাই কি বলে!
অথচ ফেরার পর মাদার-ইন-ল কিছু বললেন তো নাই, উপরন্তু নিজে খাবার গরম করে খাইয়ে দিলেন৷
ইরা যখন গর্ভবতী তার যত্ন আত্তিতে কেউ কোন কসুর ছাড়লো না৷ এহেন ভালবাসা পেয়ে গর্ভকালীন সময়টা ইরা মনে করলো তার শ্বশুড় বাড়ীতেই থাকবে৷ ইরার বাবা মা নিশ্চিন্তে ছেলের কাছে আমেরিকা চলে গেলেন৷ এমন বাড়ীতে মেয়ে বিয়ে দিতে পেরে উনারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতে লাগলেন৷
বিপত্তি বাঁধলো সন্তান জন্মের পর৷

ইরা একটি তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান প্রসব করলো৷ আগে থেকেই বুঝা যাচ্ছিল না ছেলে কিংবা মেয়ে৷ ডাক্তার রিপোর্ট দেখে ছেলে বলেই ঠাউরালেন৷ কিন্তু যে এই পৃথিবীতে আসলো সে হলো তৃতীয় লিঙ্গ৷ অপুষ্ট জননাঙ্গ দেখে ডাক্তার ইরার স্বামীকে ডেকে নিয়ে বললেন ইয়ে আপনার একটা সন্তান হয়েছে৷
তিনি উচ্চসিত গলায় বললেন ডাক্তার ছেলেই তো! ছেলে না!!

ডাক্তার আমতা আমতা করে বললেন শিশুটিকে একবার দেখুন৷
ইরার হাজব্যান্ড দেখলেন একটা দেব শিশুর মুখ৷ পরম মমতায় তিনি কোলে নিতে চাইলেন ছেলেটাকে৷ তখনই ডাক্তার কাপড় সরিয়ে দেখালো নিচের দিক৷ তিনি তখনও বুঝেননি সমস্যা কি? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন ডাক্তার আমি কিছু বুঝতে পারছি না!

ডাক্তার আবার আমতা আমতা করে বললেন ইয়ে আপনার সন্তান পুরুষ বা নারী নয় সে একজন বৃহন্নলা!
আমি বুঝলাম না ডাক্তার৷ কি নলা?
ডাক্তার বললেন সোজা বাংলায় যাকে আমরা হিজ…. তিনি কথা শেষ করতে পারলেন না৷
ইরার হাজু’র মুখ আঁধার হয়ে গেলো৷ তিনি টলটলে কালো বড় চোখে তাকানো বাচ্চাটার দিকে আরও ফিরেও চাইলেন না৷ একটি কথাই তার কাছে সমস্ত স্নেহ,মায়া, মমতাকে ঘৃণায় পরিনত করলো৷ তিনি মাথা নিচু করে বের হয়ে এলেন৷ ইরার শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী জানতে চাইলেন বাচ্চার কথা৷ ইরার জামাই রাগত স্বরে চিৎকার করে বললেন আম্মা ইরা মাগী একটা হিজড়া পয়দা করছে!
তার চিৎকারের চোটে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নার্সের হাত থেকে ট্রে পড়ে গেল ঝনঝন শব্দে৷
ইরার শ্বশুড় হা করে তাকিয়ে থাকলেন৷ ইরার শ্বাশুড়ী মেঝেতে বসে পড়লেন৷
এর কিছুক্ষণ পর উনারা হাসপাতাল ত্যাগ করলেন৷ ইরা দেবশিশুর মতো বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো৷
ইরার বাবা মা ফোনে কাউকে না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় জামাইকে শেষ বারের মতো কল করলেন ।
কিছু অস্রাব্য কথা শোনার পর ইরার সন্তানের দুঃসংবাদটা পেলেন৷ ইরার মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন৷ তাকে নিয়ে সুদূর আমেরিকায় টানা হেঁচড়া শুরু হয়ে গেল৷

xxxx
ছ’মাস পর৷
এই ছ’মাস ইরার কেমন কাটলো একমাত্র ইরাই জানে৷ দুধের শিশুটিকে পরিবারের কেউ কাছে টেনে নিল না৷ ইরার জামাই তার বাবা মা নানা আকথা কু কথায় জর্জরিত করে ফেলল৷ বাচ্চাটার অমলিন স্বর্গীয় হাসি গুগুগাগাগাগিগি এবং আরও নানান শব্দ তাদের মনের মধ্যে কোন স্নেহের উদ্রেকই করলো না৷
শুধু বাচ্চাটির মুখের দিকে তাকিয়ে ইরা সব সহ্য করলো৷
ছুটি কাটিয়ে অফিসে গেলে প্রথম দিন বাচ্চাটা টেটে করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লো৷ কেউ এসে এক ফোঁটা তোলা দুধও মুখে দিল না৷

মায়ের মন তো৷ কিভাবে যেনো বুঝতে পেরেছিল সে কথা৷ সেদিন দুপুরে ইরা কেন জানি ফিরে এসেছিলো৷ না হয় হয়তো বাচ্চাটার ভাগ্যে অন্য কিছু ঘটতো৷

ইরা বাচ্চাকে এরপর অফিসে নিয়ে যেতে শুরু করলো৷ আর তার স্বামীর পরিবার কীভাবে এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায় সেটা চিন্তা করতে লাগলো৷
ইরা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে তার বাচ্চাটাকে কিছুতেই সে অন্যকারও হাতে তুলে দেবে না৷

ইরার ঠাঁই হলো গেস্ট রুমে৷ তার স্বামী এখন তার সাথে থাকতে চায় না৷ তবু ইরা কামড় খেয়ে শ্বশুর বাড়ীতে পড়ে রইলো৷
তার নিজের বাবা মাই ইরার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন৷ ছেলের বাড়ীতে আছেন আমরিকায়, ছেলের কথা তো শুনতে হবে? ইরার মা ডুকরে কাঁদেন৷ ইরার বাবা অসহায়ের মতো গোঁধুলি বেলায় পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকেন৷

xxx

সেদিন শুক্রবার৷ ইরাদের আটতলা ফ্লাটহাউজের নিচে বাদ্য বাজিয়ে এলো তৃতীয় লিঙ্গের একদল  লোক৷ আটতলার উনচল্লিশটা ফ্যামেলি ঘরে খিল দিল৷ তারা ভীত৷ তারা সমাজের এসব মানুষের সামনে পড়তে চায় না৷ এক বাড়ীর এক বাচ্চা বলল মা ওরা এমন করছে কেন? তিনি সামনের জানালাগুলা বন্ধ করে বাবুটাকে একটা চড় কষলেন৷
বাবুটা গাল ডলতে ডলতে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো৷ সে বুঝলো না এই চড় সে কেন খেলো৷ মানুষগুলোর অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি তার মজাই লেগেছিল৷
ইরার জামাই ইরা কে বললেন আমিই এদের খবর দিয়েছি৷ তুমি বাচ্চাটাকে ওদের কাছে দিয়ে দাও৷ তাহলে সব চুকেবুকে যাবে৷ আমরা নতুন করে সব শুরু করবো৷
ইরার সন্তান তখন হাসিমুখে বাবা,বাবা করছে৷ ইরা নিঃশব্দে বিছানা থেকে উঠে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ডায়নিং এ আসলো৷ ইরার শ্বাশুড়ী কুৎসিত একটা গাল দিয়ে ছেলেকে বলল ঐডারে ছিনায়ে নে আর মা…রে ঘরের থাইকা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের কর৷
বাধ্য ছেলে তাই করতে গেলো৷
মিটসেফের নিচ থেকে ধারালো বটি টা বের করে ইরা বলল খবরদার কেউ বাচ্চাটাকে ছুলে কল্লা নামায়ে দেব৷
শ্বাশুড়ী বললেন ডাইনী কয় কি? বংশের মুখে চুন কালি মাইখা…

চুপ৷ চুপ থাক তুই… ইরা গলা চড়িয়ে বলল৷ নইলে তর ছেলের সাথে এক কোপে তর কল্লাটাও ফালায়ে দিব হারামজা…
ছ’টা মাস আমি সব সহ্য করেছি শুধু তগো মনোভাব পরিবর্তন করার জন্য! কিন্তু তরা হিপক্রেটস৷ আজ বুঝলাম তগো দ্বারা কিছু হবে না৷ তর পোলানা এনজিও চালায়৷ হিজরা রা আমার মা, আমার বোন বলে! ওর ঘরে এইটা পয়দা হইছে আর রোখ পাল্টায়ে গেছে, না!
আর তুই! তুই তো শিক্ষিত৷ সভা করছ সেমিনার করছ৷ আর্ত মানবতার সেবায় ঝাঁপায়ে পরস৷ বিদেশীগো লগে হাত কচলায়া কথা কস, হারামী৷

একদিন এই বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকায়ে দেখছস৷ দেখছস? আল্লা ওরে এমন বানাইছে ওর কি দোষ৷

হেই শালারপুত! সন্তান কি আমি একলা জন্ম দিছি৷ তর কোন অবদান নাই?
আমি ইরা হিপক্রেটসদের মাঝে থাকবো না৷ সমাজের পঙ্কিলতায় এই বাচ্চাটাকে বিসর্জন দিব না৷ পারলে ঠেকা!
এই বলে ইরা তার স্বামী, শ্বশুড়-শ্বাশুড়িকে রেখে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো৷ তার একহাতে বটি আর অন্য হাতে বাচ্চাটা৷

xxx

ফ্লাটবাড়ীর নিচে উৎসুক জনতা আর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের উৎকট নাচানাচি৷ ওরা বাচ্চা নেবার জন্য টাকা পেয়েছে৷ বাচ্চা না নিয়ে যাবে না৷

এলোচুলের ইরাকে নেমে আসতে দেখে ওদের একজন বলল ঐ যে আসে!
দু’তিন জন বিচিত্র ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়৷ ঢোলে ঘা তীব্রতর হয়৷
ইরা বটি উঁচিয়ে ধরে চিৎকার দেয়৷

তারপর বাচ্চাটাকে ফ্লোরে নামিয়ে রাখে৷ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা স্তব্ধ৷ এমন রণরঙ্গীনি মা ওরা কখনও দেখেনি৷
ইরা চিৎকার করে বলে
তোমাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন আছে৷ জবাব দিতে পারলে বাচ্চা তোমাদের হাতে তুলে দিবো৷ আর না পারলে তোমরা চলে যাবে৷

সবাই নীরব৷ শুনতে চায় ইরা কি বলে৷

ইরা বলে এই বাচ্চা ন’মাস পেটে ধরে জন্ম দিয়েছি৷ অবুঝ দুধের শিশুটার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই সে কে? শুধু আমি জানি এ আমার সন্তান, আর আমি তার মা৷
যে জীবন তোমরা পেয়েছো সমাজের কাছ থেকে; সেই জীবন কি এই শিশুটিকে তোমরা দিতে চাও?
আমি চাই না ৷ আমি চাই না আমার সন্তান এক সময় তার জন্মদাতার গাড়ির সামনে যেয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী করে হাত পাতুক৷ আমি চাই না কোন ভাবেই৷ আমি একজন মা৷ আমার সন্তানকে আমি সেটা দিতে চাই যেটা তার প্রাপ্য৷ আমি একে বড় করতে চাই ওর মতোই৷
তোমরা যদি তা না চাও নিয়ে যাও আমার বাচ্চাকে৷

বাইরে তখন পিনপতন নিঃশব্দতা৷ হঠাৎ একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এগিয়ে আসে৷ হাত জোড় করে বলে-
মা জননী আমরা চাই না৷ আমাদের জীবনের খেদ অবহেলা, অবজ্ঞা আমরা এই মাসুমকে দিতে চাই না৷ তুমি তোমার সন্তান তোমার কাছেই রাখো৷
যেদিন, যখন, যেখানেই হোক সমস্যায় পড়লে আমাদের স্মরণ কর৷ আমরা তোমার সাহায্যে এগিয়ে আসবো৷
মা জননী তোমার সন্তান কাঁদছে৷ তুমি তাকে বুকে নাও!

ইরার গন্ড বেয়ে অশ্রুধারা৷ সমবেত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও তাই৷ একজন এগিয়ে এসে ইরার পায়ের কাছে মুট করে কিছু নোট রাখলো৷ বলল মা জননী অন্যভাবে নিও না৷ আমাদের আশীর্বাদ মনে করো৷ তোমার সন্তানের জন্য৷ আমরা কখনও কাউকে কিছু দেইনি৷ আজ থেকে শুরু করলাম৷ তোমার মতো যে জননীরা তার বাচ্চাকে এই অমানুষিক দুনিয়া থেকে মানুষের দুনিয়ায় নিতে চাইবে আমরা তার পাশে যেয়ে দাঁড়াবো!

দেখতে দেখতে ইরার পায়ের নিচে টাকার স্তুপ জমে গেলো৷ ইরা ওখান থেকে একটা নোট উঠিয়ে নিলো৷
বলল এটা রাখলাম আশীর্বাদ হিসেবে৷ যদি কখনও এই বাচ্চাকে যোগ্য মানুষ করে তুলতে পারি, এটা তাকে দিবো৷ তোমাদের কথা বলবো…ইরা তার সন্তানকে পরম মমতায় বুকে চেপে ধরলো৷

xxx

ত্রিশ বছর পর৷
বিশিষ্ট সমাজ সেবী মামুন চৌধুরি, পত্রিকায় একটা খবর দেখলেন৷ প্রখ্যাত পরিচালক ইরা সামা’র নতুন ছবি বাংলাদেশের জন্য অভুতপুর্ব এক সন্মান জয় করে এনেছে৷ বিদেশী ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতেছে! অবশ্য ব্যক্তি হিসেবে ইরা সামা তৃতীয় লিঙ্গের৷ আর সে এটা গর্ব করেই বলে৷

মামুন চৌধুরী মনে মনে ভাবলেন একটা সংবর্ধনার আয়োজন করতে হবে৷ এবং এর মাধ্যমে অনেককেই তিনি চমকে দিতে পারবেন…৷ তিনি ভুলে গেছেন অনেকদিন আগে ইরা নামে তার একজন অর্ধাঙ্গিনী ছিলেন!

xxx

ইরা সামা তার মায়ের দেওয়া সেই দশটাকার নোটটা খুব যতনে তার কাছে রেখে দিয়েছে৷

(সমাপ্ত)

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন