একজন পীর , বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সৌভাগ্যবান কুকুরের গল্প

মোঃ আতিকুল ইসলাম

এক 

ছোটবেলায় প্রায়ই যে প্রশ্নটার মুখোমুখি হতাম তা হলো –তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও ? ‍উত্তরে কখনো ডাক্তার,কখনো ইন্জিনিয়ার বা শিক্ষক বলতাম । স্কুল জীবনে বাংলা দ্বিতীয় পত্রে ‘‘আমার জীবনের লক্ষ্য” বা ইংরেজিতে দ্বিতীয় পত্রে “Aim in Life’’ রচনাতেও ডাক্তার বা ইন্জিনিয়ার হতে চাওয়ার কথা লিখতাম । কিন্তু আসলে কি হতে চাইতাম তা বলা মুশকিল ।

চৈত্রের দুপুর ।খাঁ খাঁ রোদ্দুর । স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি। প্রচণ্ড পানির পিপাসা । এই সময় ডুগডুগি বাঁজাতে বাঁজাতে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আইসক্রিমওয়ালা । আইসক্রিম কিনব ।পকেট তখন গড়ের মাঠ । এই সময় মনে হয়েছিল ,বড় হয়ে আইসক্রিমওয়ালা হব । সারাদিন ঘুরে বেড়াব আর আইসক্রিম খাব একটার পর একটা ।

নীল আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের ওড়াওড়ি দেখে ভাবতাম, কতই না স্বাধীন জীবন ওদের । স্কুল নেই ।শিক্ষকের কড়া ধমক বা পিটুনী নেই । নেই বাবার রাঙা চোখ বা মায়ের বকুনী । তখন আল – মাহমুদের মত বলে উঠতাম:

‘‘তোমরা যখন শিখছো পড়া

মানুষ হবার জন্য,

আমি না হয় পাখিই হব

পাখির মত বন্য ।”

কখনো কবি নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে বলতাম;

“আমি হব সকাল বেলার পাখি

সবার আগে কুসুম বাগে

উঠব আমি ডাকি ।”

অথবা রবি ঠাকুরের মত:

“মা যদি হও রাজি

বড় হয়ে আমি হব খেয়া ঘাটের মাঝি” ।

দুই

তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, আমাদের সাথে পড়ত এক সুন্দরী বালিকা। আসলেই সে সুন্দরী ছিল, নাকি প্রতিদিন নতুন নতুন পোষাক পড়ায় সুন্দরী মনে হত জানিনা । ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বা টিফিন আওয়ারে আমাদের বন্ধু মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ঐ সুন্দরী ।খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম তার বাবা একজন স্কুল মাষ্টার । একজন স্কুল মাষ্টারের বেতন কত ? পরে জানতে পারলাম তার বাবা নট অনলি স্কুল মাষ্টার বাট অলসো পীর ও বটে ।

পীরের বাড়ি বার্ষিক ওরশ মাহফিল । পীরের মেয়ের সহপাঠী হিসেবে দাওয়াত পেলাম ওরশ মাহফিলের । মাহফিলে গিয়ে তো আমার চোখ চরকগাছ । পীরের অসংখ্য ভক্ততে গিজগিজ করছে বাড়ী । ভক্তরা পীরের জন্য হাদিয়া নিয়ে এসেছে –গরু,ছাগল,হাঁস,মুরগী,ভেড়া । পীরের ব্যবহারের জন্য পাজামা,পান্জাবি । পীরের সারা বছরের খাওয়ার জন্য এনেছে চাল,ডাল,সিগারেট । পীরের বউয়ের জন্য শাড়ি,ব্লাউজ । পীরের ছেলে মেয়ের জন্য জামা কাপড় ।

চুল দাড়িতে জটা ধরা অনেক ভক্ত পীরের বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় বসে গাঁজা খাচ্ছে । কেউ কেউ একতারা,খন্জনী হাতে নিয়ে ভক্তি সঙ্গীত গাইছে । কেউবা খাসি যবেহ করে ভক্তদের জন্য খাবার রান্না করছে । পীরের বাড়িতে সে এক এলাহি কাণ্ড । বুঝতে পারলাম একজন স্কুল মাষ্টার ওরফে পীরের আয়ের উৎস । তার মেয়ের হাল ফ্যাশনের নিত্য নতুন জামা পরার রহস্য ।

এর কয়েক দিন পর ক্লাসে এক শিক্ষক আমাকে জিঙ্গেস করলেন-বড় হয়ে কি হতে চাও ?

-স্যার, পীর হতে চাই ।

উত্তর শুনে স্যার থ হয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে । কেন পীর হতে চাও ? বলতে ভুলে গেলেন তিনি ।

আড় চোখে তাকিয়ে দেখি পীর তনয়া কটমট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । দু চোখে তার ইটের ভাটার আগুন ।

তিন

এবার একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের গল্প । তবে এই গল্পের আগে ছোটবেলার পড়া সৈয়দ মুজতবা আলীর পাদটীকা গল্প । যার মূল কথা এরকম ঃ গ্রামের পাঠশালার একজন পণ্ডিত । আট সদস্যের বিশাল পরিবার । বেতন মাত্র পঁচিশ টাকা । পঁচিশ টাকার বিনিময়ে সারা মাস ছাত্রদের শিক্ষা দেন । একদিন পাঠশালা পরিদর্শনে এলেন একজন লাট সাহেব । লাট সাহেবের সাথে তার পোষা কুকুর । কুকুরের চার পা থাকলেও লাট সাহেবের এই কুকুরটির ছিল তিন পা । যাই হোক পরিদর্শন শেষে লাট সাহেব চলে গেলে পণ্ডিত জানতে পারলেন-লাট সাহেবের এই তিন পেয়ে কুকুরের পিছনে মাসে পচাঁত্তর টাকা খরচ করা হয় । এটা জেনে পণ্ডিত মশাই মনের দুঃখে তার ছাত্রদেরকে বলেছিলেন;অপিচ আমি,ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধমাতা,তিন কন্যা,বিধবা পিসি দাসি একুনে আটজন । আমাদের সকলের জীবন ধারনের জন্য আমি মাসে পাই পঁচিশ টাকা । এখন বল দেখি, তবে বুঝি তোর পেটে কত বিদ্যে ,এই ব্রাহ্মণ পরিবার লাট সাহেবের কুকুরের ক’টা ঠ্যাঙের সমান ?

এ গল্প অনেক আগের । আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থা গ্রামের এ পন্ডিতের মত নয় । তাদের আছে মোটা অংকের বেতন,গবেষণা ভাতা,নানা প্রকল্প, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের মাধ্যমে উপার্জন, ব্যবসা এবং আরও কত কি ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার বিভাগেরই একজন শিক্ষক । যাঁর একটি পোষা কুকুর আছে । প্রতিদিন কুকুরটিকে কেজি দুই মাংস খাওয়ানো হয় । দেওয়া হয় নিয়মিত ভ্যাকসিন । গোসল করানো হয় নামী-দামী শ্যাম্পু দিয়ে । ছাঁদের উপর কুকুরের জন্য করা হয়েছে ছোট্ট একটি কক্ষ । আল্লাহ সুমতি দিলে হয়তো কক্ষটিকে এসি ও লাগাবেন ! এটি কি প্রাণির প্রতি ভালোবাসা ? নাকি বিলাসিতা ! যে শিক্ষক তার কুকুরকে দৈনিক দুই কেজি মাংস খাওয়ায় তাঁর বাড়ির পাশের বস্তির শত শত বনি আদম কুরবানির ঈদ ছাড়া সারা বছর মাংস খেতে পায় না । শ্যাম্পুতো দুরের কথা,সাবানের অভাবে মাথা পরিষ্কার করে এটেল মাটি দিয়ে । ভ্যাকসিন তো দূরের কথা । সস্তা ঔষধের অভাবে অনেক কঠিন রোগকে সঙ্গী করে রিক্সার প্যাডেলে পা রাখে জীবনের চাকা ঘোরাতে ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের এই পোষা কুকুরটির সৌভাগ্য আমার হিংসে হয় । এই শিক্ষক ও ক্লাসে মাঝে মাঝে জিঙ্গেস করেন-

তোমরা কি হতে চাও ?

এ সময় শিক্ষকের সৌভাগ্যবান কুকুরটির কথা মনে হলেই বলতে ইচ্ছে করে-

স্যার,আপনার বাড়ির কুকুর !

লেখকঃ সাহিত্যিক ও ব্যাংকার

আরও পড়ুন