অটিস্টিক শিশু

তাজ রহমান

নীলা ও তৌফিক এর বিয়ে হয় পারিবারিকভাবে।বিবাহিত জীবনে নীলা ছিল খুব সুখী। তৌফিক পেশায় সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তি। আর নীলা ইংরেজিতে মাস্টার্স পাশ।শ্বশুর,শাশুড়ি, দেবর,ননদ, প্রতিবেশী সকলেই নীলাকে খুব ভালোবাসতো।নীলাও তৌফিকের পরিবারের সকলকে আপন করে নিয়েছে।বিবাহিত জীবনের দের বছরের মাঝে নীলার কোল জুড়ে আসে এক মেয়ে সন্তান। যেদিন থেকে তৌফিক জানতে পারে ওদের কন্যা সন্তান হবে, সেই দিন থেকে সে নীলাকে জান্নাতের মা বলে ডাকতো।কারণ কন্যা সন্তান হচ্ছে আল্লাহর রহমত।

যেদিন হাসপাতালে জান্নাতের জন্ম হয়, সেদিন কিছুক্ষণ পরেই ডাক্তার বললেন বেবিকে একটু স্পেশাল অবজারভেশনে রাখতে হবে।নীলা তখনও বাচ্চাকে কোলে পায়নি।বেশ কিছু সমস্যা ছিল বলে এইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে চললো বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা । রিপোর্ট এলো। ডাক্তার বলল শিশুটির বেশ কিছু সমস্যা আছে । হয়তো সে প্রতিবন্ধী বা অটিজমের শিকার হতে পারে। সবার মনে কালো মেঘের মত কষ্টগুলো ঘনীভূত হলো।নীলার কান্না, আহাজারি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। সে তো সবার মতই একটা সুস্থ বাচ্চা চেয়েছিল। খুব ভেঙ্গে পড়েছিল নীলা। তবুও সে আশায় বুক বাঁধে। পথ চলতে হবে। বড় করতে হবে এই শিশুটিকে।ডাক্তার নীলাকে বলে চিকিৎসা চালিয়ে গেলে এবং সৃষ্টিকর্তা চাইলে সে সুস্থও হতে পারে।

চিকিৎসা চলতে থাকে জান্নাতের। এদিকে তৌফিকের পরিবারের সকলে আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে জান্নাত ও নীলার দিক থেকে। তৌফিকও জান্নাতকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। এমনকি নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে অনীহা প্রকাশ করে। একদিন নীলা জান্নাতকে নিয়ে একাই ডাক্তারের কাছে যায় । সেদিন ডাক্তার জানায় জান্নাত অটিস্টিক শিশু। তখন জান্নাতের বয়স দুই বছর।
ডাক্তার নীলাকে বলে, অটিজমে আক্রান্ত শিশু মানেই মানসিক প্রতিবন্ধি নয়, নয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধীও। আপনার-আমার বুদ্ধাঙ্ক যেমন কম-বেশি হয়ে থাকে,অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়ে থাকে। বরং অটিস্টিক শিশুরা কেউ কেউ ছবি আঁকা বা গনিতে স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় অনেক ভালো হয়ে থাকে। অটিস্টিকদের উন্নয়নে রয়েছে বিভিন্ন থেরাপি। যা তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অনেকটা সহায়তা করে। তাদের সাথে স্বাভাবিক শিশুর মতো আচরণ করলে এই অটিস্টিক শিশুরাও স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে।

নীলা বাসায় ফিরে জান্নাতের বাবাকে জানায় জান্নাত অটিস্টিক শিশু। ওর চিকিৎসা করালেও পাবে একটি স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু তৌফিক বলল তোমার মেয়ের চিকিৎসা তুমি করাও আমি পারবো না।
নীলা একটুও অবাক হল না। শুধু মুখে একটু হাসি নিয়ে বলল, যে জান্নাতকে না দেখে তুমি আমাকে জান্নাতের মা বলে ডাকতে। যাকে তুমি না দেখে মা বলে ডাকতে। আজ সেই জান্নাত আমার মেয়ে হয়ে গেল শুধুমাত্র অটিস্টিক শিশু হওয়ার কারণে।তুমি ওকে ফেলে দিলেও আমি ফেলে দিব না। আমি ওকে গড়ে তুলবো আর্টিস্টিক শিশু নয়, গড়ে তুলবো একজন স্বাভাবিক শিশু হিসেবে। গড়ে তুলব একজন মানুষ হিসেবে। আমি ওর চিকিৎসা করাবো।
তৌফিক এবং ওর পরিবার জানিয়েদিল তাদের সঙ্গে থেকে সে জান্নাতের চিকিৎসা করাতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়ে নীলা তৌফিকের সংসার ছেড়ে চলে আসে বাবার বাড়ি।

নীলা অনেক কষ্টে একটি কলেজে ইংরেজি শিক্ষিকা হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করে। চাকুরীতে যোগদানের পর নীলা বাবার বাড়ি ছেড়ে বাসা ভাড়া নেয় এবং সেখানে থেকেই জান্নাতের চিকিৎসা চালায়।

জান্নাতের বয়স এখন চার বছর। এই দুই বছরে তৌফিকের পরিবার একটিবারের জন্য জান্নাতের খোজ নেয়নি।অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো জান্নাত দৌড়াতে পারে না, কিন্তু গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে পারে। নীলার শেখানো কথায় বেশ সাড়াও দিতে পারে। বই দেখে ক খ পড়তে পারে। খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। নীলা ভাবে, হ্যাঁ জান্নাত অটিস্টিক শিশু। কিন্তুকোথায় তার অস্বাভাবিকত? অন্য শিশুদের চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেইতো আমার জান্নাত।

একে একে কেটে যায় আরও দশটি বছর। জান্নাত এখন চৌদ্দ বছরের কিশোরী। সাত বছর বয়সের পর থেকে জান্নাতকে নীলা ভর্তি করে দেয় স্বাভাবিক বিদ্যালয়ে।সেখানে জান্নাত অন্য বিষয়ে খারাপ করলেও বরাবর ছবি আঁকা ও গণিতে ভালো নাম্বার পায়।

জান্নাতের বিদ্যালয় থেকে জান্নাত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়ে বিজয়ী হয়
। তাই নীলা জান্নাতকে নিয়ে যায় বিভাগীয় পর্যায়ে চিত্র অংকন প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণের জন্য।

সেই প্রতিযোগিতায় জান্নাত প্রথম হয়। সেই প্রতিযোগিতার বিচারক প্যানেলের একজন ছিলেন জান্নাতের বাবা। যিনি জানতেন না যে জান্নাত তারই মেয়ে। তিনি ভুলে গেছেন যে জান্নাত নামে তার একটি কন্যা সন্তান ছিল।

তাজ রহমানঃ লেখক ও শিক্ষক

 

আরও পড়ুন