বুদ্ধিমতি মা

সুস্মিতা মিলি

নিশি, ও নিশি বাথরুমে কাপড়গুলি রেখেছি বাইরে রোদ থাকতে থাকতে ধুয়ে শুকাতে দিয়ে দাওতো, নাইলে দেরি হয়ে যাবে।
সকালে বিছানায় থাকতে থাকতেই আমি মায়ের চিৎকার শুনতে পেলাম।আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। নিশি আমার বৌ,মাত্র দেড়মাস হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। নিশির গা থেকে এখনো নতুন বৌএর গন্ধ যায়নি আর মা ওকে দিয়ে সংসারের প্রায় সকল কাজই করিয়ে নিচ্ছেন।

আমি দাঁত মাজার উছিলায় বাথরুমে ঢুকে গেলাম।গিয়ে
দেখি এলাহি কারবার! যেন পুরো ধুপা বাড়ি তুলে এনেছে! আমি বুঝতে পারলাম না মা বৌ আনলেন নাকি কাজের বুয়া।
ছোট ছোট নরম হাতগুলো দিয়ে নিশি কাপড়ে সাবান লাগাচ্ছিলো। কি সুন্দর ছোট ছোট নরম হাত! সাবান দিয়ে কাপড় ধুলে এই সুন্দর্য থাকবে? একটা দুটো নয় তিন, তিন বালতি কাপড়!
এটা কেমন কথা! সকাল সকাল আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।বেচারী! বাপের বাড়ীতে মনে হয় এইসব কাজ করে অভ্যেস নেই।দেখি বাথরুমের তিন বালতি কাপড়ের সাথে নিজেও ভিজে চুপচুপা হয়ে আছে।
আহারে! নতুন বৌটা আমার, যদি ঠান্ডা লেগে যায়!

আমাকে দেখেই নিশি মুচকি হাসলো!হাসলে প্রীতি জিন্তার মতো গালে টোল পড়ে।ছবিতে বুঝা যায়নি।এই হাসি দেখে আমার হৃদয়ে যেন একটা শেল বিঁধলো।কি সুন্দর করে বৌটা আমার হাসে!
আমি বুঝতে পারলাম না ওকে মা এনেই কি ঝামেলায় ফেলে দিলো! কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলেই পারতো।
আমি ওকে সরিয়ে দিয়ে কাপড়গুলি কাঁচতে লাগলাম।আর ইশারায় ওকে চুপ থাকতে বললাম। নিশিও ভালো মেয়ের মতো চুপ থেকে আমাকে সাহায্য করলো।কাপড় কাঁচতে কাঁচতে মনে হলো, ভাগ্যিস ছেলে হয়েছিলাম মেয়ে হলে আমাকে প্রতিদিন শ্বশুর বাড়িতে এভাবেই কাপড় কাঁচতে হতো।

কাপড়গুলো কেঁচে রোদে শুকাতেও নিশিকে সাহা্য্য করলাম। এসব দেখে আমার অতি শান্ত মা তার সুন্দর মুখটা ভার করে রাখলেন।বললেন বৌএর কষ্ট সহ্য হয়না, না!
আমি একটা শয়তানী হাসি দিয়ে বললাম,একটা মাত্র বৌ, সাহায্য না করলেতো পালায়া যাইব,তখন তোমার কি গতি হইব মা!
মা হেসে ফেললেন।আর আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম।
নাশতা করে অফিসে চলে গেলাম আর সারাদিন আনমনে ভাবতে লাগলাম
নিশিকে দিয়ে মা আর কি কি কাজ করাতে পারে।ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠলাম।এত সুন্দর একটা মেয়ে তাকে দিয়ে মা কত কাজই না করাচ্ছেন।আহারে!আহারে!

অথচ এই নিশিকে ছেলের বউ করার জন্য মা একবছর অপেক্ষা করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতে একটা বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে মা নিশিকে দেখেছিলেন।খুবই সাদামাটা মেয়ে নিশি কিন্তু আমার মা এই মেয়ের মাঝে কি দেখলেন কে জানে, তিনি বিয়ে বাড়ীর সকল আয়োজন রেখে নিশির চৌদ্দপুরুষের খবর নিলেন। তিনি পণ করলেন একমাত্র ছেলেকে যদি বিয়ে করান তাহলে নিশিকেই করাবেন। নইলে ছেলে চিরকুমার থাকুক।

চাকরি হওয়ার পর আমার জন্য কত জায়গা থেকে যে বিয়ের সমন্ধ আসলো,কিন্তু মায়ের এক কথা, ঘটা করে কোন মেয়ে তিনি দেখবেন না। তার ছেলে কি এমন রসগুল্লা যে,তার জন্য জায়গায় জায়গায় মেয়ে দেখে বেড়াবেন! মেয়েরাকি এত সস্তা নাকি। দেখবেন আবার পছন্দ না হলে মেয়েটাকে বলবেন যে তাকে পছন্দ হয়নি!তিনি এই কাজ কখনো করবেন না।

যে মেয়ে তার ছেলের বৌ হবে তাকে তিনি প্রথম দেখাতেই চিনতে পারবেন। নিশির মায়ের কাছে তাইতো সরাসরি আমার মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন।সেখানে গিয়ে আমার বায়োডাটা দিয়ে সরাসরি বললেন,

–আপা এটা আমার একমাত্র ছেলে টুটুল।এইবার বিসিএস দিয়ে সরকারী অফিসার হয়েছে। আমাদের বংশ পরিচয়ও অনেক ভালো।শুধু আমার ছেলেটা অনেক অলস।পড়ালেখা ছাড়া জগত সংসারের কোন কাজ সে পারেনা।কিন্তু খুব সৎ আর নিষ্ঠাবান ছেলে।
আপনার মেয়ে নিশিকে আমি চাই। আমার ছেলের বৌ বানাবো তাকে। নিশির মা আমার অতি আবেগপ্রবণ মাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—নিশিকে আপনি কোথায় দেখেছেন? আমার এই মেয়েকেই কেন আপনার পছন্দ?
আমার মা সরাসরি বললেন,

—- বিয়ে বাড়ীতে আপনার মেয়ে আর আমি এক টেবিলে বসে খাচ্ছিলাম।সকলের খাওয়া শেষ,সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছে কিন্তু আপনার মেয়েকে দেখি প্লেট ভর্তি হাড্ডি নিয়ে সবকিছু ভুলে চুষে চুষে হাড্ডি খাচ্ছে।সকলে বিয়ে শাদিতে কত খাবার অপচয় করে কিন্তু নিশিকে দেখলাম সকল খাবার খেয়ে প্লেটটা মুছে মুছে খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে।আমি আপনার মেয়েকে দেখে ভাবলাম বেচারির মনে হয় পেট ভরেনি তাই জিজ্ঞেস করলাম আরেকটু খাবার খাবে কি না,সে লাজুক হাসি দিয়ে বললো,

—আন্টি আমারতো খাওয়া শেষ।আর খাবার নিলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।খাবার নষ্ট করাতো ভালো নয়।তাই শুধু হাড্ডিগুলো খাচ্ছি। সাথে সাথেই আমি ভেবে নিয়েছি আমার অকর্মার ঢেঁকির সাথে এই মেয়েই ঠিক আছে।লক্ষি একটা মেয়ে।আমার মতো ভান ভনিতা নেই।

কিন্তু নিশির মা অতি বিনয়ের সাথে বললেন যে, তার বড় মেয়ে দিবার এখনো বিয়ে হয়নি। দিবা মানে নিশির বড় বোনকে বিয়ে না দিয়ে তিনি ছোট মেয়ের বিয়ে দেবেন না। তবে তাদের ছেলে খুব পছন্দ হয়েছে।যদি দিবার বিয়ে পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তাহলে নিশিকে তারা অন্য কোথাও বিয়ে দেবেন না।

আমার মা নিশির মায়ের কাছ থেকে কথা আদায় করলেন যে,নিশিকে আর কোথাও বিয়ে দিবেন না।
তারপর মেয়ের একটা ছবি নিয়ে বাড়িতে চলে আসলেন। ছুটিতে বাড়ি এলে মা নিশির ছবিটা দেখিয়ে আমাকে বললেন,
—এই দেখ বেটা ,এই মেয়েটার নাম নিশি।আমি তোর জন্য পছন্দ করেছি। এই মেয়েকে আমি বৌ করে আনবো।

আমি ছবি দেখলাম, মোটামোটি চেহারার ভীষণ রোগা এক মেয়ে। তবে মেয়েটার চোখগুলো যেন বনলতা সেনের মতো, টানা টানা। চুলগুলোও অনেক লম্বা।আমি ছবি দেখে আমতা আমতা করে বললাম,

–এতো রোগা মেয়ে!এই মেয়েতো বাতাসে ভেসে যাবে।
মা রেগে গেলেন এই কথা শুনে,তিনি রেগে বললেন,

–বৌ কি কোরবানির গরুর মত জবাই করে গ্রামের মানুষকে খাওয়াবি যে মোটাতাজা মেয়ে দরকার?

আমি ভয়ে আর কথা বারাইনি।বাবাও কোনদিন মাকে কিছু বলতে পারেননি আর আমি সেই বাবার ছেলে হয়ে মাকে কি বলবো!আমার কি সেই সাহস আছে!

নতুন বিয়ে করেছি,মা আগেই বলেছেন বিয়ের পর পাঁচমাস বৌকে গ্রামের বাড়িতে মায়ের কাছে রাখতে হবে। বৌ আর শাশুড়ি কিছুদিন একসাথে থাকবেন।আমি প্রতি বৃহষ্পতিবারে অফিস করেই বাড়িতে চলে আসি।দুদিন থাকি আর নিশিকে দেখে অবাক হই।শহরের মেয়েরা গ্রামে এসে থাকতে চায়না আর এই মেয়ে উল্টা তার গ্রামের সবকিছুই ভালো লাগে।আমি একদিন অবাক হয়ে দেখি হাঁসের জন্য ভাতের মাড় দিয়ে সে কুড়া মাখাচ্ছে।
দিব্যি পুকুরে গোছল করছে।বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে সাঁতার কাটছে।গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে লবন মরিচ মাখিয়ে খাচ্ছে।শুধু রাতে বদনা নিয়ে বাইরে যেতে ভয় পায়।কিছুটা লজ্জাও পায়।

রাতে আমার পাশে শুয়ে শুয়ে বাড়ির সকলে তাকে কত ভালোবাসে তা শুনায়।
বিশেষ করে আমার বাবা আর মায়ের বিরাট ভক্ত হয়ে উঠেছে।আমি তাকে বললাম,সামনের মাসে কোয়ার্টার পেয়ে যাবো। শুনে তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো,বললো সে গ্রামেই থাকতে চায়। আমি বললাম আমারতো বৌ দরকার। একা একা কোয়ার্টারে আমি থাকতে পারবোনা।

আবার সকালে উঠেই শুনি মা চিল্লাচিল্লি শুরু করেছে।গ্যাস শেষ হয়ে গেছে তাই নিশিকে তিনি বলছেন মাটির চুলায় রান্না বসাতে।নিশিও ঘুম থেকে উঠে লক্ষি মেয়ের মতো রান্না ঘরে মাটির চুলায় রান্না করতে গেলো আর আমার হলো মেজাজ খারাপ।কোথায় ছুটিরদিনে বৌয়ের সাথে একটু সময় কাটাবো! মায়ের জন্য কিছুই পারছিনা।প্রতি সপ্তাহে এসে দেখি সারা সপ্তাহের কাপড় ভিজিয়ে ধুতে দেয়।তারপর রান্না বান্নাতো আছেই!কিন্তু বেক্কল বৌটা মুখবুজে সব কাজ করতে চায়।আমার খারাপ লাগে তাই কাপড়গুলো আমিই ধুয়েদিই।সন্ধ্যায় এগুলো ভাজকরে নিশি আলমিরাতে তুলে আর আমি ওকে সাহায্য করি।

আমি চোখ কচলাতে কচলাতে রান্না ঘরে যাই।রান্না ঘরে গিয়ে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো, বেচারি ভিজা লাকরি চুলায় দিয়ে ফুঁ দিতে দিতে ফুসফুস খালি করে ফেলছে আর ধোঁয়ায় অনবরত তার চোখদিয়ে পানি পরছে।আমাকে দেখেই একটা হাসিদিলো পাঁজি মেয়েটা।আমি অভিমানি গলায় বললাম,
–তোমারতো গ্রাম ভালো লাগে তবে ধোঁয়ায় কাঁদছ কেন?তারপর ওকে সরিয়ে দিয়ে শেখাতে লাগলাম কিভাবে ছোট ছোট শুকনো কাঠদিয়ে আগুন জ্বালাতে হয়।তারপর ওকে সাথে নিয়ে রান্না করতে বসলাম।দুজনে মিলে খুব ভালো একটা সময় কাটালাম।

খেতে বসার পর দেখি নিশি গ্রামের বৌদের মতো সবাইকে তদারকি করছে।চারজন মোটে মানুষ আমরা।নিশি পরে একা একা খাবে এটা আমি কোনমতে মানতে পারছিলাম না।
আমি উঠে গেলাম,

— মা বললেন কি রে খাবিনা!
–গেস্টিকের ঔষধ খাবো, আধাঘন্টা পরে খেতে হবে বলেই, মায়ের উপর অভিমানে দুঃখে রুমে চলে এলাম।আমি আমার বাবা মাকে চিনতে পারছিনা।এতো ভালোবেসে একটা মেয়েকে এনে কেউ এতো কষ্ট দেয়!!
সবাই নিশিকে ফেলে খেয়ে উঠুক।আমি ওকে সাথে নিয়েই খাবো।আহারে আমার বৌটা মায়ের জন্য কতইনা কষ্ট করছে!।একটু পর দেখি নিশি গোছলকরে শাড়ী পড়েছে। হালকা কাজল দিয়ে সেজে নাশতা নিয়ে রুমে এলো।মুচকি মুচকি হাসছে।ওর হাসি দেখে রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে, মক্কল মহিলা, এতো কষ্টের পরও দাঁত বের করে হাসে।

আমি ওকে বললাম মাত্র তিনমাস হলো, মায়ের কথামতো পাঁচমাস তোমাকে আমি গ্রামে রাখবোনা।দরকার হলে মা বাবাকে আমাদের সাথে নিয়ে রাখবো।

নিশি সাথে সাথেই আমার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো।বললো,
—মাকে নিয়ে একটা কথাও বলবেনা প্লিজ।আমি আমার জীবনে এমন ভালো মনের মানুষ দেখিনি।

—যার জন্য করলাম চুরি সেই বলে চোর।রেগেমেগে আমি বলি।

—-মা যা করছেন শুধু আমাদের দুজনের ভালোর জন্যই করছেন। যেন আমরা দুজন সকল বিপদে আপদে সুখে দুঃখে একসাথে ভালোবেসে মিলেমিশে থাকি।নিশি প্রগলভ হয়ে বলতে থাকে আর আমি অবাক হয়ে শুনতে থাকি।
নিশি বলছে,
–মা বলেন ছেলেগুলি থাকে অকর্মার হাড্ডি।এগুলিকে লাইনে আনতে কিছু পলিটিক্স করা লাগে।

— মা আমাকে দিয়ে কাপড় ধুয়ায় না, আমার উছিলায় তোমাকে দিয়ে কাপড় ধোয়ায় যেন একা বাসায় আমার ওপর কোন কাজের চাপ পড়লে তুমি আলসেমি না করে আমাকে ভালোবেসে সকল কাজে সাহায্য করো। তিনি তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন,
তুমি মায়ের পছন্দকে জবরদস্তি সম্পর্ক মনে করো কিনা।
তিনি চাইছেন আমি সকল কাজ শিখে তোমার সাথে যাই, যেন কাজের মানুষ না থাকলেও আমাদের খুব কষ্ট না হয়।
তিনি চান সকল কাজে আদর্শ হাসবেন্ডের মতো আমাকে হেল্প করো।
তিনি দেখতে চাইছেন তুমি বৌয়ের অত্যাচার হচ্ছে মনে করে মায়ের সাথে কোন বেয়াদবি করো কিনা।
মা আমাকে এসব তোমাকে বলতে নিষেধ করেছেন।কিন্তু আমি তোমাকে সবকিছু বলে দিলাম।
এতদিন আমরা বৌ শাশুড়ি মিলে দেখছিলাম তুমি মা আর বৌ এই দুটো সম্পর্ককে কিভাবে ব্যালেন্স করো।

লেখক : সাহিত্যক

আরও পড়ুন