বঙ্গদেশে ইহার পূর্বে কেহ কখনও কাশেনাই

বঙ্গদেশে ইহার পূর্বে কেহ কোনোদিনও কাশে নাই:

রামগরুড়ের ছানা
কাশতে তাদের মানা
কাশির কথা শুনলে বলে
কাশব? না না না না
সদাই মরে ত্রাসে
ঐ বুঝি কেউ কাশে…….

বহুকাল পূর্বে একদা আমরা বঙ্গসন্তানেরা হাসিতে হাসিতে কাশিতাম, ক্রন্দনে কাশিতাম, কাহারো গৃহে প্রবেশের মুহূর্তে সতর্ক করিতে কাশিতাম, শ্বাসনালীতে খাদ্য বিঁধিলে কাশিতাম, আর জল আগাইয়া দিতে দিতে বলিতাম, কেহ তোমায় স্মরণ করিয়াছে তাই এই কাশি। লজ্জায় কাশিতাম, নিজের উপস্থিতি জানাইতেও কাশিতাম, যক্ষ্মা, হাঁপানিতেও কাশিতাম……. আহা কী সুন্দর দিন কাটাইতাম! তখন বঙ্গদেশের মানুষের জন্য কাশিই ছিল হাস্যরসের বস্তু…….

আজ সেই কাশি আছে, সেই হাসি নাই।

ইহার পূর্বে রোগভুগিয়া কেহই মরিনাই। আমাদের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, মস্তিষ্ক, দন্ত অথবা দেহপিঞ্জরের অন্য কোনোখানে অন্য কোনো রোগ কোনদিনও বাসা বাঁধেনাই। এখনো বাঁধেনাই, ভবিষ্যতেও কোনোদিনও বাঁধিবেনা। এই বঙ্গদেশে বর্তমানকালে একটিমাত্রই রোগ, আর তাহার একটিমাত্রই পথ্য – দূরে থাকা।

কেহ কাহারো কাছে আসিবেনা; বিভিন্ন শ্রেণীপেশার সকলেই দূরত্ব বজায় রাখিবে।

দূরত্ব বজায় রাখিতে রাখিতে আমরা মানবতা হইতে অনেক দূরে সরিয়া যাইতেছি। মাতা-পিতা-সন্তান-আত্মীয় সকলেই অমানবিক হইয়া যাইতেছি। কেহ কাহারো প্রয়োজনেও কাছে আসিতেছিনা। এমনকি মাতা-পিতা সহ যে কোনো প্রিয়জনের মৃত্যুতেও আমরা যোজন-যোজন দূরত্ব বজায় রাখিতেছি। মাতাকে ফেলিয়া যাইতেছি জংগলে। লাশ হাসপাতালে ফেলিয়া পালাইতেছি……. পাছে পরিচয় দিয়া সমস্যায় পড়িতে হয়। লাশ দাফন করিতেছে পুলিশ, মাতাকে জংগল হইতে উদ্ধার করিতেছে পুলিশ। পুলিশ, ডাক্তার, দাফন কমিটি ইত্যাদির মাঝে যে মনুষ্যত্ব রহিয়াছে, তাহা আমার-আপনার মত সাধারণ মানুষের মাঝে আজ কোথায়? এতদিন শিখিয়াছিলাম, পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নহে। রোগকে ঘৃণা কর, রোগীকে নহে। এখন আমরা যেকোনো রোগের সহিত রোগীকেও ঘৃণা করিতে শিখিয়াছি।

আমি শনিগ্রহ হইতে পৃথিবীতে আসিয়াছি – ৬ মাস এইখানে অবস্থান করিব, ইহার পরে মানবজাতিকে মুক্ত করিয়া আবার ফিরিয়া যাইব – এমন কোন আশ্বাস করোনা দিয়াছে বলিয়া মনে হয়না। অন্য অনেক রোগের সহিত সাধারণ রোগ হিসেবেই সে রহিবে নীরবে এই ধরণীর বুকে। অন্য হাজারো রোগের ন্যায় হয়তো করোনাও সাধারণ একটি রোগ হিসেবে টিকিয়া থাকিবে। আর অন্য রোগের যেমন পথ্য আছে, করোনারও পথ্য রহিবে। সেই আশা লইয়াই মানবজাতি আগাইয়া চলিবে…….

ভুল- ভ্রান্তি মার্জনীয়। কেননা, নানান মুনির নানান মত থাকিবে, ইহাই বাস্তব সত্য।

 

লেখক – জোবায়দা সুলতানা,সহযোগী অধ্যাপিকা,আইন বিভাগ,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন