পাদুকা

 

আমি কিছুদিন একটা কোচিং এ পড়িয়েছি বিনামূল্যে। চার মাসের কিছু বেশি সময় পড়িয়েছি সপ্তাহে এক দিন। প্রতি শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ১২টা পর্যন্ত। এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব কিংবা উদারতা নেই। একজন মানুষের কারণে এই কাজটি আমাকে করতে হয়েছিলো। দেশে থাকতে ওনাকে ঠিকমতো ধন্যবাদ দেয়া হয়নি। আজ উনার গল্প বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কিছুটা চেষ্টা করবো।

আমার এলাকায় এক বড় ভাই লজিং থাকতেন। মজিদ ভাই (ছদ্মনাম), উনি বয়সে আমার বড় ছিলেন কিন্তু, আমাকে ভাই ডাকতেন এবং ‘আপনি’ করে সম্মোধন করতেন। অনেক যুদ্ধ করেও ওনাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ তে নিয়ে আসতে পারিনি। মজিদ ভাই খুবই দরিদ্র পরিবারে জন্মেছেন, ওনার বাবা নেই। একমাত্র মা ছাড়া আর কেউ নেই সংসারে। কোনরকমে মাথা গুঁজার একটি ঠাঁই রয়েছে – বাঁশ, নলখাগড়া দিয়ে তৈরী কাঁচা ঘরটিতে উনার মা কোনমতে টিকে আছেন। কোন জমিজমা কিছুই নেই।

মেট্রিক পাশ করার পরে এক বাড়িতে লজিং থেকে ইন্টার পাশ করেছেন। টুকিটাকি কিছু ইনকাম করেন, কিছু সহযোগিতা নিয়ে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। ইংরেজিতে খুবই দুর্বল কিন্তু, লেখাপড়ায় মারাত্মক আগ্রহ। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে পারেন। সারাদিন হাঁটেন, আমি কখনো উনাকে রিকশা চড়তে দেখিনি। একটি ইংরেজি শব্দ শেখার জন্য যে একজন মানুষ কয়েক ঘন্টা বসে থাকতে পারে এটি আমি মজিদ ভাইকে নাদেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। খুবই হালকা পায়ে হাঁটতেন; উনি নিজেও ছোটখাটো মানুষ, মাটির উপর এমনভাবে পা ফেলতেন মনে হতো যেনো মাটি ব্যাথা পেয়ে চিৎকার করে উঠবে এই আশংকায় আছেন। দিনে একবেলা খেতে পারলেও খুশী শুধু একটি ইংরেজি শব্দের অর্থ জানতে পারলেই ভূবনভুলানো এক‌টি হাসি দিতেন। টিভিতে রাত দশটার ইংরেজী সংবাদ শুরু হবার পাঁচ মিনিট আগ থেকেই টিভির সামনে বসে থাকতেন। ডিগ্রী পরীক্ষায় ইংরেজিতে ফেল করে মজিদ ভাইয়ের খুবই মন খারাপ। ওনার জীবনের দুটি স্বপ্ন – ডিগ্রী পাশ করা আর ইংরেজিতে কথা বলতে পারা। ফেল করলেও হাল ছাড়ার পাত্র মজিদ ভাই নন। যতবার প্রয়োজন পরীক্ষা দিবেন তারপরও উনাকে ইংলিশ এ পাশ করে গ্রাজুয়েট হতেই হবে।

মজিদ ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রটা বেশ মজার ছিলো। পাশাপাশি বাসায় থাকলেও মজিদ ভাইকে আমি চিনতামনা। আমি গিয়েছিলাম মেট্রিক পরীক্ষার্থী এক আত্মীয়কে নিয়ে পরীক্ষার সেন্টারে। সেখানে গিয়ে দেখি আমার এক হাইস্কুল ফ্রেন্ড এসেছে তার ভাগ্নীকে নিয়ে। অনেকদিন পর দুই বন্ধুর দেখা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কোথাও যাবনা, কেন্দ্রের বাইরে বেশ কিছু গাছপালা আছে ছোটখাটো পার্কের মত সেখানেই বসে আড্ডা মেরে সময় পার করবো। আরো অনেক অভিবাবক কোণায় কোণায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন। আমার হাতে থাকা মাসুদ রানার বইটি গুটিয়ে ফেললাম। পুরোনো বন্ধু সাথে আছে কীসের বই পড়া? চুটিয়ে সুখ দুঃখের গল্প শুরু হলো। আমাদের পাশেই দুজন মানুষ ইংরেজী গ্রামার বই খুলে বসেছেন এবং নেরেশন চেইন্জ নিয়ে কথা বলছেন। আমরা দুই বন্ধু এতটাই আড্ডায় মজে গেলাম যে পাশে থাকা ওদের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম।

বন্ধু বলছে:
আমাকে আইডিয়া দে, কয়দিন পরে আমার মনের মানুষের জন্মদিন। আমার সীমিত আয়ের কথা মাথায় রেখে বলিস, সেদিন ওকে কী গিফট করবো?

– সুন্দর দেখে একজোড়া জুতা গিফট করিস।

– কী? জুতা গিফট করবো? প্রেমিকার জন্মদিনে কেউ জুতা দেয়? তুই আমাকে এতটা আহাম্মক ভাবিস! তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে এরকম ক্ষ্যাত এক‌টি আইডিয়া দিলি?

রেগেমেগে আগুন হয়ে আরো অনেক কথা শোনালো বন্ধু আমার। আমি চুপচাপ সব শুনে গেলাম। সে শান্ত হবার পর বললাম:

আচ্ছা ধর! তুই খুবই দামী পোশাক পরিচ্ছদ পরে প্রস্তুত হয়েছিস একটা পার্টিতে যাবি। ব্রান্ডেড, দামী দামী সব কাপড়চোপর, ঘড়ি, টাই সব পরেছিস। চুল ব্যাকব্রাশ করা, দামী পারফিউম ঘ্রাণে মাতাল করে দিচ্ছে কিন্তু, তোর জুতা নেই – তুই খালি পায়ে যাবি না সেই পার্টিতে? যাবিতো?

সে আরো রেগেমেগে আগুন হয়ে গেল।

– কী বলছিস সব উল্টাপাল্টা? খালি পায়ে পার্টিতে যাবো? একটি মানানসই জুতা না থাকলে ব্যক্তিত্ব বজায় থাকে?

– এক্সাক্টলি, একটি মানানসই জুতা তোর ব্যক্তিত্ব বাড়িয়ে দিবে কয়েকগুণ। তোর পরনে এত দামী পোশাক পরিচ্ছদ থাকার পরও তুই ব্যক্তিত্বহীন কেবল জুতা নেই বলে। প্রায় উলঙ্গের মত অনুভূতি হবে কেউ যদি তোর জুতা কেড়ে নেয়। আচ্ছা, বলতো পুরো শরীরের ভার বহন করে কোন অঙ্গটি? তোকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় কোন অঙ্গটি? রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেয় কোন অঙ্গটি? কত চড়াই, উতরাই পার করে এই পা দুটি তোর সারা শরীরের ভার বহন করে। কাঁটা ফোঁটে কীসে? শামুকে কী কাটে? পা ভালো না থাকলে হাঁটতে পারবি? সাইকেল, বাইক চালাতে পারবি? এই পায়ের সুরক্ষা দেয় যে জুতা তাকে তুই এভাবে তাচ্ছিল্য করছিস? রুচিশীল জুতার ব্যবহার ব্যক্তিত্ব বাড়ায়। পায়ের সুরক্ষা দেয়, নানামুখী আঘাত থেকে পা’কে রক্ষা করে। হাতের ঘড়ি, গলার চেইন, আংটি, ব্রেসলেট এগুলোর চেয়ে শতগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে জুতা কেবল পরিধেয় হিসেবেই নয় শারিরীক সুরক্ষার ঢাল হচ্ছে এই পা-বন্ধনী। এর গুরুত্ব অন্যান্য অলংকারের চেয়ে হাজারগুণ বেশি। কানের দুল, নাকের ফুল, হাতের চুড়ি, আংটি, ঘড়ি – এগুলো না পরলে ব্যক্তিত্বের কোন ঘাটতি দেখা দিবেনা বরং এগুলো না পরাই আজকের ট্রেন্ড। কিন্তু, জুতা ছাড়া তুই অসহায়! তাছাড়া তুই যখন প্রেমিকার পাশে বসে গল্প করিস তখন নিশ্চয়ই ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকিসনা সারাক্ষণ? বেশিরভাগ সময়ই নীচের দিকে, পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকিস- এবার বল তুই কোনটা বেশি দেখিস? ওর চোখের কাজল নাকি পায়ের আঙ্গুল? বল? আমি তোর জায়গায় হলে জুতা’ই গিফট করবো।

রাগলে কখনো কখনো নিজের অজান্তেই মুখ থেকে ইংরেজি বের হয়ে যেতো, এই বদঅভ্যাসটি পেয়েছি জন্মসূত্রে। বন্ধুকে বলা আমার পুরো কথোপকথনটি ছিলো ইংরেজীতে, আমার কোনো খেয়ালই ছিলোনা। যখন রাগ সামলে সম্বিৎ ফিরে পেলাম তাকিয়ে দেখি পাশের দুজন হা করে আমাকে গিলছে। লজ্জা পেয়ে মুখ নামালাম, ওদেরকে দিলাম মৃদু হাসি।

পাশে বসে থাকা ছোটখাটো মানুষটি উঠে এসে আমার সাথে করমর্দন করে পরিচিত হলেন। কথায় কথায় বিস্তারিত সব জানা হলো, তিনিই আমার আজকের গল্পের নায়ক – মজিদ ভাই।

মজিদ ভাই এক অদ্ভূত আবদার ধরলেন – উনাকে ইংরেজি পড়াতে হবে। যেভাবেই হোক উনাকে কোনরকম পাশ মার্ক পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। মজিদ ভাই আমার পিছু ছাড়েননা। উনার বিশ্বাস আমি যদি একটু সাহায্য করি উনার ইংরেজিতে পাশ করা কেউ আটকাতে পারবেনা। মহান আল্লাহর রহমতে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় মজিদ ভাই ইংরেজিতে পাশ করলেন এবং অবিশ্বাস্য ৫৬ নম্বর পেলেন।

সেই মজিদ ভাই একদিন প্রায় উদভ্রান্তের মত ছুটে আসলেন। আমার হাত ধরে বললেন, “মনসুর ভাই, প্রয়োজনে আমি আপনার পায়ে ধরবো কিন্তু, আপনি আমাকে ফেরাতে পারবেননা। একটি অনুরোধ রাখতে হবে। আপনি যতক্ষণ হ্যাঁ না বলছেন আমি আপনার হাত ছাড়বোনা।”

– কী করতে হবে?

– মেট্রিক পরীক্ষার্থী কয়েকটি ছেলেমেয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি অনেক বড় মুখ করে বলে এসেছি তাদের দায়িত্ব আপনি নিবেন, অবশ্যই নিবেন। ওরা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। প্রত্যেকের মুখে একরাশ স্বপ্ন আর কঠোর অধ্যাবসায়ের দৃঢ় সংকল্প। আশেপাশে কয়েকটি বস্তি থেকে আমি এদেরকে বাছাই করেছি। মোট তিরিশ জন, তিনটি ছেলে বাকি সবগুলো মেয়ে। সরকার যেহেতু ইন্টার পর্যন্ত মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি দিচ্ছে কোনরকমে যদি মেট্রিক পাশ করতে পারে এদের কলেজে পড়া ঠেকায় কে? এক রিকশার মেকানিক তার ছাউনির অর্ধেকটা ছেড়ে দিয়েছেন। স্থানীয় কমিশনার দিয়েছেন চেয়ার টেবিল। পুরোনো একটি ব্ল্যাকবোর্ড অতিরিক্ত ছিলো পাশের প্রাইমারিতে, সেটি নিয়েছি। আপনি শুধু অংক আর ইংরেজিতে পাশ করিয়ে দিন – বাকীগুলোর দায়ীত্ব আমার। আপনি শুধু জুতার গুরুত্ব বুঝাবেন, ব্যাস!

এমন নাছোড়বান্দার মতো আমার হাত ধরে কাকুতি মিনতি শুরু করলেন আমার চোখ ভিজে উঠল। অন্যের বাচ্চাদেরকে মেট্রিক পাশ করানোর জন্য একজন মানুষ এতটা মরিয়া হতে পারে! বয়সে ছোট কারো পায়ে ধরে বসে থাকতে পারে! আমি লজ্জায়, মরমে, গর্বে দ্রবীভূত হয়ে পরলাম। শুধু বললাম, “আমি একটা কোচিং এ সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস নেই, সেটি ছাড়তে হবে।”

প্রতি শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ১২টা পর্যন্ত একটানা পড়াই মাঝখানে ৩০ মিনিটের বিরতি। চক কিনতে হয় নিজের টাকা দিয়ে। আমার ছাত্রছাত্রীদের কয়েকজন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিছু না খেয়েই খালি পেটে, খালি পায়ে চলে আসে। জুতা নয়, একটি চপ্পল কেনারও সামর্থ্য নেই। আমি যতক্ষণ ক্লাস নেই পুরোটা সময় মজিদ ভাই হাত জোড় করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। বিনয়ে এতটাই বিগলিত হয়ে যান আমি লজ্জা পাই। বিত্তশালীদের বিত্তের কথা ভেবে লজ্জা পাই। নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে লজ্জা পাই। চাল নেই, চুলো নেই একজন মানুষ নিজের মাথার উপরে পাতিল বসিয়ে হৃদয়ের উষ্ণতায় খিচুড়ি রান্না করে ফেলে আর আমি কতটা তুচ্ছ! কতটা অকর্মা! গর্ব করার মত কিছুই আমার নেই, যা এই মজিদ ভাইয়ের আছে অথচ এই সমাজ এদেরকে জুতোর মতো মনে করে!

মনসুর আলম- সাহিত্যিক ( দক্ষিণ আফ্রিকা)   

আরও পড়ুন