মাতৃত্বই মায়ের দুর্বলতা

মনসুর আলম

আমার মেয়ের বয়স পাঁচের খুব কাছাকাছি, আর কয়েকদিন পরেই পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। সে তার নিজের মতো করে কিছু কৌশল আবিষ্কার করে ফেলেছে কীভাবে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা যায় । তবে সে তার এই অস্ত্রটি খুবই সীমিত আকারে প্রয়োগ করে এবং খুবই সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করে যাতে বুঝা না যায় যে সে কিছু একটা চাচ্ছে।

একটি উদাহরণ দেই- তার যদি আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে সে এসে বলবে, “বাবা, আমিতো জানি আইসক্রিম গুড না তারপরও আমার কেন আইসক্রিম খেতে মন চায়? তুমি আল্লাহকে বলো আমার আইসক্রিম খাওয়ার ইচ্ছা নষ্ট করে দিতে। আমিতো গুড গার্ল, আমি আইসক্রিম চাইবো না।

সে যখন থেকেই কথা বলা শুরু করেছে তখন থেকেই কিছুকিছু বিষয় তাকে আমি এত বেশি সংখ্যক বার বলেছি যাতে তার অন্তরে গেঁথে যায়। যেহেতু বাইরে থাকি, পরিবারের আর কেউ সাথে নেই তাই আমার প্রথম দুশ্চিন্তা ছিলো আম্মা, আব্বা এবং আমার ভাই বোনের সাথে মেয়ের কানেকশন তৈরী করা। আমার নিজস্ব কিছু অবজার্ভেশন রয়েছে বাচ্চাদেরকে নিয়ে। একান্তই আমার নিজস্ব চিন্তা, কোনো একাডেমিক স্টাডিজ জড়িত নয়।

প্রথমেই যে জিনিসটা খেয়াল করলাম বাচ্চারা অনুকরণ করতে খুবই পছন্দ করে। মেয়ের একেবারে ছোটবেলায় দেখতাম আমি যা করি সে তাই করে। ওর মা একদিন ওকে ঘুম পাড়াতে খুবই বেগ পাচ্ছিল। আমি বললাম,”আমার কাছে দাও।”

আমি ওকে বিছানায় রেখে ওর মুখের সামনে আমার মুখ নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করলাম, সেও আমাকে কপি করতে শুরু করলো। দুই মিনিটেই মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। দেখলাম কৌশলটি কাজ করে। দুধ খাওয়াবার সময় ওর মুখে এক‌টি বোতল, আমার মুখে আরেকটি – বাহ্! কোনো ভেজাল ছাড়াই সে দুধ শেষ করে। এরপর থেকে ওর ঘুম আর দুধ খাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যায় পরিনি। এভাবেই আমার এক্সপেরিমেন্ট শুরু।

যা বলছিলাম। আমার চিন্তা হলো মা/ বাবার সাথে মেয়ের সংযোগ ঘটানো। আমি মেয়েকে সবার ছবি দেখাই, বারবার দেখাই। রঙচঙে ছবি দেখতে সে পছন্দ করে। দেখা গেলো তার বয়স যখন তিন বছর সে দাদা, দাদী, নানা, নানী, চাচা, ফুপু, খালা, মামা সবাইকে চিনে। এবার কথা বলানোর পালা। প্রথম প্রথম ফোনে কথা বলতে চায়না কারো সাথে। আমি ওর সাথে টেলিফোন টেলিফোন খেলা খেলি। খেলনা ফোন একটা ওর কাছে, একটা আমার কাছে। চলো আমরা ফোনে কথা বলি। কখনো দাদা, কখনো নানা সেজে কথা বলি। কখনো মামা কখনো চাচা সাজি। টিভিতে চিলড্রেন প্রোগ্রামেও অনেক কথোপকথন দেখে।

চারবছর হবার আগেই সে টেলিফোনে সবার সাথে কথা বলতে পারে। মাঝেমধ্যে সে নিজেই বলে,”বাবা, দাদুকে ফোন দাও কথা বলবো, চাচ্চুর সাথে কথা বলবো, নানুর সাথে কথা বলবো।”
আমার আনন্দের শেষ নেই। এটাইতো আমি চেয়েছিলাম। সে, তার পরিবারকে চিনুক, সবার জন্য হৃদয়ে টান তৈরী হোক। নিয়মিত সংযোগ না থাকলে সে বুঝতে পারবে না দাদু কী, নানু কী?

পাশাপাশি তাকে হালাল, হারামের কথা বলতাম। ন্যায়, অন্যায়ের কথা বলতাম। ভালো না মন্দ এই দুটি শব্দের সাথে সে খুব পরিচিত। Healthy এবং Unhealthy এই শব্দ দুটি ওর মনের ভেতরে গেঁথে গেছে। যতই লোভনীয় খাবার হোক যদি বলা হয় এটি হেলদি নয়, সে আর খাবে না। যদি বলা হয় এই কাজ করলে আল্লাহ্ খুশী হবেন সেটি সে খুবই আগ্রহ নিয়ে করে। বাচ্চারা ব্যাথা পেলে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে যায়, সে আমার কাছে আসে। যতক্ষণ আমি আদর না করবো ততক্ষণ কান্না বন্ধ হবে না। ভাত খাবে, আমার হাত থেকে খাবে। জামা পরবে, আমাকেই পরাতে হবে। এমনকি এই বয়সে সে কোন জামা পরবে সেটিও আমাকে ঠিক করে দিতে হবে। গত ঈদের দিন সকালবেলা ওর মা একটি জামা বের করে পরতে বললো, সে বলছে বাবাকে জিজ্ঞেস করে আসি।

এখন সে স্কুলে যায়। স্কুল থেকে হোম ওয়ার্ক যা দেওয়া হয় বেশিরভাগ সময় ওর মা’ই করায়। সব কাজ শেষ হলেও বাবাকে না দেখিয়ে সে প্যাক করবে না। বাবা যদি বলে সব ঠিক আছে তাহলে ঠিক আছে। বাবা যদি বলে এই জামা সুন্দর তাহলে এটি সুন্দর। এতসব কথার অবতারণা করেছি বিশেষ একটি কারণে।

গত দুদিন আগে আমি পাশের রুমে বসে টিভি দেখছি। মেয়ে তার মায়ের সাথে দুষ্টুমি করছে। কোনো অবস্থাতেই সে শান্ত হচ্ছে না। মা একটু বিরক্ত হয়ে মৃদু ধমক দিয়েছে। ধমক খাওয়ার পরও সে শান্ত না হয়ে উল্টো মাকে থ্রেট দিচ্ছে, “আমি বাবাকে বলে দিবো তুমি আমাকে ধমক দিয়েছো”। কথাটি কানে আসার সাথে সাথেই আমি চমকে উঠলাম! বলে কী মেয়ে?

যদিও সে খুব ছোট, এখনও বুঝার বয়স হয়নি। তারপরও আমার মনে হলো তার সাথে কথা বলা জরুরী। এখনই সময় তার হৃদয়ে বার্তাটি রোপণ করার। তাকে বুঝাতে হবে মায়ের সাথে কীভাবে কথা বলা উচিত। তাকে আদর করে ডেকে নিলাম। কোলে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম:

-তুমি কি কখনো দেখেছো আমি আমার আম্মার সাথে (তোমার দাদুর সাথে) জোরে কথা বলেছি? তোমার আম্মু কখনো তোমার নানুর সাথে জোরে কথা বলেছে? এই মা’ই তোমাকে পেটে রেখেছে নয় মাস। তারপর এখন তোমার ভাইয়ের পেশাব পায়খানা যেরকম পরিষ্কার করে, সেরকম তোমারও করেছে। তুমি কি জানো মায়ের কথা না শুনলে আল্লাহ্ রাগ করেন? মা/ বাবা দুজনের কথাই শুনতে হয়, দুজনকেই সমান শ্রদ্ধা করতে হয়। আমিতো তোমার মাকে কখনোই কিছু বলবো না। আমিও তোমার মাকে সম্মান করি, তুমিও সম্মান করবে। তোমার মায়ের অনুমতি ছাড়া আমার কাছ থেকে কখনোই কিছু পাবে না, একেবারে কিছুই না।

এতটুকু মেয়ে কী বুঝলো জানি না? আমি কিছু শিখিয়েও দেইনি। ওর মায়ের গলায় জড়িয়ে ধরে বললো,”স্যরি আম্মু, আর কখনো দুষ্টুমি করবো না।”

আমি কখনোই ওর মায়ের অনুমতি ছাড়া ওকে কিছু কিনে দেই না। চকোলেট, খেলনা যাই হোক, আমি বলি আগে তোমার মাকে জিজ্ঞেস করে আসো। আমি বাইরে থেকে কিছু আনলে সরাসরি ওর হাতে তুলে দেই না। ওর মাকে দিয়ে দেয়াই। সে দিয়ে বলে, “তোমার বাবা এনেছে তোমার জন্য।” এমনকি বাইরে খেলতে চাইলেও বলি তোমার মায়ের পারমিশন নিয়ে আসো।

আমরা পুরুষরা যতই চাইল্ড ফ্রেন্ডলি হই না কেন দিনের কতটা সময় আমরা ব্যয় করি বাচ্চাদের সাথে? জীবনের তাগিদে আমাদেরকে বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। একজন মা’ই হচ্ছেন সন্তানের আসল শিক্ষক, আসল আর্কিটেকচার। একজন মা’ই তাকে অবুঝ শিশু থেকে বুদ্ধিমান মানুষে রুপান্তর করেন। জন্ম দেওয়া ছাড়াও সন্তানের পরিচর্যার সিংহভাগ পরিশ্রমটা মাকেই করতে হয়। সেই জায়গায় যদি কোনো সন্তান মাকে অবজ্ঞা করে বাবাকে প্রাধান্য দেখায় আমি এটিকে গর্হিত অপরাধ বলে বিবেচনা করি। এক্ষেত্রে বাবাদের আলগা পিরীত দায়ী বলে আমার বিশ্বাস। সন্তান অবশ্যই মা/বাবা দুজনকে সম্মান করবে কিন্তু, প্রায়োরিটির প্রসঙ্গ যদি এসেই যায় তাহলে মা আগে। সন্তানের সুস্থ পরিচর্যার জন্য মায়ের বাধ্য থাকা খুবই জরুরী। আমাকে যদি তার মায়ের ভয় দেখায় আমি মেনে নিবো কিন্তু, তার মা’কে যদি আমার ভয় দেখায় আমি সহ্য করতে পারবো না। একজন মা’কে অপমান করার দুঃসাহস আমি দেখাতে পারি না। সমাজে দুর্বল নারী রয়েছেন হাজারে হাজার কিন্তু, দুর্বল ‘মা’ একটিও নেই।

আমার পরিচিত অনেক পরিবার রয়েছে সন্তানরা বাবাকে ভয় পান, সম্মান করেন কিন্তু, মা’কে কোনো মূল্যায়ন করেন না এমনকি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলেন।

আমার জীবনসঙ্গীকে যারা সম্মান দিয়ে কথা বলে না তাদের আমি নিকুচি করি, আমার ঔরসজাত সন্তান হলেও ছাড় নেই।

লেখকঃ সাহিত্যিক,কলামিস্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশী,  সাউথ আফ্রিকা

 

আরও পড়ুন