সংঘর্ষ নয়,সুন্দর সমাজ গঠনে নারী পুরুষের সমন্বিত ভূমিকা জরুরী

সালমা তালুকদার

ছেলেরা মেয়েদের দোষ দিচ্ছে।আর মেয়েরা ছেলেদের দোষ দিচ্ছে।এভাবেই চলছে প্রতিদিনের বেশিরভাগ ফেইসবুক স্টেটাস,আলোচনা,সমালোচনা,গল্প। অথচ যে মেয়েটা একটু আগে ছেলেদের গুষ্টি উদ্ধার করে ঘরে ফিরলো। সেই মেয়েটাই একটু ফ্রেশ হয়ে সামনে পরেরদিনের নোট খাতাটা খুলে তার কোনো কাছের ছেলে বন্ধুকে ফোন দিয়ে বললো,”দোস্ত একটা লেকচার বুঝতে পারছি না। একটু হেল্প করবি?”

আবার যে ছেলেটা তার ছেলে বন্ধুর সাথে গল্পের ছলে প্যান্ট শার্ট পরা মেয়েদের উদ্দেশ্য করে টিপ্পনী কাটছে; সেই ছেলেটাই ছোট বোনের আব্দার রাখতে গিয়ে নিজের টিউশনির টাকা খরচ করে বোনের জন্য লেডিস প্যান্ট, ফতুয়া কিনে বাড়ি ফিরেছে।বা জিন্স ফতুয়া পরা নিজের কোনো মেয়ে বান্ধবীর সাথে চুটিয়ে আড্ডা মারছে।একবারও মেয়েটার পরনের জামা কাপড় তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। বন্ধুত্বের বন্ধনটাই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

আমি যখন রাস্তা দিয়ে চলি তখন অনেক পুরুষ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।টিপ্পনি কাটে। অনেক সময় বিশ্রী ইঙ্গিত করে।বোঝার চেষ্টা করেছি। কেন হয় এমন!আমার জামা কাপড় অশালিন কেউ কখনো বলতে পারবে না। সেটা শাড়ি হোক,সালোয়ার কামিজ হোক অথবা প্যান্ট ফতুয়া হোক। তবে কেন এভাবে হেনস্তা হতে হবে আমাকে! সাজ গোজের জন্য? আমি তো সাজবোই। কারণ আমার সাজতে ভালো লাগে। তখন নিজেকে শান্তনা দেই এরা মানসিক বিকার গ্রস্থ লোক। এরা বোরখা পরা মেয়েদেরও ছাড়বে না।

বলছিলাম নারী পুরুষের কথা। এই দুই বিপরীত লিঙ্গ একজন আরেকজনকে ছাড়া কখনো চলেনি। পরিবার মানেই একটা বন্ধন। দিন শেষে একটু প্রশান্তির জায়গা।পরিবার গড়তে নারী পুরুষের একত্র হতে হয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। নারীর মধ্যে যেমন মা,মেয়ে,ফুফু,খালা,বোন,স্ত্রীর রুপ আছে। তেমনি পুরুষের মধ্যেও বাবা,ভাই,চাচা,মামা,স্বামীর রুপ আছে। নারী পুরুষ একত্র না হলে আরেকটা মানব পৃথিবীতে আসে না। পরিবার গঠন হয় না।তাই বৈধ উপায়ে এই দুই লিঙ্গের একত্র হওয়া। আর এজন্য দুই জন দুই জনকে শ্রদ্ধা করা উচিৎ। সংঘর্ষ থাকা উচিৎ না।

পুরুষ ধর্ষণ করে। নারী ধর্ষিত হয়। প্রকাশ হয়। অনেক সময় কঠিন কোনো বিচার হয় না। যার ফলে নারী মনে ক্রোধের সঞ্চার হয়। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে অনেক সময় অনেক নারী অতি সাহসিকতার পরিচয় দেয়। যার জন্য সে আবার ধর্ষিত হয়। আমিও একজন নারী।তাই আমার জায়গা থেকে আমি সকল নারীকে শ্রদ্ধা করি। তবে কিছু নারীদের কিছু চিন্তার সাথে আমি একমত পোষন করতে পারি না। যেমন ওড়না ছাড়া বা টাইট জিন্স পরে ছোট গেন্জি পরে রাস্তায় চলা। আমার চিন্তাটা বাঙ্গালীয়ানায় আটকে যায়। আমার সংস্কৃতি আমাকে বাঁধা দেয়। বাঙ্গালী যখন পশ্চিমা দেশে অবস্থান করবে তখন আমি তার ড্রেস নিয়ে কথা বলবো না। আমার আপত্তি তখনই যখন বাংলাদেশের রাস্তায় পশ্চিমা কালচার দেখি। তাই বলে জিন্স ফতুয়াকে আমি কখনোই খারাপ বলি না।এই ড্রেসটাও শালীন ভাবে পরা যায়। শাড়ীতে নারীকে চমৎকার লাগে। এই শাড়ী দিয়ে শরীর যেমন ঢাকা যায় তেমনি উদোম ও করা যায়। সব পোশাকেই শালীন অশালীন দৃশ্যপট আছে। পুরুষ বলে,” আমরা যা পারি তোমরা নারীরা তা পারো না। আমরা শার্ট খুলে রাস্তায় হাঁটতে পারি।তোমরা তা করে দেখাও দেখি। “মেয়েরা এতে ক্ষেপে যায়। একটা কথা আছে,”রেগে গেলে তো হেরে গেলে। “পুরুষরা মেয়েদের উত্তেজিত করে। মেয়েরাও তাদের পাতা ফাঁদে পা দেয়। কেন? মেনে নিলে কি হয় যে আমরা এটা পারি না। পারতে চাই ও না।কারণ আমরা নিজেদের সম্মান করি।সৃষ্টিকর্তা আমাদের নারী হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়ে সম্মানিত করেছেন। অনেক কিছুর সাথে আমাদের ধৈর্য্য নামক গুণটিও দিয়ে দিয়েছেন। তাই প্রচন্ড গরমে তোমরা ছেলেরা যেখানে জামাকাপড় খুলে উদোম হয়ে যাও।সেখানে আমরা জামা কাপড়ের ভেতরে থাকতেই পছন্দ করি। সহ্য করতে পারি বলেই কাপড় খুলি না। এই সহ্য ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাদের দিয়ে দিয়েছেন।

আমি মা। আমার বুকের দুধ খেয়ে আমার সন্তান বড় হচ্ছে। মানব শরীর থেকে তরল দুধ নিঃসৃত হচ্ছে। এটা তো যেন তেন কথা না। কোনো পুরুষ মানুষের পক্ষে কি সম্ভব এমন সম্মানের অধিকারী হওয়া?তারা তো শুধু কানে শোনে আর চোখে দেখে। উপলব্ধীর জায়গাটায় এরা অন্ধ।যখন নারীর শরীরের এই দুটো মাংসপিন্ডের দিকে পুরুষরা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তখন আমার ভীষণ কষ্ট হয়। কারণ এরাও এই মাংসপিন্ড হতে নিঃসৃত তরল দুধ খেয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু একজন নারীকে কষ্ট দেয়ার সময় বা ধর্ষণ করার সময় তা মনে থাকে না।

একটি নারী শরীরের দুটো জায়গা যার একটি দিয়ে একজন মানব সন্তান পৃথিবীতে এসেছে। আর একটি জায়গা যেখান থেকে পাওয়া খাবার খেয়ে সে ছয় মাস জীবন ধারণ করেছে। নারীদের কাছে পুরুষের অনেক ঋণ। যা এক জনমে শোধ করতে পারবে না। আবার পুরুষ না থাকলে নারী এই সম্মানের অধিকারী হোত না। তাই নারী পুরুষ দুজন দুজনকে শ্রদ্ধা না করলে সমাজে অরাজকতা লেগেই থাকবে। তাই বাংলাদেশের সংস্কৃতির দিকে খেয়াল রেখে নারীরা যদি নিজেদের একটু সম্মান দেই ক্ষতি কি তাতে! নিজের এত গুরুত্বপূর্ণ শরীরটা যদি শালীনভাবে ঢেকে চলি দোষ কি তাতে? আমাদের দেশের লোকজন এখনও এরকম ড্রেসের সাথে অভ্যস্ত হতে পারেনি। তবে এটাও ঠিক এতে ধর্ষন বন্ধ হবে এরকম কোনো গ্যারান্টি আমি দিব না।কারণ যে সব মানুষিক বিকারগ্রস্ত লোক ধর্ষন করে তারা বোরখা পরা নারীকেও টার্গেট করে এই হীন কাজের জন্য। ধর্ষনের জন্য পোষাক না। ব্যাক্তির শিক্ষা,নৈতিক আচরণ,পারিবারিক অবস্থা দায়ী।

ধর্ষণ তখনই বন্ধ হবে যখন প্রকাশ্যে রাজপথে ধর্ষকের গনধোলাই হবে। নারীর আজকের প্রতিবাদী কন্ঠস্বরের জন্য পুরুষরাই দায়ী। যুগে যুগে অত্যাচার সহ্য করে আজ নারীরা রুখে দাঁড়াতে শিখেছে।যে মেয়েটি “কুছ পরোয়া নেহি” স্টাইলে রাস্তায় চলছে সে কোনো এক সময় তার মা বা কোনো আত্মীয় মহিলাকে নিজের ঘরে অত্যাচারিত হতে দেখেছে। যে নারীটি আজ স্বামীকে রেখে অন্য পুরুষের বিছানা সঙ্গী হয়েছে সে নারীটি তার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিতা। সন্তানের জন্য সংসার ছাড়তে পারবে না তাই প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে সব ঠিক রেখে নিজে বহির্মুখী হয়েছে। এই জায়গাটায় কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক মতো চালিয়ে নিতে পারে কেউ কেউ পিছলে যায়। তাই আমি বলবো এটা কোনো সমাধান না। সমাধানের পথ সবসময়ই খোলা। শুধু বিচক্ষনতার অভাব। হিংসাত্বক বা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে আমরা মেয়েরা নিজেরা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্থ করছি। আমার স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত বলেই আমি ও সেই পথে চলবো। বা যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াবো ব্যাপারটা তো আসলে ঠিক না। বরং ঘুরে দাঁড়াতে শিখবো।বাঁচতে শিখবো।একটা কথা আমি সবসময় বলি। আমি যখন নিজেকে ভালোবাসবো তখনই আমার চারপাশের সবাইকে ভালো রাখবো, ভালো বাসবো। ঠিক তেমনি আমি নারী যদি নিজের মূল্যবান শরীরটাকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি তাহলে পুরুষদের বিরুদ্ধে এটাই হবে আমার প্রতিবাদ। তারমানে এই না যে আমি বোরখা পরবো। শালীন ভাবে চলবো।যাকে দেখলে এমনিতেই শ্রদ্ধায় নাথা নত হয়ে আসে। এটা বাংলাদেশ বলেই এবং এদেশের মানুষের চোখ, মানসিকতা এখনো উন্নত নয় বলেই আমি এরকম বলছি।আমাদের দেশের পুরুষরা নিজেরা চোখের পর্দা করে না কিন্তু নারীকে পর্দায় থাকতে বলে। আমি পুরুষদের চোখ থেকে বাঁচার জন্য নারীদের শালীন পোষাক পরতে বলিনি। নিজের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্যই শুধু বলেছি। আমরা নারী। কোথাও কোথাও আমরা পুরুষদের চাইতে একটু বেশি কিছু পারি। এটা পুরুষরাও বোঝে। তাই সবসময়ই নারীদের দমিয়ে রাখতে চায়।আমরা দমে যাবো না। তবে নিজেদের প্রতিভার জোড়ে আমরা সকল বাধা অতিক্রম করবো। কিন্তু সেটা পোশাকের মাধ্যমে না। মেধাকে কাজে লাগিয়ে। এমন কথা কেন রেখে যাবো যা নিয়ে পুরুষ কথা চিবোতে পারে! ভালো থাকুক জগতের সকল নারী। ভালো থাকুক জগতের সকল পুরুষ। ভালোতে ভালোতে মিলে সুন্দর হয়ে উঠুক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন