ভাগ্য হত্যাকারী এক জাতি আমরা

ড. রাউফুল আলম

ইসরাইল এক ভাগ্যবতী দেশ। কারণ সে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন একজন গবেষক। তার নাম কাইম ভাইজম্যান। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি হাত দিলেন গবেষণা সমৃদ্ধ করার কাজে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আনলেন ব্যাপক পরিবর্তন। এই ভাইজম্যান, ইউরোপের যতো খ্যাতনামা বিজ্ঞানী (মূলত ইহুদি) আছে, তাদেরকে ধরে নিয়ে ইসরাইলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। তাদের দুইজনের নাম বলছি শুধু—একজন আলবার্ট আইনস্টাইন, অন্যজন ফ্রিৎজ হাবার। আইনস্টাইনকে ইসরাইলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভাইজম্যান।

ইসরাইলের সবচেয়ে খ্যাতনামা গবেষণা ইনস্টিটিউটের নাম ভাইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সাইন্স। সে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন গবেষকের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো আমার। তাদের গবেষণার কাঠামো ও বাজেট আমাকে বিস্মিত করেছে। শুধু সে প্রতিষ্ঠানেই নাকি কাজ করে সহাস্রাধিক গবেষক! অথচ সে দেশের জনসংখ্যা মাত্র আশি লক্ষ! সারা ইসরইলে শুধু একাডেমি পর্যায়ে গবেষক আছে প্রায় দশ হাজার। অর্থাৎ, প্রতি আটশ জনে একজন গবেষক। আমার ষোল কোটির বাংলাদেশে একহাজার গবেষক তৈরি করতে পারি নাই আমরা। আহারে দৈন্যতা!

একটা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির দেশ কী করে সমরাস্ত্রে ও আকাশ সীমায় পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী হতে পারে, ইসরাইল তার একমাত্র উদাহরণ। তাদের রাসায়নিক শিল্প সমৃদ্ধ। তাদের মহাকাশ গবেষণা উন্নত। তাদের পারমাণবিক গবেষণা সম্পর্কে কেউই সঠিক তথ্য জানে না। আর এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে, ভাইজম্যানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফলে। তিনি সূচনা করেছেন, পরবর্তী সকল রাষ্ট্রনেতা সেটাকে অনুসরণ করেছে। গবেষণা ও শিক্ষায়, ওরা কোন আপোষ করে না। কোন কোটা নেই, কোন নেতা নেই, কোন জাতের তোয়াক্কা নেই। আর এ জন্যই ইসরাইল আজ এতোদূর!

গবেষণার কথা আসলেই মানুষ বলে, বাংলাদেশ গরীব। বাংলাদেশ আসলে গরীব না। আমরা দুর্নীতে ধনী, সে কারণে দৃশ্যত গরীব। অর্থহীন, পরিকল্পনাহীন কাজে টাকা ব্যায়ে আমরা সর্বোৎকৃষ্ট। শিক্ষাব্যবস্থাকে আমরা জেনে-শুনে হত্যা করছি, তাই আমরা গরীব। যে দেশে প্রায় পঞ্চাশটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সে দেশ গরীব হতে পারে না। যে দেশে পাঁচ লক্ষ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দেয়, সে দেশ গরীব না। যে দেশ তার মেধাবীদের যাচাই করে রাজনীতি দিয়ে, কোটা দিয়ে, জাত দিয়ে, অর্থ দিয়ে—সে দেশ নেচারেলি গরীব হয়ে থাকে। এটাকে বলে ডিভাইন পানিশমেন্ট—প্রাকৃতিক শাস্তি।

ভারত কী ধনী দেশ? শ্রীলংকা কী ধনী দেশ? আজকে ভারতের গবেষণা কোথায় যাচ্ছে সেটা কী আমরা শিখতে চাইছি? চাইছি না। আমরা শুধু মুখাপেক্ষি হতে জানি। আর দিন দিন প্রজন্মকে বুঝতে শেখাই, আমরা গরীব। আমাদের অতো মেধা নেই। ইউরোপিয়নারা, আমেরিকানরা, চাইনিজ-ভারতীয়রা আমাদের চেয়ে সুপেরিয়র। নিজের ভাগ্যকে নিজে হত্যা করে, অন্যকে শ্রেষ্ঠ ভাবার মানসিকতা, আমাদের আরো গরীব করে দিচ্ছে।

লেখকঃ গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

 

আরও পড়ুন