দেমাগ

 

আপনি জানেন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে … সাবজেক্টে মাস্টার্স করেছি? আপনার কাছ থেকে ম্যানার শিখতে হবে? আশ্চর্য!

– তাহলেতো আপনাকে আরো ভালো করে ম্যানার শেখানো আমার দায়িত্ব হয়ে গেলো। ঢাবিতে লেখাপড়া করেও যদি কমনসেন্স তৈরী না হয়, গরীব জনগণের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ভর্তুকী দিয়ে আপনাকে পড়িয়ে আমাদের কী লাভ হলো? জানেন তো, এখনো ঢাবির কেন্টিনে দশ টাকায় চা সিঙ্গারা পাওয়া যায়?

আমি চোখমুখ বন্ধ করে ভাবছি, এই দেমাগ এদের সাথে এত দূরে আসলো কীভাবে? টিকেট পেল কোথায়? বিমান কি ফ্রি নিয়ে আসলো?

কোরবানির ঈদের দিন পুরোনো একটি স্মৃতি মনের পর্দায় ভেসে উঠলো। ঈদের আনন্দের সাথে ঠিক ছন্দোময় নয় বিধায় সেদিন লিখিনি, আজ লিখছি। তার আগে ছোট্ট একটি ঘটনা বলে নেই।

২০০৪ সালের মাঝামাঝি, খুবই শীত পরেছিলো এদিকে। কনকনে ঠান্ডা, মনে হয় যেনো ত্বকে হুল ফোটাচ্ছে। দুপুরে একটু কড়া রোদ উঠেছে, সেই রোদে বসে গল্প করছি এক বন্ধুর সাথে। পরিচিত এক ছোটভাই আসলো, সে নতুন এসেছে দেশ থেকে।

– ভাইয়া, আমি একটা রাত্রেও ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনা। আমাকে বোবায় ধরে। একেবারে শ্বাস নিতে পারিনা। খুবই কষ্ট হয়।

– বোবায় ধরে মানে কী? কী বলছো এসব?

– জ্বী, বোবায় ধরে। আমি ঘুমালে কেউ একজন আমার বুকে বসে গলা চেপে ধরে। আমার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। দম নিতে পারিনা, খালি ছটফট করি। অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তি করে তারপরে মুক্তি পাই, এরপর আর ঘুম আসেনা। দেশে থাকতেও আমার এরকম হতো, এখনো হচ্ছে।

আমি একটু মজা করে বললাম – কী বলছো? সাত সমূদ্র তেরো নদি পার হয়েও বোবাকে সাথে নিয়ে এসেছো! আশ্চর্য এখনতো পুরো আফ্রিকা ভরে যাবে বোবায়। এখানে হাজার হাজার কিলোমিটার খালি জায়গা সবতো বোবায় দখল করে ফেলবে। কী সর্বনাশা কথা! এটা একটা কাজ করলে? বিমানে উঠার আগে বোবাকে নামিয়ে দিতে পারলেনা? আচ্ছা! তুমি কি দুটি টিকেট কিনেছিলে? বিনা টিকেটে এই বোবাকে বিমানে তুললে কীভাবে? খুলে বলতো বাংলাদেশ থেকে সাউথ আফ্রিকায় বোবা সাথে আসলো কীভাবে?

ছেলেটি হাসতে হাসতে বললো- ভাইয়া আপনি মজা করছেন? আমাকে সত্যিই বোবায় ধরে। আর টিকেট দুইটা কিনিনি। আমার মাথায় করে নিয়ে এসেছি। এই ‘বোবা’ আমার মাথার ভেতরে ছিলো সারাক্ষণ; এয়ারলাইন্স, ইমিগ্রেশন টেরও পায়নি। টুপ করে পাচার করে ফেলেছি।

সাথেসাথে আমার মাথার জট খুলে গেলো। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না আমরা যখন বিদেশে আসি আমাদের দেমাগ, অহংকারবোধ, ধূর্ততা, নোংরামি এগুলো সাথে আসে কী করে? বিমানের টিকেট পায় কোথায়? আর ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে কীভাবে? এগুলো তাহলে আমাদের মাথায় বসে চলে আসে! সর্বনাশ! এয়ারলাইন্স জানতে পারলে ডাবল টিকেটের দাম দিতে হতো। আর কাস্টমস জানলে তো নির্ঘাত ঐতিহ্য পাচারের অভিযোগ তুলবে!

বেশ কয়েকবছর আগে, কোরবানির ঈদের সময়ের ঘটনা। আমার বেশিরভাগ বন্ধুুরাই একটি শহরে থাকে, আমি থাকি ৩৫০ কিলোমিটার দূরে। সেবার ঈদের সময় স্কুল হলিডে ছিলো (সেমিস্টার ব্রেক)। বন্ধুুরা সবাই ফোন করে চাপাচাপি শুরু করলো একসাথে ঈদ করবে। আমাকে ওদের কাছে গিয়ে কয়েকদিন থাকতে হবে এবং ঈদ ওখানেই করতে হবে। প্রতিবছর ডিসেম্বরে কয়েকদিন ওদের সাথে কাটাই। আরো এক ইন্জিনিয়ার বন্ধু আসবে আরেক শহর থেকে (ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি)। সব মিলিয়ে বন্ধুদের জোর দাবির কাছে হার মেনে চলে গেলাম ওদের সাথে ঈদ করার জন্য। অনেকগুলো পরিবার একসাথে। আমরা স্বামী – স্ত্রী স্কুল টিচার, তিন ডাক্তার বন্ধু পরিবারসহ, এক ইন্জিনিয়ার বন্ধু আরও চারটি পরিবার ব্যবসায়ী – সব মিলিয়ে বিশাল এক বহর আমাদের। আমার প্রবাস জীবনের সেরা ঈদ উদযাপন ছিলো সেটি।

আমরা সবাই মিলে দুটি গরু কিনেছি শহরের নিকটবর্তী একটি ফার্ম থেকে। আমার বন্ধুরা নিয়মিত গরু, ছাগল কিনে সেই ফার্ম থেকে, যথেষ্ট আন্তরিক একটা সম্পর্ক তৈরী হয়েছে ফার্মের মালিকের সাথে। খুবই সুন্দর, সাজানো গোছানো একটি বাগানবাড়ি আছে ফার্মের ভেতরে। প্রসস্থ আঙিনা সবুজ ঘাসে মোড়ানো, একপাশে মাংস কাটার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা, পানির কল, বাচ্চাদের খেলাধুলার জায়গা সব মিলিয়ে একটি রিসোর্টের মতো। আমাদের ঈদের কথা শুনে খামারি ভদ্রলোক পুরো দিনের জন্য বাগানবাড়ি আমাদেরকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো।

আমাদের প্ল্যান ছিলো এরকম- সব ফ্যামিলি বাচ্চাকাচ্চাসহ সারাদিনের জন্য ওখানে চলে যাবো। মাংস কাটবো, একপাশে রান্না হবে সবাই মিলে আনন্দ করবো, বাচ্চারা খেলবে, আড্ডা চলবে আর সীমাহীন খাওয়া দাওয়া। সারাদিনব্যাপি একটি পিকনিক ইমেইজ। আগের রাতে অনেক রুটি বানিয়ে রাখা হয়েছে। ঈদের নামাজ পড়েই আমরা পাতিল, মসলাপাতি, কোল্ড ড্রিংকস, কাঠ প্রয়োজনীয় সব মালামাল তুলে বিশাল ব্যাটালিয়ন নিয়ে হাজির হলাম ফার্মে।

আমাদের বন্ধুদের যেকোনো পার্টিতে, উৎসবে ওরা আমাকে অন্য কোনো কাজ করতে দেয়না তবে রান্নার কাজটা আমার উপর স্থায়ীভাবে সমর্পন করা আছে। কোনভাবেই এই দায়িত্ব আর কাউকে দিতে পারিনা। সবাই কম বেশি রান্না জানে। আয়োজন কন্টিনেন্টাল হোক আর বিদেশি হোক সেটি আমাকেই করতে হয় – অলিখিত বন্দোবস্ত এটি। নারী এবং বাচ্চারা আমাকে ছাড়া বুঝেনা দুটি কারণে। আমি সবসময় বাচ্চাদের জন্য আলাদা আইটেম করি কম ঝাল দিয়ে এবং বাচ্চাদের মধ্য থেকে লটারী করে দুইজন টিম লিডার বানিয়ে দেই তাদের সব কিছু তদারকি করার জন্য। টিম লিডারদের দায়িত্ব হচ্ছে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া, বন্টন করা এবং সবাইকে নিয়ে খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা। এতে করে তাদের মধ্যে নেতৃত্ব দেবার মানসিকতা গড়ে উঠবে, দায়িত্ব জ্ঞান বাড়বে আর মায়েরা একটু অবসর উৎযাপন করার সুযোগ পেলেন। আমি সবসময় নারী এবং বাচ্চাদেরকে আগে খাবার দেই তারপরে আমরা পুরুষরা খাই।

যথারীতি আমি একপাশে বিশাল বড় পাতিল দিয়ে রান্না বসিয়েছি। অন্যরা মাংস কাটছে। আমার কিছু লাগলে সাহায্যকারী সাথে আছে। বাচ্চাদেরকে তাদের টিম লিডারদের দায়িত্বে পাঠিয়ে দিয়েছি মাঠে খেলার জন্য। নারীদেরকে বললাম,”আপনারা শুধু আড্ডা মারবেন, খেলবেন আর যা লাগে অর্ডার করবেন; আপনাদের সামনে পৌঁছে যাবে। সারাবছর কষ্ট করেন, আজ আপনাদের আড্ডা মারার দিন। আমরা পুরুষরা নানা অজুহাতে আসা যাওয়া করি, আমাদের দেখা সাক্ষাৎ বেশি হয়। এভাবে একসাথে আড্ডা দেবার সুযোগ আপনাদের খুব কমই হয়। আপনারা চুটিয়ে গল্প করুন আর রিলাক্স করুন। বাচ্চাদেরকে দেখাশোনা করার জন্যও আমি টিম রেডি করে দিয়েছি। আপনারা ফ্রি।

অন্য একটি ফ্যামিলি এসেছে আমার অপরিচিত। উনারা কোনো এক বন্ধুর মাধ্যমে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন। ব্যবসায়ী পরিবার। উনাদের কাছে চাকরি করে এরকম দুইজন বাঙালি যুবক সাথে নিয়ে এসেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি এখানে যারা ব্যবসা বাণিজ্য করেন তাদের সবার কাছেই অন্য বাঙালীরা চাকরি বাকরি করেন, গাড়ি চালান। অপরিচিত সেই নারী নিজে গাড়ি চালাতে জানেন না তাই একটি ছেলে উনার গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এসেছে, ছেলেটি উনার স্বামীর দোকানে চাকরি করে। সারাদিন প্রচুর মজা হয়েছে। জম্পেশ খাওয়া দাওয়া, দৌড়ঝাঁপ সব হয়েছে। সবুজ প্রান্তরে খালি পায়ে ছুটোছুটি, কানামাছি, ডাঙ্গুলি সব খেলেছেন নারীরা। সন্ধ্যার আগে আগে সবাই প্যাকআপ নিয়ে ব্যস্ত।

সবাই যার যার মতো করে মাংস, মালামাল গাড়িতে তুলতে ব্যস্ত। আরেক গ্রুপ বাচ্চাদেরকে নিরাপদে গাড়িয়ে বসিয়ে দিচ্ছেন। নারীদেরকে ডাকলাম – চলুন গাড়িতে উঠা যাক। সবাই জুতা খুলে খেলেছেন আবার প্রত্যেকে নিজের জুতা হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠছেন কেবল সেই অপরিচিত নারী ছাড়া। তিনি ড্রাইভার ছেলেটিকে কিছুটা তাচ্ছিল্য করে বললেন, “এ্যাই, আমার জুতো জোড়া নিয়ে এসো”।

আমি পাশে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদেরকে মনিটরিং করছিলাম। হঠাৎ করে এইধরণের দম্ভোক্তি কানে আসায় কিছুটা চমকে উঠলাম। আমার সার্কেলের ভেতরে সব নারীরা কর্মচারীদের সাথে খুবই নম্র, মায়াবী আচরণ করেন। এই নারী ঈদের দিন এরকম তাচ্ছিল্য করে, এত মানুষের সামনে ছেলেটিকে সম্মোধন করলেন – আমি নিতে পারলাম না।

আমি বললাম- এক্সকিউজ মি। ছেলেটি পেটের দায়ে আপনাদের দোকানে চাকরি করে, গাড়িও চালায়। আজ ঈদের দিন ওর ছুটিতে থাকার কথা ছিলো। এরপরও সে আপনার ড্রাইভার হয়ে এসেছে। সারাদিন কাজ করেছে। তাই বলে আপনি তাকে দিয়ে আপনার জুতা বহন করাবেন? আপনার কষ্ট হলে আপনার স্বামীকে বলুন জুতা নিয়ে যেতে। একটু বেশি হয়ে যাচ্ছেনা?

তিনি রেগেমেগে যা বললেন- আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে … সাবজেক্টে মাস্টার্স করেছি, আপনার কাছ থেকে ম্যানার শিখতে হবে?

তখনই আমার মনে পড়লো পুরোনো সেই কথা – দেমাগ, অহংকার এগুলোর তো টিকেট লাগেনা। আমাদের মাথায় চড়েই চলে আসে আমাদের সাথে।

 

 

মনসুর আলম- সাহিত্যিক ও মডারেটর মহীয়সী  

আরও পড়ুন