যত্ন নিন বৃদ্ধ মা বাবার

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

মা বাবার গুরুত্ব লিখে বুঝানো কি সম্ভব?এই দুইজন মানুষ পরম নিঃস্বার্থ ভাবেই সন্তানের এবং তাদের সন্তানের জীবন গড়ে দিতে নিরলসভাবে নিজেদের সবটুকুন উজাড় করে দিয়ে যান আমাদের। যারা আমাদের জন্য এতটা করেন, আমরা সন্তানরা তাদের জন্য কতটা ভাবি,কতটা তাদের খেয়াল রাখি তা আমাকে প্রায়শই ভাবায়।

আমার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা বয়োবৃদ্ধ মা বাবার প্রতি সন্তানের আচরণ আমি খেয়াল করি।বুঝতে চাই জানতে চাই তারা তাদের জীবনের অমূল্য রত্নদের কতটা মর্যাদার সাথে সেবা করেন।মাঝে মাঝে আফসোস হয় আমার।হতাশায় ডুবে যাই অনেক সন্তানের মা বাবার প্রতি তীব্র অবহেলা ও অযত্ন দেখে।

আজকের কথাই বলি।একজন ৮০ বছর বয়স্কা নারী আসলেন।উনার অনেক গুলো বার্ধক্যজনিত সমস্যা।এর মধ্যে অস্টিওপরোসিস এর জন্য মাঝপিঠে অনেক ব্যাথা।সাথে হাঁটুতে অস্টিওআর্থাইটিস এর ব্যাথা।

তিনি বললেন,

-তাকে এই বয়সেও রান্না করতে হয়।তরকারী কাটাকুটি করতে হয়।

হাই কমোড ব্যবহার এর কথা বলায় মুচকি হাসি দিলেন সেই হাসিতে বিদ্রুপ ছিলো উনার নিজের প্রতি।

জীবনের ৮০টা বসন্ত কাদের জন্য বিলিয়ে দিলেন। চার মেয়ের পর এক ছেলে পেয়েছেন।মেয়েরাও বুড়ো হয়ে গেছে।ছেলের ইনকাম ভালো।
কিন্ত মায়ের প্রতি উদাসীন।ছেলের বউ এর ইচ্ছায় উনার জীবন।

আমি ছেলের বউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না।এই বৃদ্ধা মায়ের ছেলেটা একজন কাজের লোক রেখে মাকে ৮০ বছর বয়সে সংসারের কাজ থেকে মুক্তি দিতে পারে।।

কিন্ত আফসোস এর জায়গাটা হলো,ছেলে বউ কাজের লোকের পিছে অযথা টাকা খরচে নারাজি দিয়েছেন।

ছেলের বউ এর কথা,এই বৃদ্ধা মা ছেলের টাকায় খাচ্ছেন।সুতরাং সংসারে কাজ করে তা পুষিয়ে দিতে হবে।

আমি এই নারীকেও চিনি । উনার ছেলেকেও চিনি।এই নারী জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন।শুধু মায়া বিলিয়ে গেলেন।কিন্ত পেলেন কি জীবনে।৮০ বছর বয়সে উনাকে ছেলের সংসারের পাহারাদার হয়ে নিজে রান্না করে খেতে হয় যখন ছেলের বউ মাসের পর মাস বাপের বাড়িতে অতিথি হয়ে থাকেন।

আজকালের আধুনিক শিক্ষিত সমাজ ও গ্রামীণ সমাজ সব জায়গায় এই বৃদ্ধ মা বাবারা উটকো ঝামেলা সুখের সংসারে।।এই চিত্র ভয়াবহ চারপাশে চোখ মেলে তাকালেই দেখা যায়।

আফসোস যেই দুইজন মানুষকে সবচেয়ে বেশি যত্নে আদরে মায়ায় জড়িয়ে রাখার কথা সকল সন্তানের, তাদের সংসারে যখন মা বাবা অপাংতেয় ও বোঝা হিসেবে বিবেচিত হন,তখন আফসোস করা ছাড়া অনুভূতিশীল হৃদয়ের আর কি করার থাকে।।

মা বাবাকে অবহেলা করে কষ্ট দিয়ে তাদের ঠকিয়ে কেউ জীবনে চূড়ান্তভাবে সফল ও সুখী হয়না।।আমাদের মা বাবা গুলো অনেক বোকা।
এত না-পাওয়াতেও তারা সন্তানের উপর নাখোশ হতে পারেন না।তাদের কিছুই পাওয়ার ইচ্ছাও জাগে না।
শুধু দিতে পেরেই সুখীজন তারা।

পৃথিবীর সকল মা বাবা যত্নে থাকুক।আমরা মানুষের সন্তান মানুষ হয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করি মা বাবার প্রতি।।

আজ মা বাবা জীবিত, তাদের গুরুত্ব অনুধাবন করছেন না।যেদিন এতিম হয়ে যাবেন,জীবনের অমূল্য রত্নদের হারিয়ে ফেলবেন, সেদিন ঠিকই বিবেকের কাঠগড়ায় অশ্রুসিক্ত হবেন । আফসোস করবেন নীরবে কিন্ত তখন আর কিছুই করার থাকবে না।

মা-বাবা মরে গেলে লাখ টাকায় জিয়াফত খাইয়ে মানুষের বাহবা পেলেও আপনি আপনার আত্মার কাছে আজীবন আসামী হয়ে থাকবেন।

লেখকঃ কলামিস্ট ও ডাক্তার

 

আরও পড়ুন