প্রকৃতি প্রেম

সেদিন হঠাৎ করে রান্নাঘরের কার্নিশে চোখ পড়লো। তেলের অনেকগুলো খালি জার জমে আছে। মনে হলো এদের কাজে লাগানো দরকার।

এরই মাঝে জামান বলেছে বাগানের কাজ শুরু করবে। আমিও মহা খুশি হয়ে বললাম চলো তা’ই করি।

পরদিন বেচারা ৩৬ টি প্লাস্টিকের টব নিয়ে হাজির!

গাছ লাগাবো আমরা কিন্তু টবের কি দরকার! টব তো বাসাতেই আছে। বলল কই! আমি রান্না ঘরের কার্নিশের দিকে আঙ্গুল তুললাম। এরপর সেগুলো কেটে, ধুয়েমুছে পরিস্কার করে রং করলাম।

ভীষণ খুশি হয়ে জামান সেগুলোতে নিজের হাতে মরিচের চারা রোপন করেছে। গাছ লাগাবো ফুল, ফল যদিও না পাই তবে এই পৃথিবী কিছু অক্সিজেন তো পাবে।

বহুরাত নির্ঘুম কেটেছে উদ্ভিদের জীবনবিদ্যা জানতে গিয়ে। বহুরাত বুকের উপর বই নিয়ে পরিবেশের বিপর্যয়ের কারন সমুহ মুখস্থ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি।

অবাক হয়েছি। কত নির্যাতন করি আমরা এই নিরীহ প্রকৃতিকে। তাই পরিবেশ, উদ্ভিদ, দুষণ, রিসাইকেল এগুলো আমার চিন্তাকে সবসময়ই প্রভাবিত করে।

এই পৃথিবী এখন প্লাস্টিকের ভার বহন করতে করতে ক্ষয়প্রাপ্ত। একটি প্লাস্টিকের (পেট) বোতল আপনার কাছে কিছুইনা কিন্তু এক কোটি বোতল বন্ধ করে দিতে পারে আমার আপনার চলাচলের রাস্তা। বর্ষা আসলেই আমরা তা শহরের রাস্তাতে ঢের টের পাই।

আশির দশকের শেষের দিকে এসে বাংলাদেশে পানীয় জল ও কোমল পানীয় (beverages) বাজারজাত করতে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানি কাঁচের তৈরি বার বার ব্যবহারযোগ্য বোতলের পরিবর্তে সস্তা ও হাল্কা বহনযোগ্য ফুড-গ্রেড পেট বোতলকে বেছে নেয়।
এর ফলে ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে পড়ে থাকতে শুরু করে।

১৯৯৯ সাল থেকে আমাদের দেশে রিসাইক্লেবল পেট প্লাস্টিক বোতল, জার, কন্টেইনারে পণ্য রপ্তানি মোটে শুরু হয়। দেশীও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টার ফলে এইসকল বর্জ্য প্লাস্টিকের রিসাইকেল ও দেশীয় পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল হিসাবে বাজারজাতকরন শিল্প গড়ে উঠে। কিন্তু বাৎসরিক আনুমানিক দেড় থেকে দুই লক্ষ টন বর্জ্য প্লাস্টিকের উপদ্রব আগে সীমিতাকের শুরু হলেও এখন তা ভয়াবহ আকার ধারন করেছে।যেহেতু আমরাও ওয়ানটাইম ইউজ প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেট, কাপে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি সেহেতু এ থেকে উদ্ভুত পরিবেশ বিপর্যয়ের লেভেল এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।

কিছুদিন আগেও এই পরিত্যাক্ত প্লাস্টিক পেট বোতল কেটে কুচি/ফ্লেক্স বানিয়ে তা চীনে রপ্তানি করা হতো। কিন্তু চীন ২০১৭ সাল থেকে এরকম পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বিধায় আমাদের রপ্তানিকারকগণ ভারত ও ভিয়েতনাম সহ রাশিয়া পোল্যান্ডে বিকল্প রপ্তানি বাজার তৈরী করে।

২০১৯ সালে ভারত ও চীনের মতই বর্জ্য প্লাস্টিকের আমদানি নিষিদ্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয়ের অবস্থা আবারো প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ভাবে যেসব পিএসএফ (কৃত্রিম তন্তু) কারখানা মোটে গড়ে উঠেছিল সেগুলো করোনাভাইরাস এর প্যান্ডেমিকের ফলে ত্রাহী ত্রাহী অবস্থায় যাচ্ছে। তাদের তৈরি পন্য কোথায় বিক্রি করবে!

সারা পৃথিবী এখন থমকে দাঁড়িয়েছে কিন্তু তাই বলে সেই হারে তো খাওয়াদাওয়া বন্ধ থাকে নাই। ফলে এই ওয়ানটাইমের প্লাস্টিকের বর্জ্য আবারো রাস্তাঘাটে, ডোবায়, খালে বিলে আর নদীতে জমা শুরু করেছে। এখন যেহেতু রপ্তানি বন্ধ, স্থানীয় পিএসএফ উৎপাদন প্রায় বন্ধের পর্যায় তাই দেশের বর্জ্য দেশেই থেকে গিয়ে ফসলের জমির উর্বরতা থেকে শুরু করে শহরের ড্রেনেজ সিস্টেম লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে।

এতটুকু নজর নেই কারো এদিকে। অথচ আমাদেরই পরিত্যক্ত প্লাস্টিক কুচি চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইইউ দেশের রিসাইকেল কারখানায় কিনে নিয়ে তারা পলিয়েষ্টারের তুলা (পিএসএফ), পলিয়েস্টার সুতা, ইয়ার্ণ, কাপড় ইত্যাদি তৈরীতে ব্যবহার করে আসছিল। সেই সকল দেশের উন্নতমানের মেশিন ও প্রযুক্তিবিদ্যার আমদানি করে আমাদের জনগণের জন্য পর্যাপ্ত ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে পারলে আমরাও ওয়ার্ল্ডক্লাস কোয়ালিটির পণ্য তৈরী করে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশের সুরক্ষা করতে পারি।

কিন্তু আমাদের কর্তাকাকুরাতো মাছ চাষ আর পুকুর খননের ট্রেনিং নিতে নিতেই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ১৪টা বাজিয়ে দিয়েছেন। সরকার চাইলে এখনো এই প্লাস্টিকের বর্জ্যের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা ও একই সাথে আগেকার আমলের মত মিনারেল ওয়াটার ও বেভারেজ (সফট ড্রিংক্স) কোম্পানিগুলোকে কাঁচের তৈরি বোতল ব্যবহার করতে বাধ্য করলে আমরা হয়তোবা এ যাত্রায় বেঁচে যেতে পারি।

তাই আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমাদের সরকারের উচিত আগের মত কাঁচের কন্টেইনারে ব্যাভারেজ (সফট-ড্রিংকস), মিনারেল ওয়াটার, ওষুধ, তেল ইত্যাদি পণ্যের প্যাকিং এর জন্য প্রচারণার মাধ্যমে গণজাগরণ সৃষ্টি ও যথাযথ কার্যকরী আদেশ জারি করা প্লাস্টিকের উপর চাপ কমিয়ে দিতে আর সময় ক্ষেপণ না করে এখনই সচেষ্ট হউক।

পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রনের মতো প্লাস্টিকের ব্যবহারও নিয়ন্ত্রন সম্ভব বলে আমি মনে করি। আর যেসব ক্ষেত্রে ব্যবহার না করলেই না সেসব প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে কল্যানে পরিনত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই আসুন আমরাও আপাতত ব্যক্তিগত ভাবে চেষ্টা করি যাতে সফটড্রিংক্স, জুস, তেলের জার ইত্যাদির খালি বোতল যেখানে সেখানে না ফেলে নিদৃষ্ট স্থানে ফেলতে কিংবা সেগুলোকে নিজেরা পুনরায় ব্যবহার উপযোগি করে কাজে লাগাই।

যেমন- বাগানে গাছ লাগিয়ে কিংবা জারে শস্য সংরক্ষণ বিভিন্ন প্যাকিং সাইজের তেলের জারে গম, পোলাওচাল, ভুট্টা, মরিচের গুড়া, হলুদের গুড়া, ডাল ইত্যাদি সংরক্ষণ করতে পারি। প্লাস্টিকের জারে শস্য দীর্ঘদিন ভালো থাকে বাতাস না ঢুকার কারনে।

প্রকৃতিকে ভালবাসলে সে আমাদেরকে সেই ভালোবাসা বহুগুনে ফিরিয়ে দিতে জানে। আসুন তাকেই ভালোবাসি যে ভালোবেসে আঘাত করেনা।

লেখকঃ সুমেরা জামান, কবি,সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

 

আরও পড়ুন