ব্যাচেলর ভবন

ডঃ সালেহ মতীন

ব্যাচেলর শব্দটির শাব্দিক অর্থ যা-ই থাক সেটি নিয়ে কিছুই বলতে চাই না। আমাদের সমাজে শব্দটির প্রচলিত বা ব্যবহারিক অর্থে যা বুঝায় তা নিয়ে দুটি কথা আমার বলার আছে। ‘ব্যাচেলর’ এক অদ্ভুত প্রকৃতির চীজ, কোন অদৃশ্য পাপের ঘানি টানা প্রাণী বিশেষ। অন্তত আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিই আমি বুঝতে সক্ষম হয়েছি। বিয়ের বাজারে তাদের একটু কদর থাকলেও আর কোথাও তাদের গণনা করা তো হয়ই না বরং দূর দূর ছাই ছাই করে দূরে সরিয়ে দিতে পারলে এ সমাজ খানিকটা নিরাপত্তা বোধ করে। তবে এ অবস্থা তৈরির পেছনে হয়ত কোন না কোন ব্যাচেলরের কিঞ্চিৎ হলেও দায় রয়েছে তা আমি অস্বীকার করি না।

যাই হোক, মূল বিষয়ে আসি। আমি অনুধাবন করতে পেরেছি জীবনে বড় হতে হলে ব্যাচেলর লাইফ তথা মেস লাইফের সাথে সংস্পর্শ থাকা খুবই জরুরি। আপনজনদের থেকে কিছুটা দূরত্ব, খানিকটা অপ্রাপ্তি, কিছুটা কষ্ট ইত্যাদির সাথে লড়তে শিখতে তথা সংগ্রামী ও আত্মনির্ভরশীল জীবন গড়তে ব্যাচেলর লাইফ অপরিহার্য প্রশিক্ষণশালার ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ ২২ বছরের ব্যাচেলর জীবন তথা মেস জীবন কাটানোর নিরঙ্কুশ সুযোগ হয়েছে আমার (এ নিয়ে ‘মেসে ২৫ বছর’ শীর্ষক একটি বই রচনা প্রায় শেষের পথে)। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অবস্থা পার করেছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মেস খুঁজতে গিয়ে। আমি জানি, এমন অভিজ্ঞতা আরো বহু জনের রয়েছে।

বাসা ভাড়া নিতে গেলে আগন্তুক ব্যাচেলর বাড়িওয়ালা এটি জানতে পারা মানেই তিনি বুঝে ফেলতেন এরা হয় সাজাপ্রাপ্ত আসামী না হয় করোনা পজেটিভ। শুরু হয়ে যেত কথার দূরত্বের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা। তারপর সামান্য সৌজন্যতাটাও কেউ কেউ দেখাতে ভুলেই যেতেন।
কী করি, কোথায় যাব? বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলেও সিট সঙ্কট।

অবশেষে একদিন আমি আর আনিস সন্ধ্যার পর ঝিনাইদহ শহরের আদর্শপাড়া এলাকার গলিতে গলিতে ফেরিওয়ালার মতো ‘রাখবে-ন ভালো ব্যাচেলর ছিলো-ও-ও’ হেঁকে হেঁকে একটুখানি মাথা গুঁজার আবাসিক সুবিধা পেতে প্রার্থনা করেছি। তাতেও অনেকের মন গলেনি। অসহায় ব্যাচেলর জীবনের নিষ্পাপ আকুতিটুকু বন্ধক রেখে সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে কোনদিন যদি সামর্থ্য হয় তবে একটি ভবন নির্মাণ করব। নাম দিব ‘ব্যাচেলর ভবন’। নিচে লেখা থাকবে ‘শুধুমাত্র ব্যাচেলরদের জন্য’। প্রসঙ্গত একটি কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। উপরের প্রতিজ্ঞার কথা কখনো যখন ক্লাসে ব্যক্ত করতাম তখন আমার কিছু প্রিয় স্টুডেন্টরা বলতো, “স্যার নিচে ব্র্যাকেটে লেখা থাকবে না? মালিক নিজেও একজন ব্যাচেলর (অবশ্য তখনো আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসিনি)!”

এক পর্যায়ে আদর্শপাড়াতেই এক রুমের একটি মেস পেয়েছিলাম। আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সাথে বলতে চাই, আশপাশের অনেক আপত্তি উপেক্ষা করে বাড়ির মালিক আক্কাস ভাইজান আমাদের ঘরটি দিতে রাজী হয়েছিলেন এবং যথার্থই তিনি আমাদের (আমি, ই¯্রাফিল, আনিস ও মাহবুব) আগলে রেখেছিলেন। বলা যায় সেটিই ছিল নব্বইয়ের দশকের অলিখিত ব্যাচেলর ভবন। আমরা মেস ছেড়ে দেয়ার পর সেটি ভেঙ্গে সেখানে বাড়ি করা হয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমাদের আচরণ, চলা-ফেরা ও উন্নত দায়িত্বশীলতায় কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেশীদের মনোভাবের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। এবং তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেটা আরেক দিন বিস্তারিত লেখার আশা রাখি।

খিলগাঁও, ঢাকা

১৪.০৯.২০২০

 

আরও পড়ুন