আমার শৈশব ও বৈশাখ

মঞ্জিলা শরীফঃ

বাংলা নববর্ষের কথা বলতে গেলে আমার শৈশব কৈশোর দিয়ে শুরু করতে হয়। গ্রামের আলো বাতাস গায়ে মেখে তিড়তিড় করে বেড়ে উঠা এই আমি তখন বুঝতাম না কি বৈশাখ কি জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র অথবা আশ্বিন, কার্তিক। কার্তিকের অভাব বড়দের মুখের আদল কেমন জানি বদলে দিত। হাসি খুশি মুখের পুরাটা আদল ঘিরে বিষন্নতা আর হতাসার দখলে থাকতো।  চারিদিকে কাতি কালের আকাল, অভাব ঘিরে থাকতো গ্রামের আনাচে কানাচে। সবাই অপেক্ষায় থাকতো নতুন ধানের নতুন ফসলের, অপেক্ষা অাগন মাসের মানে অগ্রহায়ন মাসের। অগ্রহায়নের একটা নতুন নতুন ভাব নতুন ধানের ঘ্রান নতুন চালের নরম ল্যাটকা ভাত যা আমার পছন্দ ছিলোনা কিন্ত সবাই কেমন মজা করে খেত মনে হতো যেন সাতজনমে তপস্যা করে তবেই না খেতে পাচ্ছে।  দেখে আমার মেজাজটা তিরিক্কি হয়ে যেত। আরে বাবা আমার চাই ডাবরে রাখা পুরান চালের শলা শলা ভাত তার সাথে লাল শুকনা মরিচের লাল লাল করা আলু ভর্তা। আমার বড় খালা মাইনর পাস করা হোমিও ডাক্তারি করতেন হাজেরা খন্দকার খুব মজা করে আলু ভর্তা বানাতেন। বড় খালার বাড়ি গেলে বা বড় খালা যদি আমাদের বাড়ি আসতেন সবার একই বায়না খালা আপনি আলু ভর্তা বানাবেন খা ব–।  ব্যাস হয়ে গেল অমৃতের স্বাদ নেওয়া। অগ্রহায়ণ মাসের আরও একটি মাধুর্যযুক্ত ছিল নতুন চাল আর নতুন লালি গুঁড়ের এখন যা গুঁড়ের পায়েশ বলে তবে আমরা খিঁড় বলতাম, গ্রামে এখনও খিঁড়ই বলে। গাঁও গ্রামের সবাই ঐ সময়টার অপেক্ষায় থাকতো। কখন গামোর ধানের বুক সোনার বরণে সাজবে। আমি অতশত বুঝতাম না তবে বড়দের চোখে মুখে এক উৎকন্ঠা আর আনন্দ একসাথে খেলা করতো। গাঁয়ের বধুরা যাদের মোটা ভাত আর মোটা কাপড়ের আশায় সকাল দুপুর আর সন্ধ্যা এক ভাবে খেটে মরে তারাও নোলক পড়া নাকে আর্ধ ছেঁড়া শাড়িতে আধখোলা ঘোমটার ফাঁকে উৎসুক দৃষ্টি তুলে তাকায় দিনের শেষে ঘরে ফেরা ঐ আশাবদী মানুষটির মুখে।

পৌষে ভিষন শীত হলেও সবাই বলতো এতো কি  শীত! শীততো নামেইনি আসছে সামনে ” মাঘের শীতে বাঘ কান্দে “,। বাঘ তো থাকে শুনেছি সুন্দর বনে বইয়েও লেখা আছে তাহলে আমাদের এখানে কি হবে গরুগুলো কি কান্দিবে?  মায়ের কাছ থেকে গুনে গুনে মাঘ মাসের আগমনি বার্তা জেনে নিতাম কারণ গরুর কান্না এবার আমাকে দেখতেই হবে। অবশেষে মাঘ মাস আসে গ্রামে ঘুরে ঘুরে গরুর চোখ পরীক্ষা করতাম। নিজের বাড়ির গরু দিয়ে শুরু করতাম তার পর্যায়ে ক্রমে সব গরু — না গরু তো কান্দে না চটের জামা গায়ে দিয়ে দাঁড়ায়ে থাকে, আবার কখনও বা বসে কখনও বা শুয়ে জাবর কাটে।

তাহলে এটা কি হল? এখানে তো বাঘ নাই শীতে কে কান্দিবে আর গরুরাও কান্দেনা তাহলে এখানে মাঘের শীতের কোন ভয় নেই। এবার প্রশ্ন মায়ের কাছে!  ছাত্রী তো অনেক পড়ান অনেক কিছু জানেন অনেক কিছু পড়ান! তাহলে মাঘের শীতে বাঘ কান্দে এখানে বাঘ নাই গরুও কান্দে না তাহলে এই শীতে কি হবে? বাঘ কি আসলেই কান্দে?  মায়ের আঁচল ধরে সারাক্ষন এক ঘ্যাঁন ঘ্যাঁনানি। অসহ্য হয়ে মা কয়েক ঘাঁ পিটানি দিয়ে এক কাঠা মুড়ি সহ বসিয়ে বললো খা—! আর যদি প্যান প্যানানি শুনি আবার খাবি —। ব্যাস এবার শব্দ নেই চোখের পানি গাল বেয়ে নাকের পোঁটার সাথে মিলে হাত ধরে চলা শুরু বুক গড়িয়ে পেট বেয়ে নীচের দিকে —–

ওদিক থেকে মায়ের আবার শাসনের সুর কি রে খাসনা ? এবার তোকে বাঘের কাছেই রেখে আসবো, বাঘ বিশারদ হওয়ার জন্য।  সামনের শীতে তোকে বরিশাল পাঠাব ওখান থেকে খুলনা সুন্দরবন কাছেই আর তোর কাকুকে বলব মাঘ মাসে যেন সুন্দর বনে রেখে আসে এই বাঘ বিশারদকে।

এবার তো ঘটলো উল্টা ঘটনা, শুনেছি বাঘের নাকি মানুষ চোখে দেখা লাগে না গন্ধ পেলেই হা লু ম— তাহলে উপায় ? বুকের ভিতর ভয়ে টিপ টিপ করতে লাগলো ভয়ে আমার হাত পা কাঁপা শুরু করলো কিছুক্ষনের মধ্যে গলা ছেড়ে দিলাম এক চিৎকার মা এবং বাড়ির বড়রা দৌড়ে এলো এই কি হয়েছে? সব ভয় দুরে ঠেলে মানে আগে ছিলো মার মারের ভয় এখন বাঘের ভয় মনে হল বাঘের চাইতে মা ই নিরাপদ তাই মাকে জড়িয়ে ধরে ভিষন কান্না শুরু হল, মা আমি বাঘ দেখবনা না মা আমি দেখবনা আমি যা ব না।  এবার মা বুঝলেন বিষয় টা কি? কিছুতেই আমার আর কান্না থামাতে পারেন না। অনেক চেষ্টায় আমার কান্না থামলো তবে বিপদ ঘটলো অন্যখানে। সন্ধ্যার পর সেই গায়ে ভিষন জ্বর জমে মানুষে টানাটানি চললো কয়েক দিন। এম বি বি এস ডাক্তার কয়েক দিন ঘোরাঘুরি চললো। কিছুতেই কিছু হয় না। মসজিদের ইমাম হুজুরের পানি পড়া, বাদশা মামার কুইনিন সিরাপ এমন কি আমার হোমিও ডাক্তার বড় খালা মানে হাজেরা খন্দকারের হোমিও পুরাও বাদ গেল না। তবে এক সময় হার মানতে হয়েছে জ্বর কে। আমার জানা বা বুঝা হয়ে গেছে এটাই মাঘ মাস বাঘ না কাঁদলেও আমি ঠিক কেঁদেছিলাম।

গাছের পাতা ঝরা শূন্য বুক হাহাকার করা মাঠ চৌচির ধুলা উড়া চৈত্র মাস রুক্ষ হলেও সে স্মৃতি আমায় সারাক্ষন রশি ধরে টানে। আমি যখন দেশের বাহিরে ছিলাম তখনও চৈত্রের হাওয়া গায়ে মাখতে বাসা থেকে বেরিয়ে পাশের দেবদারু আর শাল বাগানে বসে থাকতাম আর ভাবতাম আমার গাঁয়ের স্মৃতি ঘেরা সেই ক্ষনের কথা। খুব মিস করতাম দেশ মাটি গ্রাম আর গাঁয়ের রোদে জলে পোড়া সেই তামাটে মানুষদের।

এবার স্মৃতি ঘেরা সেই বৈশাখ—- এসো হে বৈশাখ এসো এসো, এখন গানে গানে ছড়ায় ছড়ায় বৈশাখ আসে।  তখনকার দিনে মানে আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বৈশাখ আসতো হেঁটে হেঁটে কিছু উৎসকে ভর করে। এখন তার মাহাত্ম্যকথা  বুঝি তখকার দিনে এটা বুঝার কোন উপায় ছিলোনা। কাছে কুলে তেমন কোন উৎসবও হতনা শুধু বড় বড় কিছু ব্যাবসায়ী হালখাতা খুলে বসতো।  ঐ দিন দোকানটা রঙিন কাগজ তিন কোণা একটু লম্বাটে করে কেটে সুতলি মানে পাটের চিকন দড়ির সাথে গমের আটা জ্বাল করে আঠা বানিয়ে সেই আঠা দিয়ে লাগিয়ে দোকানের সামনে সাজাতো।  হিন্দু ব্যাবসায়ীরা মাইক বাজাতো কিন্তু মুসলমান ব্যবসাীরা মাইক বাজাতে পারতনা পাপ হবে বলে। আসলে এটা ছিল ধর্মের প্রতি শিষ্ঠাচার। তখন জানতাম আজ হালখাতা, সারা বছর যারা দোকানে জিনিস কেনাকাটা করে আর যাদের নামে বাঁকির খাতায় জমে থাকা বাঁকি টাকা সেই বাঁকিটা সব শোধ করে দেয় আর দোকানদার সেই দিন আবার একটা নতুন খাতা খোলে। দোকানদার সেদিন তার দোকানের লক্ষী খরিদ্দারদের জন্য মিষ্টি মুখের ব্যবস্হা করতেন, মিষ্টি জিলাপী কত কিছু। কান্তু আমার ভাগ্যে তা কখনও জোটেনি সে আপশোস মনের কোণে বৈশেখ এলে এখনও খোঁচা খুঁচি করে। এটা তো গেল হালখাতার কথা সেই সময় সারা বছর ধরে আমাকে উদ্দেলিত করে রাখতো যে দিনটি আর দিন গুনতাম কবে আসবে সে সময় যদিও সেখানে যাওয়ার ভাগ্য কখনও হয়নি দলে দলে সবাই যেত আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে পাঁথারের পথ ধরে সেটা দেখাটাই যেন আনন্দের ছিল —- তা ছিল ক্যাঁল্লাকোষার মেলা। এটা বগুড়া জেলার শেরপুর থানার ভিতর ক্যাঁল্লাকোষা নামক নন্দীগ্রামের গা ছোঁয়া শেরপুরের সেই গ্রামে  প্রতি বছর বৈশাখের পয়লা তারিখে মেলা বসে এখনও হয়তো বসে। চৈত্রের শেষ দিনে সকালে পান্তা পানি খেয়ে কেউ কেউ বা বৌয়ের রান্না করা গরম ভাত খেয়ে সাথে কিছু গামলাতে করে ভাত ভাতের ভিতর বাটিতে তরকারী ঠিক গামলার মাঝখানে যত্ন করে নিত তার পর সেটা একটা টিনের যতটা সম্ভব সুন্দর দেখে প্লেট দিয়ে ঢেঁকে গামছা দিয়ে বেঁধে ভারে করে নিয়ে যেত কিছুটা মাঝ রাস্তায় খেত কিছুটা মেলায় গিয়ে রাতে আধা সাজানো মেলা দেখতে দেখতে খেত। গ্রামের প্রায় সব পুরুষ মানুষরা যেত। ঐদিন গ্রামটা বলতে গেলে থাকতো পুরুষ শূন্য। সেই সুযোগে গ্রামের মহিলারা দুপুরের খাওয়া সেরে পানের বাটা নিয়ে কেউবা আম তলায় কেউবা বাঁশঝাড়ের গাঘেঁষে পান চিবাতে চিবাতে কে কে কি কি আনতে বলেছে কর্তাকে সেই হিসাব মিলাতো। হঠাৎ কেউ মাথা চাপড়াতে চাপরাতে বলতো হায় হায় বুবু হামি তো উমুক জিনিসটার কথা ভুলেই গেছি, কি ভুলডাই না করিচি বনি। গেল তো তার মনের সকল আনন্দই মাটি। এক অশান্তির ভিতর দিয়ে কি বিষাদময় সময়টাই না পার করতে লাগলো। কিছুইতো করার নেই তখনতো আর এখনকার যুগের মত মোবাইল ফোনের যুগ ছিলো না যে কল করে বলবে এমন কি ভিডিও কলে এক নজর জিনিসটা দেখে পছন্দ করে নিবে। পরের দিন রাত না হলেতো আর কি কিনলো কি আনলো কি কি ঘটেছে রাস্তায় যেতে যেতে তা জানার উপায় নেই কারণ সকালে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছে বিকেলে ওখানে পৌঁছাবে। তারপর সবাই ঐ খোলা মাঠে ঘুমাবে গল্প করবে, অচেনা মানুষ চেনা পরিচিত হবে কেউ কেউ আবার মিতা বা বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে, কেইবা আমার দুই জনার মেয়ের সাথে সই পাতানোর উৎসব করবে সেই বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে মত কত কি আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবে শুরু হবে দুই পরাবারের পাকা আত্মীয়তা নাইওর আনা নেওয়া। এই সম্পর্কটা নাকি নষ্ট করতে নেই। সত্যিই  কত সহজ সরল কতনা মধুর সময় ছিল তখন আর তখনকার মানুষ। কেউ কারো অনিষ্টের কথা চিন্তাও করেনি। 

আমার শৈশবের বৈশাখ ছিলো ভিকু চাচা —- তাহলে বলি ভিকুচাচা আমাদের বাড়িতে থাকতে সব কাজ করতেন গরু ছাগল দেখতেন মাঠে হাল নিয়ে যেতেন বাজার করতেন, ধান রোয়ার কিষাণ বা ধান কাটার কিষাণ লাগলে তাদের তদারকি করতেন।  আমরা তাকে ভিকু চাচা বলেই ডকতাম। আধবয়সী মানুষটা আমাদের কতনা স্নেহ মায়া করতেন। কখনও শীতের রাতে বা সন্ধ্যার অবসরে আমাদের কত গল্প শুনিয়েছেন। তার নিজের জীবনের গল্প বাড়িতে রেখে আসা ছেলে মেয়ে অভাবী চাচীর গল্প শুনিয়েছেন। কত কিচ্চা যে শুনেছি চাচার কাছে। সুয়োরানী দুয়োরানী, ডালিম কুমার, বেদের মেয়ে আরও অনেক। সেসব আজ স্মৃতি।

সেই ভিকু চাচা যেতেম আমাদের বাড়ি থেকে, বটি খন্তি কড়াই, সাব্বল, কোদাল,দাও পাচুন লাঙল আর লাঙলের ফাল, মহুরি, মেথি, পাঁচফোঁড়ন  আরও যে কত কিছু ফর্দে থাকতো। দুনিয়ার সব ভালো জিনিস নাকি ওখানেই পাওয়া যেত। মনে হতো এতো কিসের কেনার দরকার রে বাবা তারচেয়ে তো খাবার জিনিস আর খেলনাই ভালো। পরের দিন ভিকুচাচা যখন আসতো মুড়কি, খই জিলাপি, মিষ্টি, গুড়ের কদমা, ঝুড়ি,আরও কত কিছু যে আনতো তার সাথে ছিলো খেলনা।  খেলনা বলতে টমটম গাড়ি আর বাঁশি, মাঝে মাঝে ঘূর্নিও থাকতো তবে আকর্ষন ছিলো টমটম আর বাঁশি। সেদিন আর রাতে ঘুম হতোনা, মাথার কাছে নিয়েই শুয়ে থাকতাম মাঝে মাঝে বিছানার সাথে ঘষে ঢপ ঢপ শব্দ শুনার চেষ্টা করতাম কিন্ত পারতামনা কারন মা ধমক দিয়ে দমিয়ে দি ইচ্ছা টা। হতাশা বুকে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম জানিনা।  কিন্তু দুরে ভেসে আসা বাঁশির পুঁওওও শব্দ কাক ডাকা ভোরেই ঘুম ভাঙাতো। শুরু হলো সেই বাঁশির পুঁওওও পুঁওওও আর টমটম গাড়ির ঢপ ঢপ ঢপ শব্দ করে সারা পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো। আমার এই শৈশব আমার এই বৈশাখ এখনও আমাকে তাড়াকরে বেড়ায়। আমার ভালো লাগা স্মৃতিঘেরা ভালোবাসার স্বপ্নময় বৈশাখ।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন