জীবনের পূর্ণতা

আফসানা শারমিন

পর্ব-১

প্রতিদিন ফজর পড়ে হাঁটতে বেরোন মাহবুবুর রহমান সাহেব ।ডায়াবেটিস হওয়ার পর থেকে নিয়মিত হাঁটেন তিনি,১ ঘন্টা হেঁটে বাসায় ফেরেন।বাসায় গিয়ে দেখেন ওনার স্ত্রী আমেনা বেগম নামাজ শেষ করে কোরআন পড়ছেন, সারা ওনার জন্য নাস্তা রেডি করে রেখেছে ।বাসার সবাই ততক্ষণে ওঠে গেছে।
ওনার ৪ সন্তান ,
বড় ছেলে কায়সার মাহমুদ -ব্যাংকে জব করে,
বড় ছেলের বউ সারা মেহবুবা -সরকারী কলেজের প্রফেসর ,
বড় মেয়ে আসমা কবির – স্বামী আশফাক কবির ,আর দু ছেলে আসিক, আসিফ কে নিয়ে আমেরিকা থাকে বছর পাঁচেক হলো।
ছোট ছেলে আরমান মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ে,
ছোট মেয়ে আফরিনা মাহবুব ক্লাশ টেনে পড়ে।
আর হ্যাঁ , বড় ছেলের ঘরের তিন নাতি-নাতনি,
প্রথম দুজন যময , নাতনি -মিরহা রহমান , নাতি- মেহরাব রহমান , ছোট নাতি – মেহরাজ রহমান ।

মাহবুব সাহেব কলিং বেল দিলেই মেহরাব দৌড়ে এসে দরজা খুলে দেয় ।
– আস্সালামুআলাইকুম দাদাজান।
– ওয়ালাইকুমুস্সালাম দাদা ভাই।
পিছন থেকে চোখ ডলতে ডলতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এসে মেহরাজ ও সালাম দেয় ।
– সারা এসে বলে আব্বুজি ফ্রেস হয়ে আসেন ,নাস্তা রেডি করে রেখেছি।
সকাল বেলাটা সারার ছোটাছুটি করে সব কাজ করতে হয়, সাথে ওর শ্বাশুরী, আফরিনা, রুমা খালা ও হেল্প করে। ফজরের নামাজ পরে সবার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করা, মাহমুদের -লাঞ্চ, প্রয়োজনীয় ফাইল ব্যাগে গুছিয়ে দেওয়া, মিরহা- মেহরাবের স্কুলের যাওয়ার জন্য সাহায্য করা, শ্বশুর শ্বশুরীর ও বাচ্চাদের জন্য ১১ টার নাস্তা তৈরি করে রাখা , দুপুরের রান্না রেডি রাখা ,নিজে রেডি হয়ে কলেজ যাওয়া।কলেজ থেকে এসে দুপুরের খাবার রান্না করা, মেহরাজ কে গোসল করানো ,নিজে গোসল করে নামাজ পরে এসে সবাইকে খাওয়ায়।
মেহরাজ কে ঘুম পারিয়ে, মিরহা-মেহরাব ,আফরিনা কে পড়ায়।
আসরের পরে বিকেলে সবার জন্য নাস্তা বানায় ।
এটা সারার প্রতিদিনের রুটিন ।
মাহমুদ, মাসুদ বাসায় ফিরে সন্ধ্যায়।
মাহমুদ ব্যাংক থেকে ফেরার পথে ওদের সুপার সপ্ টা ঘুরে আসে ,সারাদিন কি কেনা- বেচা হলো তা দেখে আসে।আর মাসুদ ক্লাশ শেষ করে একটা কোচিং এ ক্লাশ নেয়।
মাহবুব সাহেব দিনের অনেক টা সময় সুপার সপে ও বাসার সামনে নিজের হাতে করা বাগানে থাকেন ।
তিন তলা বাসার সামনে অনেক টুকু অংশে তিনি বাগান কেরেছেন।সকাল – বিকাল দাদা ,নাতি- নাতনি মিলে গাছের পরিচর্যা করেন। হরেক রকমের ফুল- ফলের ,সবজির গাছ।
রমজান মাসটা আসলেই বাসার সবাই অনেক খুশি হয়। রমজান মাসেকে ঘিরে সবাই মিলে অনেক পরিকল্পনা করে ।
রমজান মাস আসার আগেই অনেক কিছুর লিস্ট করা হয় ।
বাজারে সব দোকানদারদের ইফতার খাওয়ানো,
মসজিদে ইফতার পাঠানো,
গ্রামের গরিব মানুষদের রোজার বাজার পাঠানো ,
রহমত চাচা,করিম চাচা, দুলাল, রুমা খালার জন্য
রোজার বাজার পাঠানো,
বাসায় কিছু গরিবদের ইফতার করানো,
সবার জন্য ঈদের বাজার করা ।
রমজান মাসে সারার কলেজ ও আফরিনা স্কুল বন্ধ থাকে।
সারা শ্বাশুরীর সাথে সব কাজে সাহায্য করে , সেহেরির রান্না ও নিজেই করে , হরেক রকম ইফতার বানায়।ফাঁকে ফাঁকে ওর আম্মুর জন্য ও শ্বাশুরীর জন্য হিজাব, আসমা আপা ,আফরিনা ও ওর ছোট বোন সাবার জন্য থ্রিপিজ, মিরহা-মেহরাব ,মেহরাজের জন্য ঈদের জামা সেলাই করে ।
মিরহা-মেহরাব প্রতিদিন সকালে দাদাকে নতুন সূরা মুখস্ত করে শুনায় আর সবার কাজে সাহায্য করে।ওরা ক্লাস টু তে পড়ে।
এবারের রমজানের ওরা প্রতি শুক্রবার রোজা রাখছে।২০ রমজানের ওদের স্কুল ছুটি দিলো।
আজ স্কুল ছুটির শেষে বাসায় ফিরে মিরহা দৌড়ে সারার কাছে আসলো,
– জানো আম্মু আজ স্কুলে কি হয়েছে ? আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে তোহার সাথে ধাক্কা লেগে পরে যাই ,ভাইয়া দৌড়ে এসে আমাদের তুলে , আর আমাকে জরিয়ে ধরে বলে ,কেন ধাক্কাধাক্কি করে নামছিলাম?এজন্যই তো পরে গেছি ,আর যেন কখনো এভাবে না নামি,মিরহা তুমি আমার বোন তুমি ব্যথা পেলে যে আমার ও ব্যথা লাগে।আর আমাদের সব বন্ধুদের বলল, আমরা যদি এমন করে নেমে ব্যথা পাই ,তাহলে তো আব্বু- আম্মু ও অনেক কষ্ট পাবেন।
ভাইয়ার কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে আসলো, আর গর্বে আমার বুকটা ভরে ওঠলো
আমার ভাইয়া টা কত ভালো, অনেক ভালোবাসে আমাকে । আমি ও ভাইয়া কে অনেক ভালোবাসি আম্মু ।
একদমে সব গুলো কথা বলল মিরহা ।
সারা মিরহা কে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল – মেহবরাব এসব বলেছে , কোথায় ও ?
– পিছন থেকে মেহরাবও মাকে জড়িয়ে ধরে ।
– সারা বলল, শোন পৃথিবীতে পবিত্র সম্পর্কের মধ্যে অন্যতম হলো ভাইবোনদের সম্পর্ক, ভাই সবসময় বোনকে ভালবাসবে ,আদর করবে ,বোনের ভালো মন্দ দেখবে।দেখছো তো তোমাদের আব্বু ও তো তোমাদের ২ ফুফিকে কত আদর করে ।কত কিছু উপহার দেয় ।বোন ও ভাইকে ভালোবাসবে , ভাইয়ের কথা শুনবে , ভাইদের আদর করবে , এটিই তো নিয়ম।
সারা ওদের দুজনের কপালে চুমু দেয়, ওরাও খুশিতে সারা কে জড়িয়ে ধরে চুমু দেয় ।
– যাও তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নাও দাদাভাইয়ের সাথে বাহিরে যেতে হবে,তোমার দাদাভাই আজ যাকাত দিতে যাবেন ।
ওরা চলে যেতেই সারার সালমানের কথা মনে পড়ল, সালমান ওর ছোট ভাই, ওদের দু বোনের এক ভাই, মাসুদ আর সালমান একসাথে ভার্সিটিতে পড়ে ।
সালমানের যখন জন্ম হয় তখন সারা ক্লাশ ফাইভে পড়ে, সালমান কে পেয়ে সারা আর সাবা মহা খুশি ছিল ।সারাদিন সালমান কে নিয়ে ই থাকতো ,বড় হয়ে সালমান ও আপুদের কথা শুনে , ও আপুদের মতো মেধাবী । বিশেষ করে সারা কে ওর মনের কথা সব শেয়ার করে।মাসুদ ও সালমান ছোট থেকে একসাথে পড়ছে, স্কুল, কলেজ ,এখন ভার্সিটি।
সালমান ও মাসুদের বন্ধুত্বের খাতিরেই সারা আর মাহমুদের বিয়ে হয় ।
দুটো পরিবার কে এখন একসাথে একটা বড় পরিবার বলা চলে , আনন্দ, খুশি ,কষ্ট সবাই একসাথে মিলে মিশে ভাগ করে নেয়।
– বিকেলে অফিস থেকে ফিরে এসে মাহমুদ সারা কে বলল, ওর অফিসের দারোয়ান আফজল ভাইয়ের আব্বা স্ট্রোক করেছেন, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, অনেক টাকা লাগছে ওরা সব কলিগের মিলে হেল্প করবে।
– বেশ তো আমার কাছেও কিছু টাকা আছে ,লাগলে নিয়ো।
– তুমি ঈদের জামা তো কিনোনি , ঐ দিন সবার জন্য জমা কাপড় কিনলে , বললে পরে কিনবা….
এখন না নেওয়ার চিন্তা করছো ,বুঝতে পারছি ।
সারা তোমার সাথে আর পারিনা ,সারাক্ষণ কার কি লাগবে সেটাই ভাবতে থাকো ,নিজের বেলায় ফাঁকি ।
– সারা মাহমুদ কে জড়িয়ে ধরে বলল,আমার তো তুমিই আছো … এই গোটা পরিবার টা ও আমার… আমার আর কিছুই চাই না জনাব।
– আর জামার কথা বলছো ?
গত মাসে আমার আর আসমা আপার জন্য আম্মু যে জামা দিয়েছেন সেটাই তো রয়েছেই, এখনো সেলাই করিনি ।দেখি ওদের গুলো শেষ করে আমার টা বানাবো।
– সারা তুমি কি করে যে সব করো , ভেবেই পাই না ।তুমি এত উদার বলেই সবদিক সামলাতে পারছি।
“তুমি আছো তাই ,এত ভালোবাসা পাই
তুমি আছো বলে তাই ,আমি ভালোবেসে যাই “।
– হয়েছে, আর আমার গুন গাইতে হবে না ।ইফতারের সময় হয়ে এলো , আসো তাড়াতাড়ি ।
-আর আসমা আপা কল দিয়েছিলেন, বলল আগামী সপ্তাহে আসছেন ওনারা।
– ইফতারের পর সবাই বসে আলোচনা করে সবে কদ্বর নিয়ে ।

পর্ব-২

সালমান ও মাসুদ দুজনই মিলে সবার জন্য ঈদের শপিং করল।মাসুদ বাসায় ঢুকেই মেহরাব, মিরহা ,মেহরাজ কে ডাকলো ,কই সব তাড়াতাড়ি আসো ,দেখো সবার জন্য কি নিয়ে আসছি ।
মাসুদ প্রথমেই বাবা- মার কাছে গেলো।বাবার জন্য ছোট কোরাআন শরীফ, মার জন্য সুন্দর কারুকাজ করা কাঠের একটা রি-আল আনলো ।
পরে মাসুদ ও সালমান মাহমুদের রুমে গেলো।
– ভাইয়া আসতে পারি ।
– আসো ,মাসুদ ।
-আস্সালামুআলাইকুম ভাইয়া ।
– ওয়ালাইকুমুস্সালাম, কি খবর দুজনের ।কেমন আছো?
এত ব্যাগ কিসের?
-ভাইয়া -ভাবী আপনাদের জন্য কিছু উপহার এনেছি, বাচ্চাদের জন্য ও ।
– সারা বলল, তোমরা আবার উপহার আনতে গেলে কেন?
– সালমান বলল, সব সময় শুধু আপু আপনারাই দিবেন।বেশি কিছু আনেনি ।ছোট ছোট গিফট ।
– ভাইয়ার জন্য একটা পারফিউম, তোমার জন্য এই বই, মেহরাব জন্য এই গল্পের বই, আফরিনা আর মিরহার জন্য এই মেকআপ বক্স, মেহরাজের জন্য এই খেলনা গাড়ি।
– এত কিছু এনেছো ,আর বলছো অল্প কিছু ।
– মাহমুদ পারফিউম পেয়ে খুশি হলো ।খুশিতে নিজের আর বাচ্চাদের গায়ে একবার দিয়ে দিলো।
সালমান আর মাসুদ কে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিলো।দেখাদেখি মেহরাব , মিরহাও ওদের জড়িয়ে ধরে ।
– সারা ও প্রিয় লেখকের বই গিফট পেয়ে মহাখুশি।
তোমরা জানো, আমি এ বই কত খুঁজেছি, পায়নি ।
কোথায় পেলে এটা , আর জানো কি করে আমার এটা পছন্দ ।
– ভাবী , সালমান বলল। আপনি এ লেখকের বই পছন্দ করেন।
– মিরহা গিফট পেয়ে দৌড়ে আফরিনার কাছে চলে গেলো। আর মেহরাবও মজার গল্পের নিজের রুমে গিয়ে পড়তে শুরু করলো।
– আব্বু- আম্মুর জন্য কি আনছো ?
– মাসুদ বলল, দুজনই আব্বুদের জন্য ছোট কোরআন শরীফ আনছি ।আব্বু তো সবসময়ই কোরআন তেলওয়াত করেন , আর আম্মার জন্য রিআল , আগের টা দেখলাম গুনে খেয়েফেলেছে।
– সালমান বলল, আপু আপনি তো গতবার আম্মু কে সোনার বালা বানিয়ে দিয়েছেন, আমি এবার আম্মুর জন্য সোনার নাকফুল আনছি , এই দেখেন।
– সারা বলল ,আম্মু অনেক খুশি হবেন।বাসায় গিয়েই আম্মুর হাতে এটা দিবা।
– মাহমুদ বলল,খুব ভালো করেছো ।দেখছো সারা , সব বড় হয়ে যাচ্ছে ।আমি একটু নিচে যাচ্ছি , করিম চাচা এসেছেন ।
মাহমুদ চলে গেলো।
– সারা বলল, তোমাদের জন্য কি কিনলা?
– পাঞ্জাবি- পায়জামা তো পেয়েছি, শার্ট আর জুতো কিনেছি।
– তা তোমাদের সব রোজার সব প্রোগ্রাম শেষ ?
– আপাতত শেষ, তবে এবার আরেক টা কাজ শুরু করবো ।আমদের ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাদের স্কুলের যারা এস .এস. সি তে এ প্লাস পেয়েছে এইসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের কলেজের কিছু পাঠ্যবই বিতরণ করবো ।
– সারা বলল ভালো উদ্যোগ নিয়েছো।
– আপু,অনেক টাকা লাগছে । আমরা টাকা ম্যানেজ না করতে পারলে আপনার কিন্তু হেল্প লাগবে ।
– সমস্যা নাই, লাগলে অবশ্যই বলবা।আমি অবশ্যই হেল্প করবো। চিন্তা করো না, আমি ও আমার ব্যাংকার সাহেব আছেন তো। সাবা আর ডাক্তার সাহেব কে ও বলো। আসমা আপা আর কবির ভাইকে বলবো, সবাই মিলে করলে হয়ে যাবে ।

পর্ব -৩

সালমা ইয়াসমিন ইফতার বানাচ্ছিলেন , কলিং বেলের শব্দ শুনতেই দরজা খুলে দেখেন সালমান এসেছে।
– আস্সালামুআলাইকুম আম্মু ।
– ওয়ালাইকুমুস্সালাম, বাসায় ফিরতে আজ এত দেরি কেন সালমান?
– বড় আপুর বাসায় গিয়েছিলাম, তাই দেরি হলো।আম্মু আপনার জন্য এটা এনেছি, বলে নাকফুল টা মা’র হাতে দিলো। তিনি নাকফুল দেখে অনেক খুশি হলেন , কি যে পাগলামি করো তোমরা ভাই বোনেরা ?
– আম্মু যে কি বলেন,আমি আর কই দামী কিছু দিতে পারলাম ।
– তোমার এই গিফট, আমার অনেক পাওয়া , বলেই সালমানের কপালে চুমু দিলেন ।
– আপুরাও অনেক খুশি হয়েছে ।
– সালমান বাসায় ফিরেছো , বলে ঘরে ঢুকলেন রফিক সাহেব ।
– জী, আব্বু ।আব্বু আপনার জন্য এই ঈদ গিফট, বাবার হাতে তুলে দিলো ছোট পকেট কোরআন শরীফ ।
কোরআন শরীফ দেখে খুশি হলেন, শুকরিয়া বলে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।
– যাও সালমান, ফ্রেস হয়ে আসো ।তোমাদের পছন্দের পায়েস রান্না করেছি আজকে ।
– আব্বু, কাল ছোট আপু বাসায় যাবো ।
বড় আপু , ছোট আপু ও তারেক ভাইয়ার জন্য গিফট দিয়েছেন । আমাদের গিফট গুলো ও নিয়ে যাবো ,আর ঈদের দাওয়াত দিয়ে আসবো।

পর্ব-৪
সারার শ্বশুর বাড়িতে ইফতার করে সবাই জামায়াতে মাগরিবের নামাজ পরে ।তার পরই সবাই রাতের খাবার খায়। তারাবী নামাজ পড়ে হালকা নাস্তা করে সবাই ঘুমাতে যায়।
বাড়ির ছেলে-পুরুষরা তারাবী পড়তে চলে গেলে সারাও মেহরাজ কে ঘুম পারিয়ে নামাজ পরে নেয়।
অন্য রুমে আফরিনা আর মিরহা একসাথে নামাজ পড়ে। মাঝে মাঝে
পাশের বাসায় মহিলা জামায়াতে ওর শ্বাশুরী ও রুমা খালার সাথে নামাজ পড়তে যায় ।
– নামাজ শেষ করে সারার অনেক খারাপ লাগছিল ,
মেহরাজের পাশে শুয়ে পরলো। ক্লান্ত শরীর টা একটু বিশ্রাম পেতেই ও ঘুমিয়ে গেলো।
পায়ে কারোর স্পর্শে ঘুম ভেঙ্গে গেলো সারার। ওঠে দেখে মাহমুদ ওর পায়ে ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছে।
– এসব কি করছো তুমি? পায়ে ঔষধ দিচ্ছো কেন ?
আমিই তো দিতে পারতাম।
– তোমার আর ঔষধ দেওয়া।
পা টা যে এতটুকু পুড়ে গেছে ,
ইশ ,তোমার কত কষ্ট হচ্ছে ।সারাদিন শুধু সংসার নিয়ে পরে থাকো, নিজের শরীরের কোন যত্ন ও নেও না।
– আমার তো মনে থাকে না , অযু করতে গিয়ে মনে হয়েছিলো তাও আবার ভুলে গেছি।তাই বলে তুমি দিয়ে দিবা ?
– অবশ্যই, তুমি তো প্রতিদিন আম্মার পায়ে তেল মালিশ করে ঠিকই আমার জান্নাত পাওয়া সহজ করে দিচ্ছো ,আমি না হয় আমার প্রিয়তমা, যার পায়ের নিচে আমার সন্তানদের জান্নাত একটু সেবা শুশ্রূষা করলাম।
– তা বটে , এত মিষ্টি মিষ্টি কথা তুমি কি করে যে বলো ?
– আমার এ রানীর জন্য তো এসব কিছুই না।
– এজন্যই তো বলি , “তোমায় পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি, ওগো ধন্য ।”
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেঁসে ফেলল।

পর্ব -৫

আসমা আপারা বাসায় চলে এসেছেন, সব বাচ্ছারা আনন্দে হৈচৈ করছে ।
মেহরাব – মিরহা শেষ দিনের রোজাটা ও রাখলো,
ইফতারের সময় সবাই আযানের জন্য অপেক্ষা করছে, মাহবুব সাহেব জোরে জোরে দোয়া পরছেন।সামনে এত খাবার থাকতেও পরিবারের ছোট সদস্য মেহরাজ ও চুপচাপ বসে দাদাভাইয়ের দোয়া শুনে,
দোয়া শেষে মোনাজাত করেন , পরিপূর্ণ ভাবে রোজা করতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
আগামীকাল ঈদ, মসজিদের মাইকে শুনা যাচ্ছে ‘ঈদ মোবারক ‘, ‘ ঈদ মোবারক ‘।
সবাই ঈদের খুশিতে মেতে উঠেছে ।
সারা সবাই কে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে, আগামী কালের কাজ গুলো কিছুটা গুছিয়ে রাখছে।

পর্ব-৬
সকাল হতেই ঈদের আমেজ শুরু হয়েছে ।
সকালে সবাই গোসল করে ঈদের নতুন জামা পরিধান করে একে অপরকে ঈদ শুভেচ্ছা জানালো,ছোটরা সব নতুন জামা পরে বড়দের কে সালাম দিয়ে ঈদের সালামি নিচ্ছে। প্রথমে দাদাজানের ,পরে দাদীজান, আব্বু, ফুফাজী, চাচ্চু , আম্মু, বড় ফুফী,ছোট ফুফী, একে একে সবার কাছ থেকেই সালামি নিলো । ওদের সাথে রুমা খালার ছেলে শাকিলও সামিল হলো। আফরিনা ও ওদের সাথে না হলে ছোটবোন হিসেবে বরাবর ই বড়দের থেকে সালামি পায়। ও সালামির কিছু টাকা আবার ভাতিজা – ভাতিজি ও ভাগিনাদের দেয় ,আর বাকি টাকা নিজের জন্য রাখে। সালামি পর্ব শেষে সবাই হাল্কা কিছু নাস্তা করে ,নাস্তাতে – মিষ্টি খেজুর,কাস্টার্ড, পায়েস, সেমাই, জর্দা ইত্যাদি থাকে। তারপর ঈদের নামাজ পড়তে যায় ।নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি করে সহমর্মিতা প্রকাশ করে।
সারা হরেক রকমের ঝাল-মিষ্টি পিঠা, পায়েস, চটপটি- ফুসকা , নডুলস, জর্দা, আর হালিম রান্না করেছে।
নামাজ পড়ে মাহবুব ও রফিক সাহেব, মাহমুদ বন্ধু বান্ধবদের সাথে নিয়ে একসাথে বাসায় আসেন , সবাই মিলে গল্প করেন , বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন আর খাবার খান।
ওদিকে মাসুদ আর সালমান মিলে প্রথমে সালমানের বাসা পরে আরো ঘুরেফিরে বন্ধুদের নিয়ে বাসায় আসে।
বাসাটা তিন তলা আর চার তলা মিলে অনেকটা ডুপলেক্স সিস্টেমে করা , ডাইনিং রুম থেকে একটা সিঁড়ি চারতলার দুটো রুমের সাথে যোগ হয়েছে । ছাদ থেকে ও ঐ রুম দুটো তে যাওয়া যায় । এক রুমে মাসুদ থাকে অন্যটিতে এক সেট সোফা, বড় বড় তিনটি বুকসেল্ফ একটা টেবিল- চেয়ার রাখা, অনেকটা রিডিং রুম বলা চলে। রুম দুটোতে একটা বাথরুম, আর লাগোয়া বেলকনি আছে। মাসুদ বন্ধুদের নিয়ে ওখানেই আড্ডা দেয় ।
আফরিনা বাচ্চাদের নিয়ে ওর বান্ধবীদের বাসায় ঘুরতে যায়। আফরিনা আর মেহরাব ও মিরহার বন্ধুরাও ওদের বাসায় বেড়াতে আসে।
এই ঘোরাঘুরি চলতে থাকে বিকেল পর্যন্ত ।
সারাও ওর শ্বশুর বাড়ির সবাইকে নিয়ে ওর বাবার বাসায় ঘুরতে যায়।
সন্ধ্যার পরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার সবাই একসাথে বাসায় ফিরে আসে।
প্রতিবছর ঈদের দিন সন্ধ্যার পর ঘরোয়া একটা অনুষ্ঠান হয়, ছোটরা এতে অংশগ্রহণ করে, কেউ কবিতা, গান , কোরআন তেলওয়াত, একক অভিনয় ও করে , এ অনুষ্ঠানটা করার ক্ষেত্রে সারার অবদানটাই বেশি ।রোজার ফাঁকে ফাঁকে ও ওদের কে সুন্দর সুন্দর হামদ , কবিতা, কৌতুক , একক অভিনয় শেখায়।এবার তো আরো আসিফ আর আশিক ও আছে।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে মাসুদ আর সালমান।বিচারক থাকেন ওদের দাদাজান আর নানুভাই ।দর্শক থাকেন ওদের দাদীজান,নানুমনি, আব্বু- আম্মু, ফুফি – ফুফাজী।
প্রথমে মেহরাব – আসিফ মিলে সুমধুর কণ্ঠে কোরআন তেলওয়াত করে অনুষ্ঠান শুরু করে । মেহরাব ও মিরহা মিলে একটা হামদ, আসিফ ও আশিক মিলে একটা কবিতা আবৃত্তি , মেহরাজ একটা ছোট কবিতা, মিরহা একটা একক অভিনয়, শাকিল একটা কৌতুক, আফরিনা আর মিরহা মিলে একটা নাতে রাসূল, মাসুদ আর সালমান মিলে একটা গজল, আবার মাসুদ আর সালমান মিলে সব বাচ্চাদের নিয়ে নাটক করে ।বাহ বাহ , মাশাল্লাহ্ ধ্বনিতে বারবার ঘরটা মুখরিত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠান শেষে সবাই কে পুরস্কৃত করেন বিচারকরা । এতে সব বাচ্ছারা অনুপ্রাণিত হয় ।
মেহরাজ আজ দারুন খুশি ওর পুরস্কার একটা মেজিক কলম আর স্লেট পেয়ে, বার বার আঁকিবুকি করছে আবার মুছে ফেলছে । খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়ল মেহরাজ ।ডিনার শেষ করে সবাই চলে যায় যার যার রুমে।

এমনি করে কেটে যায় তাদের ঈদের দিনটা।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.