মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যেভাবে অপদার্থ

রাশেদ আহমেদ

ছেলে কখনো বাবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারেনি যেখানেঅপদার্থ ছেলেনামক এক শিরোনামে বাবার প্রতিটা কথা শুরু হয় , সেখানে ছেলে হয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্য সত্যি সাহসিকতার প্রয়োজন সেই ছেলে যদি অনেক ক্ষুদ্র কিছু করতে পারে তখন তার ইচ্ছে হয় একটু বুক ফুলিয়ে বাবার সামনে দাঁড়াতে কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনা কিছু বলার জন্য দরজার সামনে হাটা হাটি করতে থাকা এক জোড়া পা ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলতে থাকে হঠাৎ পর্দার আড়াল থেকে কখনো যদি বাবার চোখে বিষটি ধরা পড়ে যায় তখন ধমকের সুরে শুনতে হয় কিরে গাধা , ওখানে ডায়বেটিক্স রোগীর মতো বারবার হাটছিস কেনো ? কিছু বলবি ?” ছেলে মিনমিন করে বলে কেটে পরেকিছুনা বাবা , এমনি !” নিজের রুমে বসে ছোট্ট এক নিশ্বাস ফেলে ভাবে – “আজকেও বলতে পারলাম না বলবে কি করে , অভ্যাসটা তো নেই

এমন অনেক অনুভূতি আছে যা বেশি দিন লুকিয়ে রাখা যায় না , তাই বাবার সামনে থেকে ছেলের মুখটাই লুকিয়ে রাখতে হয় কারণ ছেলের কাছে এটাই সব থেকে সহজ কাজ বয়স বাড়ার সাথে সাথে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা এক ধরনের দায়ের বোঝা অনুভব করতে শুরু করে আপনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান না হলে লিখে এই অনুভূতি বোঝানো সম্ভব না

কিছু বিষয় ভাষা জগতের বাইরে থাকে কাউকে যেমন বোঝানো যায় না ঠিক তেমন করে সহ্যও করা যায় না এক পর্যায়ে হাসিখুসি থাকার মানে হারিয়ে ফেলা অযথাই নিজের চুপচাপ থাকার জগত তৈরি করে ফেলা এমন এক জগত যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ ভালো লাগার বিষয়গুলো ভালো না লাগার বিষয়ে কবে পরিবর্তন হয়ে যায় সে নিজেও জানে না বন্ধুরা মিলে যখন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসে বিভিন্ন খাবার খাওয়ায় ব্যস্ত থাকে , তখন টি স্টলে বসে এক কাপ চা আর একটা সস্তা সিগারেটে যেনো ভালবাসা আর জীবনের মানে খুঁজে চলা ছোট ছোট ধোঁয়াটে নিশ্বাসে যেনো দিনকে দিন সে শিখেএখানে ভালবাসা বড়ই ধূসর প্রকৃতির

ব্যস্ততার দিন শেষে ঘরে ঢুকতেই যখন ছোট বোনটি রুমে এসে বলে , “ভাইয়া , আমার কানের দুলটা এনেছো ? দিন যে বললাম মামুন ভাইয়ের দোকানে নতুন এসেছে… ”
ভাই হয়ে ছোট বোনটির সাথে ইনিয়ে বিনিয়ে মিথ্যা বলতে হয় , “আরে যাহ্ , ভূলে গেছি ! কাল এনে দিবোছোট বোনের কিছু বোঝার বাকি থাকে না বোনটা যে তার এই উঠোনেই বড় হয়েছে ভাইয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বোনটিও বলেভাল করেছো ভূলে গিয়েছো , আমার তো কানের দুল খুব একটা ভালো লাগে না , তাছাড়া পরাও হয় না আনতে হবে না ভাইয়াবোনের রুক্ষপ্রকৃতির মুখটা সেদিন কোনো ভাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখার শক্তি যেনো হারিয়ে ফেলে

সেই ছেলেই হয়তো একদিন সাহস করে বাবাকে একটা ফোন করেই ফেলে সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার থেকে বাবার কাছে ফোন কল করাটা যেনো একটু সহজ !

বৃদ্ধ বাবার কমদামি ফোনটি বেজে উঠে ছেলে ফোন করেছে

ফোনের পাশ থেকে ছেলের ভাঙা কন্ঠে সংক্ষেপে বলাবাবা , চাকরিটা হয়ে গেছে

অশ্রুসিক্ত চোখ বাবার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সাথে মিশে থাকা চশমাটাকে কেমন ঘোলাটে করে দিয়েছে , সেটা ছেলে আর দেখতে পেলো না চশমা খুলতে খুলতে আবেগ প্রবণ বাবা আজকেও বলে উঠলো-“শুনছো , তোমার অপদার্থ ছেলে চাকরি পেয়েছে

মা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে , অজানা সুখের দুফোঁটা চোখের জল তার মলিন আঁচলে মুছতে ব্যস্ত হয়ে যায় বাবামা কখনই জানতে পারে না , তাদের ছেলে কে বলাঅপদার্থশব্দটাকে ঘিরে কতো ভালবাসা লেপ্টে আছে আর ছেলে জানতে পারে না , এইঅপদার্থশব্দটা তাকে কবে পদার্থে রূপান্তরিত করেছে

উৎসর্গঃ সকল মধ্যবিত্ত অপদার্থদের কে !!

লেখকঃ রিপোর্টার, এটিএন বাংলা

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.