বিয়ে

সুমাইয়া আফরোজ

বিয়ে মানে লাল টুকটুকে শাড়ীতে মোড়ানো ফুটফুটে এক বৌ।
অতঃপর সুখে শান্তি বসবাস!

এটা রূপকথা,
আর বাস্তবতা হলো ঔপন্যাসিকের তুলির আঁচড়ে দেখা ফুটফুটে বৌ সবসময় পাওয়া সম্ভব হয় না।
তবে সমস্যা নেই সৌন্দর্যে কমতি হলে কিছুটা অর্থদণ্ড(?) দিতে হবে আর কি!

বাস্তবতা এমনি,
কারণ বাংলাদেশী মানুষ শেতাঙ্গ নয় বরং শ্যামাঙ্গ…
তাই ফুটফুটে মেয়ে খুঁজে পাওয়া সবসময় দুষ্কর হয়ে যায়।
সমস্যা টা আরও প্রকট হয়ে দাঁড়ায় যখন ফুটফুটে মেয়ের সাথে দ্বীনদার, উচ্চশিক্ষিত, উঁচু বংশ ইত্যাদি ইত্যাদি শব্দ যুক্ত করা হয়।
কারন বাংলাদেশের ৩৫-৪০% মেয়ে যদি ফুটফুটে হয় তবে তাদের মাঝে ১০-১৫% দ্বীনি জ্ঞান রাখে এবং মেনে চলার চেষ্টা করে।
আবার এই ১০-১৫% ফুটফুটে দ্বীনদার মেয়েদের ৩-৫% উঁচু বংশজাত (সামাজিক দৃষ্টিকোণ্ থেকে, কারণ ইসলামে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তাকওয়ার দিক থেকে উত্তম)

আর এখন ৬৫-৭০ ছেলে এবং তাদের পরিবারের প্রত্যাশা হলো শেষের ক্যাটাগরি।
এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রত্যাশা পূরণ করতে সমাজ বরাবরই ব্যর্থ।

সে যাই হোক,আমি আসলে পারিবারিক জীবনে ইসলামী সীমারেখা লঙ্ঘনের মারাত্মক কুপ্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে চাইছি।
পরিবারের প্রসঙ্গ আনতে গিয়ে পাত্রীর প্রসঙ্গ চলে আসে।
ডা. জাকির নায়েক তাঁর এক লেকচারে বলছিলেন,
আপনি আপনার সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে সর্বনিম্ন কখন থেকে চিন্তা করবেন,
এমন প্রশ্নের উত্তরে অনেকই বলে থাকেন সন্তান যখন পড়াশুনার প্রাইমারী লেভেলে থাকবে তখন থেকে, অথচ ইসলামের ভাবনা তাদের চেয়ে আরও একধাপ এগিয়ে।
আপনি আপনার জীবন সঙ্গী বাছাইয়ের সময়ই আপনার সন্তানের ভবিষ্যত ঠিক করে ফেলেন।
রাসূল সা. বলেছেন,
পিতার প্রতি সন্তানের প্রথম হক্ক হলো পূণ্যবতী রমনীকে স্ত্রী (স্বীয় সন্তানের ভবিষ্যত মাতা) হিসেবে গ্রহন করা।

এটা অবশ্য তাঁদের জন্য যাঁরা সন্তানকে দ্বীনদার হিসেবে দেখতে চান।

তবে কারো প্রত্যাশা যদি থাকে সন্তানকে মিস্ ওয়ার্ল্ড হিসেবে গড়ে তোলা তবে তার জন্য শুধুমাত্র সৌন্দর্যকে অগ্রাধিকার দেয়া স্বাভাবিক,
আবার যদি কোন মায়ের চিন্তা থাকে সন্তানকে শ্রেষ্ঠ ধণীদের একজন বানানো তাহলে সে অবশ্যই সম্পদকে প্রাধান্য দিবে।

কিন্তু যাঁদের স্বপ্ন দ্বীনদার ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে তোলা তাঁরা যখন একই সাথে বংশ, সম্পদ, সৌন্দর্য, দ্বীনদারিতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন তখন তাঁদেরকে স্রেফ ভন্ড ছাড়া অন্য কিছু আমার ভাবনায় আসে না।

এই শ্রেণীর মানুষ রাসূল সা. এর যে হাদীসকে তাঁদের পক্ষের যুক্তি হিসেবে পেশ করা হয় তা হলো

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, একজন মহিলাকে বিয়ে করার সময় চারটি বিষয় ল্যক্ষ করা হয়। তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারিত্ব। সুতরাং তোমাদের দ্বীনদার মহিলাকেই বিয়ে করা উচিত (বুখারী-২৯২৫)।

এখানে মোটেও চারটা দিক দেখে মেয়ে বিয়ে করার পরামর্শ দেয়া হয় নি, বরং বলা হয়েছে সাধারনত এমনটা করা হয় কিন্তু তোমরা সেটা না করে দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিবে।

এটা হলো বিয়ের পূর্ববর্তী শরঈ সীমা লঙ্ঘন।
পরবর্তী সীমা লঙ্ঘনের প্রথম ধাপ হলো নামমাত্র মোহরানা ধার্য করা এবং এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করা।
অথচ রাসূল সা. এর সুন্নাত হলো ধার্যকৃত মোহর পরিশোধ করা।
তাঁর অধিকাংশ বিয়ের মোহরানার পরিমান ছিলো পাঁচশত দিরহাম যার বর্তমান মূল্যমান প্রায় দেড় লক্ষ টাকা।
অথচ বর্তমানে লোকদেখানো মোহরানার পরিমান হয় আকাশচুম্বি আর পরিশোধের পরিমান নিতান্তই সামান্য।

অনেক বাবা মার ধারণা মোটা অঙ্কের মোহরানা তাদের মেয়ের জীবনকে অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করবে।
অর্থাৎ জামাই বাবাজী সহজে ডিভোর্স দিতে পারবে না।
এরকম মানসিকতার বাবা মা কে খুব বলতে ইচ্ছে করে,
যে ছেলেটা অর্থদণ্ডের ভয়ে আপনার মেয়েকে নিয়ে সংসার করবে তার কাছে মেয়েকে পাঠানোর চেয়ে নিজের বাড়িতেই মেয়েকে রেখে দেয়া তার জন্য অধিক নিরাপদ নয় কি?

আর দ্বিতীয় ধাপ হলো হলো যৌতুক ভদ্রভাবে উপহার প্রদান অর্থাৎ সামাজিকতা।
আমাদের আসলে ভেবে দেখতে হবে যে এটা সামাজিকতা নাকি সামাজিক নির্যাতন।

আমার কাছে মেয়ের বিয়ের পর দেয়া যৌতুক আর কারো মৃত্যুর পর বিশাল আয়োজন করে মিলাদ(যদিও মীলাদ অর্থ জন্মদিন)
এ বিষয়গুলো কে একই রকম সামাজিক নির্যাতন বলে মনে হয়।
স্বাভাবিক ভাবে একজন মানুষের মৃত্যুর পূর্বে তার চিকিৎসার জন্য পরিবার থেকে অনেক অর্থ দিতে হয় তারপরও নির্দিষ্ট সময় যখন মৃত্যু তাকে পরপারে নিয়ে যায় তখন তার পরিবার নিঃসন্দেহে স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে যায়,
ঠিক এরকম সময়ে যখন সমাজ তার ইমেজ রক্ষার্থে অর্থাৎ সামাজিকতার খাতিরে উক্ত পরিবারকে মীলাদ আয়োজন করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে তখন সে স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে যায় মীলাদের প্রস্তুতির দুঃশ্চিন্তায়।
ঠিক যেমন কলিজার টুকরো কণ্যা সন্তানকে সুপাত্রে (?) সম্প্রদান করার পর ব্যাথাহত পরিবারের নীরব অশ্রু বিসর্জন করার কথা সেই সময়ে সমাজের ইমেজ ঠিক রাখতে যখন তাকে যৌতুকের কথা ভাবতে হয় তখন নির্ঘাত চোখের জলের পাশাপাশি চোখের ঘুমও পালিয়ে যাবে।

ক্লাশ থ্রী তে পড়ার সময় আম্মু মুখে মুখে “কবর” কবিতা শেখাতেন।

সেখানে দুটো লাইন ছিলো,

“এতো আদরের বু’জিরে তাহারা
ভালোবাসিত না মোটে,
হাতে তে যদিও না মারিতো,
শত যে মারিতো ঠোঁটে। “

কবিতা টা শুধু আবৃত্তি করতাম কিন্তু ঠোঁটে মারার বিষয়টা ঠিক মাথায় আসতো না।
আম্মু তখন বুঝিয়ে দিতেন,
ঠোঁটে মারা মানে কোন বস্তু দিয়ে নয় বরং মুখের কথা দিয়েই কষ্ট দেয়া।

এ বিষয়টাকে আরও চমৎকার ভাবে বুঝিয়ে দিলেন একজন শ্রদ্ধেয় স্যার, তাঁর ভাষায়
“একজন ভদ্র ছেলে কখনোই যৌতুক দাবি করে না,
তবে বন্ধুর যৌতুক প্রাপ্তির কথাটা বারবার স্ত্রী কে শুনিয়ে দেয়”

তবে এখন আর বিষয়টা শুধু আত্মরক্ষাতেই (আর্থিক সমস্যা সমাধানে) সীমাবদ্ধ নেই বরং আত্মঅহংকারে প্রবর্তিত হয়েছে।

তবে মজার বিষয় হলো,
একপক্ষ যৌতুক দিয়ে গর্বে বুক ফুলিয়ে চলে আরেক পক্ষ যৌতুক নিয়েও গর্বে মাটিতে পা ফেলতে চায় না,
যেন বিষয়টা এমন,
‘দেখো সবাই জামাই/ছেলে আমার কত্ত বড় আত্মমর্যাদাহীন! যে নীরবে এই যৌতুক নামক অপমানকে সহ্য করে যাচ্ছে’

সত্যিই এটা এটা একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের জন্য অপমানজনক নয়?

সামান্য দু চার লক্ষ টাকার বিনিময়ে যারা পরিবারের সুখ শান্তিকে গলা টিপে হত্যা করে তাদের মানবিকতা নিয়ে আমার সংশয় থেকে যায়।

যে মেয়েটা যৌতুকের শক্তিতে স্বামীর সংসারে পা রাখে সে ভুলে যায় স্বামীর আনুগত্যের কথা,
ভুলে যায় পরিবারের হক্ক আদায়ের কথা।
আর তারপর বৌ-শাশুড়ি-ননদ-জা এর চিরন্তন দ্বন্দ্ব।
একটা পরিবার একটা দোজখের (রূপক) রূপ ধারণ করে!
আর এই পরিবারে বেড়ে ওঠা প্রত্যেকটা শিশু জীবন সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে বড় হয়।
শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর সুসম্পর্কের সুখ তারা অনুভব করতে পারে না।
জীবন যেখানে কমার্শিয়াল হয়ে যায়,
স্নেহ ভালোবাসা সেখান থেকে চিরতরে পালিয়ে যায়।

তারচেয়ে যদি এমন হতো,
রূপ আর অর্থের আগুনে আত্মহুতি না দিয়ে অন্তরে ইসলামের সৌন্দর্য ধারণকারী কেউ আসতো আপনার ঘরে।
সেই ঘরটা আলোকিত করতো ইসলাম নামক প্রদীপ জ্বেলে,
স্বামীর আনুগত্য, দ্বীনি দায়িত্ব আর পরিবার প্রতিবেশি আর স্বজনের হক আদায়ে তৎপর হতো।
স্বর্ণ অলঙ্কার আর পোশাকের ওপর পারিবারিক প্রশান্তিকে প্রাধান্য দিতো,
স্বার্থপর নয় বরং স্বার্থত্যাগী মানসিকতার হতো,
যে অপরের মুখে হাসি ফুটিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করতো!

রূপের আলোকচ্ছ্বটা না থাকলেও কি এমন, মুখপানে চেয়ে নয়নশীতল হবে না???

আর এই বাস্তবতা যদি প্রত্যেকের নিজ জীবনের দুর্ঘটনা থেকেই বুঝতে হয় তাহলে আপনি ব্যর্থ!
চোখ কান খোলা রাখলেই এরকম হাজারো উদাহরণ আপনার চারপাশে দেখতে পাবেন।
তাই সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে সীমাসংরক্ষণকারী হয়ে উঠুন।
দুনিয়া এবং আখিরাতের সুখময় জীবন নিশ্চিত করুন।
সামাজিকতার নামে সামাজিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.