বায়েজীদ বোস্তামী ও তার মা

অনুবাদঃ শারিকা হাসান

একজন দরিদ্র বিধবা মা যখন তার একমাত্র পুত্র সন্তানকে নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে একাকী প্রতিপালন করেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রত্যাশা থাকে, সন্তান একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁর সকল আর্থিক কষ্ট দূর করবে, মা-ছেলে একত্রে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে দিনযাপন করবে। কিন্তু একজন মা কতটা ইমানদার হলে সন্তানকে মায়ের প্রতি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাকে মহান আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করতে পারেন হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর মা ছিলেন তার উজ্জল দৃষ্টান্ত।

কিশোর বায়েজিদ একদিন স্কুলে কুর’আন পড়তে পড়তে একটি লাইনে এসে থেমে গেলেন। সেখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, “তোমরা আল্লাহর প্রতি ও নিজ পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো।” বায়েজিদ দ্বিতীয়বারের মতো আয়াতটি পড়লেন এবং এর মর্মার্থ অনুধাবন করার চেষ্টা করতে গিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে গেলেন। স্কুল ছুটির আগেই তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলেন।

তাঁর মা তাকে চিন্তিত দেখে জানতে চাইলেন, “কি হয়েছে, বাবা?”
বায়েজিদ জবাব দিলেন, “আমি আজকে পবিত্র কুর’আনের একটি আয়াত পড়েছি। সেখানে বলা আছে, আমাদেরকে আল্লাহ এবং আমাদের পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আয়াতটি পড়ে আমি ভাবছি, “আমার তো এত শক্তি নেই, তবে কেমন করে আমি একইসাথে আমার প্রভু এবং তোমার জন্যে কাজ করবো। মা, তুমি আমাকে তোমার সেবায় নিয়োজিত করো নতুবা আল্লাহর রাস্তায় কাজ করার জন্যে দিয়ে দাও।”

তার মা এক মুহূর্তের জন্যে ভাবলেন। তারপর তিনি তার পুত্রের হাত দুটো নিজের হাতের মাঝে নিয়ে বললেন, “বাবা, আমি তোমাকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করছি। তুমি যদি আল্লাহর জন্যে কাজ করো তবে সেটাই আমার জন্যে করা হবে।”

মায়ের সিদ্ধান্ত শুনে বায়েজিদ খুশি হয়ে গেলেন এবং নব উদ্যোমে একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে পড়াশুনা করতে গেলেন। সেদিনের পর থেকে জ্ঞানার্জনের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ সকলের দৃষ্টিগোচর হলো। প্রতিদিন সবার আগে তিনি স্কুলে উপস্থিত হতেন আবার সবাই চলে যাওয়ারও অনেক পর বাসায় ফিরতেন।

তারুণ্যে পদার্পণের পর জ্ঞানের ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন সময়ের মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর বাগদাদে গেলেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর ইসলামের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে ভারতবর্ষে যান। তার জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি তাঁর মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেন।

এদিকে তার মা বৃদ্ধ অবস্থায় ‍উপনীত হন এবং দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তবু তিনি তাঁর ছেলের ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে পিছুটান তৈরি করেননি। হযরত বায়েজিদের শৈশবের শিক্ষক তাকে তার মার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে চিঠি পাঠান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পারস্যের পথে যাত্রা শুরু করেন।

নিজ বাড়িতে পৌঁছে দরজায় কড়া নাড়তে গিয়ে তিনি শুনতে পেলেন, তার মা দু’আ করছেন, “হে দয়াময় আল্লাহ, আমি আমার ছেলেকে তোমার পথে উৎসর্গ করেছি। তুমিই তাকে ভালোবেসে আগলে রেখো, তুমিই তার দেখাশুনা করো।”

জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি নিজের সেবা-যত্নের জন্য ছেলের প্রত্যাবর্তনের দুআ না করে বরং তাকে আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর হেফাজতে থাকার দুআ করেছিলেন!! যদিও হযরত বায়েজীদ বোস্তামী বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত তার সাথে থেকেছিলেন এবং তার সেবা-যত্ন করেছিলেন।

এভাবে একজন ঈমানদার মুসলিম নারী নিজে হয়তো দূর-দূরান্তে গিয়ে ইসলাম প্রচার করতে পারেন না কিন্তু নিজের হক বিসর্জন দিয়ে নিজের সন্তানকে ইসলাম প্রচারক হিসেবে মুসলিম উম্মাহর হেদায়েতের জন্য উৎসর্গ করতে পারেন, বায়েজীদ বোস্তামীর মা তারই অনুপম উদাহরণ রেখে গেছেন।

তথ্যসূত্র: http://muslimgirl.com/2056/bayazidbustami/

 

আরও পড়ুন