বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের কাছে আসলে কি চায়?

শারমিন আকতার

“যদি বাবা তার পুত্রের প্রথম কদম ফেলার সময় সহায়তা করতে পারে, তাহলে সেই একই পুত্রই কেন বাবার শেষ কদম ফেলার জন্য সাহায্য করতে পারে না ।”

‘ভাগবান’ নামক হিন্দি ছবিতে অমিতাভ বচ্চন এ রকম একটা ডায়ালগ দিয়ে বাবা-মার কষ্টের বিবরণ দেন । এই ভাগবান ছবিতে পরিচালক রবি চোপরা এমন একটি কাহিনী চিত্রায়িত করেছেন যা প্রত্যেকটি সন্তানের দেখা উচিৎ। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কোন সন্তান নিতে চায় না, তাদেরকে  সাধারণত বোঝা মনে করে । তাদের জীবনাচরণকে সেকেলে বলে আখ্যায়িত করে । এই বিষয়টায় এখানে পরিচালক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং এই চলচিত্রের মাধ্যমে তিনি পারিবারিক ও সামজিক সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন ।

এখানে অমিতাব বচ্চন আর একটা কথা বলেছেন- ‘সন্তানদের জীবনে বাবা-মাকে গাছের শেকড়ের মত ভাবা উচিৎ, উপরে উঠার সিঁড়ির মত নয় ।’ তিনি তার দুঃখ- কষ্টে জরাজীর্ণ হয়ে আর একটা উক্তি করেছিলেন-“যে সন্তানেরা বাবা-মাকে ভালবাসে না, তাদেরকে সহায়তা করে না । তাদেরকে শ্রদ্ধা করে না । আমি তাদেরকে কখনও ক্ষমা করব না ।’

বাবা- মা অভিমান কষ্ট থেকে অনেক সময় কিছু বলে থাকলেও তারা সেটা কখনও ধরে রাখেন না ।

Henry Ward Beecher বলেছেন- “We never know the love of a parents till we become a parent ourselves.” অর্থাৎ আমরা নিজে বাবা-মা না হওয়া পর্যন্ত বাবা-মার ভালোবাসা কখনও অনুধাবন করতে পারি না ।

কিন্তু আমরা এই সভ্য সমাজের মানুষরা আদৌ কি বাবা-মার ভালোবাসা সত্যিকার অর্থে অনুধাবন করতে পারি । যদি পারি তাহলে কেন আমাদের বাবা-মারা আমাদের কাছে বৃদ্ধ বয়সে বোঝা হয়ে যায়? কেন নচিকেতার বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয় অনেক বাবা মাকে? কেন নীরবে, নিভৃতে বাবা-মা চোখের জল ফেলে যান?

বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা আমাদের সবার মধ্যেই আছে । তাদের ভালোবেসে অধিকাংশ মানুষই সুখ খুঁজে পায় । মনের গহীনে আনন্দ অনুভব করে । শৈশব ও কৈশোরে মমতাময়ী মায়ের আঁচলই যেন আমাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।বাবা-মা আমাদেরকে তাদের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে তিল তিল করে বড় করে তুলেছেন। শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অন্যদিকে মা প্রায় দশ মাস কষ্ট সহ্য করে আমাদের গর্ভে ধারণ করে চিরঋণী করেছেন, সেই ঋণ শোধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।  সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের যে ভালোবাসা, তা পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ইংরেজিতে একটা কথা প্রচলিত আছে “Nobody on earth ever love you more than your parents.” ।সন্তানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের ভাল কিছু করার জন্য বাবা-মারা আমরণ সাধনা করে যায় । তাদের ধ্যান- ধারণাই হচ্ছে কিভাবে সন্তানের মঙ্গল কামনা করা যায়?

সন্তানের জন্য বাবই-মা নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। কিন্তু সেই সন্তানই যখন বড় হয়ে নিজে বাবা হয়, সন্তান প্রতিপালন করে তখন বাবা-মাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে  নিজের সন্তান- স্বামী সংসার, স্ত্রী,  সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে । সব সময় ভালবাসা, আদর স্নেহ কেমন যেন নিম্ন দিকে প্রবাহিত হয় অর্থাৎ পূর্ববর্তী জেনারেসনের দিকে না গিয়ে পরবর্তী বংশধরের দিকে ধাবিত হয় । যেমন একজন সন্তান তার মা-বাবাকে অনেক বেশি ভালোবাসে, কিন্তু তার চেয়ে সে অনেক বেশি ভালবাসে তার নিজের সন্তানকে ।কিন্তু তিক্ত সত্য হলো, কাল পরিক্রমায় আমরা হয়ে উঠি অতি নির্মম। প্রকাশ পায় বাবা-মায়ের প্রতি চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা।

আমরা যারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসাবে দাবী করি, আমাদের অবশ্যই জানার কথা যে- বাবা-মাকে কষ্ট দেয়া, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা, তাদের কথা অমান্য করা নিঃসন্দেহে অনেক বড় গুনাহ। বাবা-মা যখন বার্ধক্যে উপনীত হয় তখন তাদের প্রতি দায়িত্ব আরও বেড়ে যায় ।

“তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন, তোমরা তাঁর ইবাদাত ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত কর না, পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর৷ যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে “উহ্‌” পর্যন্তও বল না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিও না বরং তাদের সাথে সম্মান ও মর্যাদার সাথে কথা বল।”

সূরা বনী ইসরাইল-২৩

হাদিস শরীফে এসেছে, “একবার জনৈক সাহাবী নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে জিহাদে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার বাবা-মা কেউ কি জীবিত আছে? সাহাবি হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বাড়িতে গিয়ে তাদের সেবা কর ।” বুখারি শরীফ, হাদিস নং-২৮৪২

পিতা মাতাকে হিন্দু ধর্মেও অনেক সম্মান দেওয়া হয় । এই ধর্মে বলা হয়
“পিতা স্বর্গ ,পিতা ধর্ম পিতাহিপরমন্তপ
পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ ” –

এখানে পিতাকে স্বর্গ এবং ধর্ম স্বরূপ বলা হয়ে থাকে ।

আবার হিন্দু ধর্মে দেবতাকে মা বলে সম্মান করা হয় ।

অতিথি তুম কব জাওগি  ছবির শেষের দিকে একটি ডায়ালগ আছে যার সারমর্ম হচ্ছে- “সন্তানরা বড় হয়ে চায় কবে সংসার থেকে বাবা মা চলে যাবে? আর বাবা মা চায় সন্তান আরও কতক্ষণ আমার কাছে থাকবে। এটাই জগতের নিয়ম হয়তো আমার ছেলেও বড় হলে আমার সাথে এমন আচরণ করবে ।”

আমার বড় ভাই একদিন তার ছেলেকে হোটেলে খাইতে নিয়ে যায় । তারপর খাওয়ানো শেষে তাকে প্রশ্ন করে- ‘বাবা তুমি বড় হলে কি আমাকে এরকম খাওয়াবে ?’ জবাবে সে বলে ‘আমি আমার ছেলে মেয়েকে খাওয়াবো ।’

অর্থাৎ এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে সন্তানরা হয়তো এমন দেখে দেখে বড় হয় যে তাদের বাবা মারা- তাদেরকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত । তাদের দাদা-দাদীর প্রতি কোন খেয়াল হয়তো রাখে না । তাই তাদের মনের মধ্যেও শুধু সন্তানের দিকে খেয়াল রাখার প্রবণতা তৈরি হয় ।

আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মা আসলে আমাদের কাছে তেমন কিছুই চান না ।আমাদের কাছে কোন গাড়ি চান না , কোন বাড়ী চান না । কোন ঈদে তারা প্রত্যাশা করেন না যে তাদেরে সন্তানরা তাদেরকে সবচেয়ে দামী কোন শাড়ি বা পাঞ্জাবী উপহার দিক । তাদের কাশ্মীর, সিলেট বা কক্সবাজার বেড়াতে নিয়ে যাক । যেখানে সন্তানের অনেক আর্থিক খরচের বিষয় থাকে । আমাদের বাবা-মারা চান না আমরা তাদের পিছনে শুধু অর্থ ব্যয় করি । তাদের মানুষ হিসাবে যে মৌলিক চাহিদা যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার পাশাপাশি তারা চান আমরা তাদের ভালোবাসি, তাদের শ্রদ্ধা করি । তাদের অসুস্থতায় পাশে থেকে সহানুভূতি প্রদর্শন করি । সর্বোপরি বাবা-মায়ের হাতটা ধরে বলি বাবা-মা আমরা তোমাদের পাশে আছি এবং থাকবো ।

সন্তান লালনের সময় আমরা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি আরও কতো কিছুই না ব্যবস্থা করি সন্তানের জন্য  । আমরা কি এখানে তাদের পিছনে খরচ করাটাকে বিনিয়োগ ভাবি আর বাবা-মার পিছনে খরচ করাটা অপচয়?

আমাদের মনে রাখতে হবে, কালের বিবর্তনে আমরাও এক সময় বার্ধক্যে উপনীত হব। আমাদের সঙ্গে বৃদ্ধাবস্থায় তেমন আচরণ করা হবে, যেমন আমরা আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে করব। অন্তত এই দিকটি বিবেচনায় রেখে আমদের উচিত বাবা-মায়েরর সঙ্গে সদাচরণ করা।

লেখকঃ সম্পাদক, মহীয়সী (www.mohioshi.com )

মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের প্ল্যাটফর্ম । পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি যার লক্ষ্য

 

আরও পড়ুন