জীবনের গল্পে কিছু অসামাজিকতা

খাদিজা ইয়াসমিন

১. ভাবির স্টুডেন্ট কে পড়াচ্ছিলাম। পড়ানোর এক ফাঁকে জানতে চাইলাম ওর বাড়ি কোথায়, বাড়ীতে কে কে আছে? সব শুনে চিনতে পারলাম। তাই আরো জানতে চাইলাম তোমার দাদা দাদী তোমাদের সাথে থাকে নাকি আলাদা?

ও খুব নির্দ্বিধায় বললো দাদা আমাদের সাথে থাকে আর দাদী কাকার সাথে থাকে। আমার বোন জিজ্ঞেস করলো তোমার দাদা দাদীর খারাপ লাগেনা! দু জায়গায় থাকে? ও বললো খারাপ লাগবে কেন? সবাই এক বাড়ীর মধ্যেই থাকি। দাদা দাদীও একসাথেই থাকে শুধু খায় দুই ঘরে।

একটু খেয়াল করলে- কি বোঝা যায়? পরবর্তী প্রজন্ম বড়দের কাছে বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে কি শিখছে! আমাদের অসচেতনতার জন্য বাচ্চা-কাচ্চাকে আমাদের সাথে বিরুপ ঘটতে পারে এমন শিক্ষাই দিচ্ছি নাতো!
যে বাবা- মা আমাদের এত আদর যত্নে বড় করেন, না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান,নিজের সুখ বেঁচে সন্তানের সুখ কেনেন।
একটা পর্যায়ে গিয়ে সেই বাবা-মা এত বেশি হয়ে যায় যে তাদের দু বেলা খাওয়াতেও এত হিসাব! বাবা এক ভাইয়ের ঘরে, মা আরেক ভাইয়ের ঘরে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা মাকে একসাথে রেখে তাদের কি ভালো লাগে না লাগে সেগুলো খেয়াল করা বাদ দিয়ে, তাদের বাধ্য করছি আলাদা খেতে, আলাদা পড়তে। আচ্ছা একবার বলুন তো! আপনি কি আপনার স্ত্রী ছাড়া থাকতে, খেতে চান একা একা? অথবা আপনি কি আপনার স্বামীকে ছাড়া খেতে সুখ বোধ করেন? তাহলে কেন আমরা বাবা মাকে এভাবে কয়েদি করে রাখছি? শেষ বয়সে তাদের ইচ্ছেমত, আনন্দ-আহ্লাদে কেন রাখতে পারিনা? বাবা-মাকে কি ঘরের রাজা রানী করে রাখা যায়না? এইযে আপনার সন্তানের সামনে বাবা-মাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে রাখছেন, এই সন্তান বড় হয়ে আপনার সাথে এমন করবেনা এর গ্যারান্টি দিতে পারেন?

২. বিভিন্ন বিষয়ে বোনের সাথে কথা বলছিলাম। কথা বলতে বলতে এক আন্টির কথা জানতে পারলাম। শুনে বুকের মধ্যে হার্টবিট এত বেড়ে গিয়েছিলো! ইস, এই মা কিভাবে থাকে। আন্টিটার হাজবেন্ড অনেক আগেই মারা গেছেন। একটি মাত্র ছেলে। একদম মা ন্যাওটা ছেলে যাকে বলে। মায়ের অবাধ্য কখনোই হতো না। মায়ের এটাই শান্তনা ছিলো, স্বামী তো সেই কবেই একা ফেলে গেছে। ছেলেই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ছেলে এম বি বি এস ডক্টর। মা ছেলেকে বিয়ে দিবে বলে পাত্রী দেখতে থাকে। মা দ্বীনদার বউ খুজঁছিলো, কিন্তু ছেলে একটা সুন্দরী মেয়েকে পছন্দ করায়, ধার্মিক না হলেও ওই মেয়ের সাথেই বিয়ে দিতে রাজি হয়। যদিও ছেলেকে বলে আরেকটু দেখো, না! ছেলে ওই মেয়েকেই বিয়ে করবে এবং মাকে বলে গড়ে নেবে বউকে। একটাই ছেলে মা অমত না করে বিয়ে দেয়। বিয়ের পর থেকেই মায়ের বাধ্য ছেলে অবাধ্য হয়ে যায়, বউর কথায় উঠ বস করে। মাসের সব টাকা বউর হাতে দিতে হয়। একই এলাকায় একা মাকে রেখে আলাদা বাসায় ওঠে বউকে নিয়ে। বউ সারাক্ষণ সাজগোজ, পার্লার এসব নিয়েই থাকে। নাতি নাতনীদেরও দাদীর কাছে আসতে দেয় না। আন্টি একটি কাজের মেয়েকে নিয়ে বাড়ীতে থাকে।

৩. আমাদের পাশের বাড়ীর বড়মা মারা গেলেন এই কিছুদিন আগে। বৃদ্ধাবস্থায় যতটা সেবা যত্ন দরকার ছিলো ততটা পায়নি। তার মারা যাবার তিন চার দিন পরেই শুনলাম বড়মার সেঝো ছেলের বউ ঢাকা থেকে একটা হিজাব আর শাড়ি দিয়েছিলো মেঝো জালের কাছে। কিন্তু মেঝো ছেলের বউ সেটা দেয়নি এমনকি বলেওনি পর্যন্ত।
মৃত বড়মাকে দেখতে এসে কথাপ্রেক্ষিতে সেঝো বউ জানালো আম্মাকে হিজাব,শাড়ি দিয়েছিলাম। একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেলো ওগুলোর কিছুই দেইনি, নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে।সবাই মেঝো বউর কৃতকর্ম নিয়ে ছিঃ ছিঃ করছিলো।

আমাদের চারপাশে একটু চোখ রাখলেই এরকম অহরহ ঘটনা দেখা যাবে। বয়সকালে বাবা-মায়ের কি করুন অযত্ন অবহেলা! কারো কারো বাড়ীর কুকুর এর চেয়ে অনেক আদরে থাকে। আমরা গতানুগতিক শিক্ষিত হচ্ছি ঠিকই কিন্তু শিক্ষার নির্যাস ভেতরে তিল পরিমাণও ধারণ করি না। কুরআন হাদীসের শিক্ষা তো আরো নেই না। সেকেলে বলে উড়িয়ে দেই।সবচেয়ে বড় কথা অনেকে এসব জানলেও মানার বেলায় আমরা অনেকেই একদম শূন্যের খাতায়।

মহান আল্লাহ বাবা-মায়ের এত বেশি সম্মান, মর্যাদা দিয়েছেন যে তাদের সাথে ‘উহ’ শব্দ পর্যন্ত বলা যাবে না,বিরক্ত হওয়া যাবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছেন। এমনকি বাবা-মা কাফের-মুশরিক হলেও তাদের সাথে সদাচারী হতে বলা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় বাবা মায়ের সম্মান বা জায়গা আমাদের জীবনে কতটুকু? এগুলো হয়তো গভীরভাবে ভাবার এতটুকু অবকাশও আমাদের হয় না।

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
“তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব-ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা।”
(বনী ইসরাইলঃ২৩)

আমরা ভুলে যাই যে পিতামাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহও সন্তুষ্ট হন। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন! পিতামাতার সেবা করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়, অথচ কি নির্দ্বিধায় এই মহান দায়িত্ব অবহেলা করে যাই,ভুলে থাকি। শুধুমাত্র মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলেও পিতামাতাকে এতটা অবহেলা করা যায়না, কারন তারা আমাদের ছোট থেকে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে বড় করেন সে হিসেবেও তাদের সেবা করা উচিত, পাশে থাকা উচিত।

“হাদিসে আরো বর্ণিত আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত রয়েছে। অনুরূপ মা-বাবাকে অসন্তুষ্ট করলে আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন।” (ইবনে হেব্বান)।

“ঐ লোক হতভাগ্য! ঐ লোক হতভাগ্য! ঐ লোক হতভাগ্য! জিজ্ঞেস করা হ’ল, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কার শানে একথা বললেন? নবী করীম (সঃ) বললেন, যে লোক পিতা-মাতার একজন কিম্বা দু’জনকে তাদের বৃদ্ধ বয়সে পেল অথচ জান্নাতে দাখিল হল না, সে হতভাগ্য।”[মুসলিম ]

যারা বাবা মায়ের প্রতি উদাসীন, তাদের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করেনা,কষ্ট দেয়, বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে তাদের মত দুর্ভাগা আর কে? পিতামাতার সাথে যারা সম্পর্কই রাখেন না, আপনারা যে কবীরা গুনাহ করছেন! এ ব্যাপারে কি অবগত আছেন? সত্যি বলতে বাবা মায়ের যথাযথ সেবা , দায়িত্ব পালন হতে পারে আমাদের জান্নাত আর এগুলো না করলেই অপেক্ষা করবে জাহান্নাম।

“হাদিসে বলা হয়েছে আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং মা-বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা সবচেয়ে বড় কবিরা গোনাহ। “(বুখারি)।

“হজরত জাহেমা রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-এর কাছে জিহাদে শরিক হওয়া সম্পর্কে পরামর্শ করার জন্য উপস্থিত হলাম। তখন রাসূল সা: জিজ্ঞেস করলেন তোমার মা কি জীবিত আছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন রাসূল সা: বললেন, তুমি ফিরে যাও এবং তোমার মায়ের সম্মান ও খেদমত করতে থাক। কেননা তার পায়ের নিচেই তোমার জান্নাত।” (নাসাঈ)।

পিতামাতা ভাগাভাগির সাব্জেক্ট হতে পারে না। আপনি যদি নিজের খাওয়া পড়ার জন্য কাজ করতে পারেন তাহলে বাবা মায়ের জন্য কেন পারবেন না? এই বাবা মা’ই তো না খেয়ে আপনাকে খাইয়েছে। তো এখন কেন ভাগাভাগি? প্রত্যেক সন্তানই বাবা মা দুজনকেই খাওয়াবে,সেবা শশ্রুষা করবে। এটা তাদের অধিকার। বান্দার হক পালন না করার বিধান আরো মারাত্মক। আল্লাহকে ভয় করে, পিতামাতাকে ভালোবেসে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি এবং বুদ্ধিমানের পরিচয় দেই।

“এক ব্যক্তি রাসূলে আকরাম সা:-এর খেদমতে হাজির হয়ে প্রশ্ন করল, সন্তানের ওপর মা-বাবার কী কী অধিকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, তোমার মা-বাবা তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। ” (ইবনে মাজাহ)

তাই অনুরোধ জানাই অনুনয় করে- আমরা প্রথমে মানুষ হই, বিবেককে জাগাই! কত কত মানবতা দেখাই, সবার আগে নিজের পিতামাতা, পরিবারের প্রতি মানবিক হই তারপর বাকিসব। লোকদেখানো কিছুই মনে শান্তি দিতে পারেনা। স্রেফ মন থেকে করুন কেউ প্রশংসা না করলেও আপনি সুখ পাবেন, তৃপ্ত থাকতে পারবেন।
পিতামাতাকে সঠিকভাবে দেখ-ভাল করলে আল্লাহও আমাদের প্রতি তৃপ্ত থাকবেন। আমরা আমাদের পিতামাকে আদর যত্নে রাখবো, আমাদের সন্তানেরা সেটা শিখে আমাদের সেরুপটাই করবে ইনশাআল্লাহ। কারো পিতামাতাকেই যেন বৃদ্ধাশ্রমে না যেতে হয় এবং ভবিষ্যতে যেন আমাদেরও না যেতে হয় তা নিশ্চিত করার কাজ এখনই শুরু করতে হবে।
আমাদের প্রত্যেককেই পিতামাতার চক্ষু ও অন্তরশীতলকারী সন্তান হওয়া উচিত এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন আমাদের চক্ষু ও অন্তরশীতলকারী হয়।

“রব্বির হাম হুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগীরা”

” হে আল্লাহ! আমাকে আমার পিতামাতাকে এবং সমস্ত মুমিনগনকে চুড়ান্ত হিসেবের দিনে ক্ষমা করুন।” (সূরা ইবরাহীমঃ ৪১)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন