একজন মা ফৌজিয়া মতিন

 মাহফুজুর রহমান আখন্দ

– ওয়াআলাইকুম আসসালাম।

– মাহফুজ বলছিলাম মাওয়াই মা।

– হ্যাঁ বাবা কেমন আছো? নাম বলা লাগবে না।

– মাওয়াই মা, এটা তো আমার নতুন নাম্বার, কেমনে চিনলেন আমাকে?

– তোমার সালাম শুনেই বুঝি বাবা। আর কিছু বলা লাগে না

। এমন মায়াবী ভালোবাসা মাখা কথা আর শুনতে পারবো না কখনো। ফোন পেলেই খুশিতে নেচে উঠতো তার অন্তর। শরীরের খবর জানতে চাইলেই বলতেন, বয়স হচ্ছে বাবা, আর কত ভালো থাকবো। ব্যাথা-বেদনা থাকবেই। তবু আলহামদুলিল্লাহ। বলছিলাম আমার মাওয়াই মার কথা। ফৌজিয়া মতিন।

শেরপুর জেলা শহরে সজবর খিলা মহল্লায় তাঁর নামে একটি নামকরা স্কুল চলছে। বাংলাদেশ সরকারের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন সফলতার সাথে। মা হিসেবে ছিলেন রত্নগর্ভা। ছয় সন্তানের সকলেই উচ্চশিক্ষিত। একজন সড়ক দুর্ঘটনায় মহান আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। বর্তমান পাঁচ সন্তানের একজন আমার ছোটভগ্নিপতি। ড. গোলাম কিবরিয়া ফেরদৌস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর তিনি। সেই সূত্রেই মূলত মাওয়াই মাকে এতো কাছে থেকে অনুভব করার সুযোগ। বাইরে থেকে ভীষণ রাগী মনে হতো। কথার মধ্যে একটা কমান্ডিং ভয়েস থাকতো তাঁর। দেশের বিভিন্ন জেলায় অফিস পরিচালনার সূত্রে ভয়েসটা এমন হয়েছিলো বলে অনুমান করি। তাঁর ভেতরটা ছোট মানুষের মতো সফেদ, কোমল। মায়াবী কোমলতায় ঢাকা তাঁর অন্তর।

একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে পিকনিকে গিয়েছিলাম গজনীতে। রান্না-বান্না এবং খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁর পুত্র সাদী ভাই। সাদী ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে লেখা-পড়া শেষ করেছেন। অত্যন্ত নিবেদিত মানুষ তিনি। ছাত্র-ছাত্রীদের রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থা করা হলো তাঁদের বাড়িতে। বাড়ি সংলগ্ন স্কুলের অনেকগুলো ওয়াশরুম। সত্তরজন ছাত্র-ছাত্রী হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে গাড়িতে উঠার আগেই মাওয়াই মা সবাইকে ডাকলেন। বাসায় নিয়ে যেতে বললেন। দেখলাম শেরপুরের বিখ্যাত মিষ্টি নিয়ে অপেক্ষমান তিনি। এক এক করে সবাইকে নিজ হাতে মুখে তুলে মিষ্টি খাইয়ে দিলেন। ছেলে-মেয়েদের হৃদয়ে দরদমাখা ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলেন। মুগ্ধ হলাম তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহারে। আজ তিনি নেই। গতকাল ২২ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় মহান আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন সব কিছু রেখে। হে আল্লাহ, তুমি তাঁকে ক্ষমা করো, তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত করো। আমিন।

লেখকঃ সাহিত্যিক, গবেষক এবং অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন