আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বাস্তবতা

রফিকুল ইসলাম

শতবর্ষী এক বয়োবৃদ্ধ সেলুনে প্রবেশের সাথে সাথেই নাপিত জিজ্ঞেস করলেন চাচা রাহুল কাট দিব নাকি লেয়ার কাটিং? চাচা কোন জবাব না দিয়েই নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে পড়লেন।মেশিনে জিরো স্টাইলে চুলের কাটিং শুরু হলে, নাপিত স্বগোক্তিতে বলা শুরু করলেন, “এই মার্কেট পুরোটাই চাচার, ৫ জন ছেলে, অনেক সম্পদের মালিক, কিন্তু কোন যত্ন নেই, আজ থেকে দশ বছর আগে যে পাঞ্জাবি ব্যবহার করত আজো সেটাই আছে। আর যত্ন পাবেই কেন!! কাউকে তো আর আলেম উলামা বানায়নি , সবকয়টাকে বানিয়েছে টাকার কুমির। সবাই টাকার পেছনে ঘোরে আর বাবার মৃত্যুর দিন গোনে। কবে বুড়াটা মরবে আর সব কিছু ভাগ করে নেব।” এক নিশ্বাসে কথা গুলো শেষ করলেন। অনেকটা থ বনে গিয়েছিলাম “কাউকে তো আর আলেম উলামা বানায়নি” কথাটি শুনে। সত্যিকার অর্থে এ রকম ঘটনা হর হামেশায় ঘটছে আমাদের চার পাশে। সোশ্যাল মিডিয়া ও পত্রিকার কল্যাণে যা চোখে পড়ে প্রতিনিয়ত।

আত্মীয় বলতে আমরা সাধারনত বুঝি যারা আমাদের সুখে সুখি আর দু:খে দু:খি হয়। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে সদ্যভূমিষ্ট মানব শিশু পিতা ও মাতার দিক থেকে বেশ কিছু আত্মীয় পেয়ে যায়। নতুন অতিথিকে নিয়ে স্বপ্নের মালা গাথা শুরু হয়৷ সাধ্যমত উপহার নিয়ে আগমন শুরু হয় আত্মার আত্মীয়দের। দিন যেতে থাকে, ক্রমেই স্বপ্ন বড় হতে থাকে, মা বাবা ডাক থেকে শুরু করে চাচা-চাচী, মামা- মামি, দাদা- দাদি, নানা-নানি, খালা, ফুফু সহ সকল আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে। আত্মীয়দের সাথে দেখা সাক্ষাত, খোঁজ -খবর নেয়া, বিপদ আপদে সহায়তা , সুখের, আনন্দের খবর গুলো শেয়ার করার মাধ্যমে সম্পর্ক গাঢ় থেকে প্রগাঢ় হয়। লেখাপড়া শুরু হবার সাথে সাথেই সহপাঠীদের সাথে তৈরী হয় বন্ধুত্ব। মোটকথা, সকল সম্পর্কই শুরু হয় পরিচয়ের মাধ্যমে, দেখা সাক্ষাত, পরামর্শ আদান-প্রদান সহ বিভিন্ন মাধ্যমে গভীরতা লাভ করে।

কিন্তু সম্পর্ক প্রগাঢ় হতে যেমন দীর্ঘ সময় লাগে, ভেঙে যেতে তেমন লাগে না মোটেও। আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠার জন্য অনেক কারণ থাকলেও ঠুনকো কারণেই এ সম্পর্ক বিনষ্ট হতে পারে। আজ আমাদের সমাজে রক্ত সম্পর্কের মাঝে টানাপোড়েন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য কোন বিষয়কে কেন্দ্র করেই আত্মার আত্মীয়- প্রতিবেশী হয়ে উঠছে পরম শত্রু।যে ভাই তার ভাই বা বোন খেলার সাথী ছিল, যাকে ছাড়া হয়তো কোন কিছু খায়নি অথবা একে অপরকে সমাজ বা দেশের অনেক উঁচু স্তরে উঠানোর জন্য নিত্য স্বপ্ন দেখতো, জীবনের সব কিছু বিলিয়ে দিতে চাইতো অকাতরে, অনেক সময় সেই ভাই বা বোনের সাথে সাক্ষাতকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ মনে করে। যে বাবা শুধুই সন্তানকে দুমুঠো খাবার দেবার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করেনি, যে মা তার সন্তানের জন্য জীবনের কোন কিছু বিলিয়ে দেয়া বাদ দেয়নি, সেই সন্তান বাবা মায়ের দুনিয়ায় জীবনে লাঞ্চনা, দু:খ কষ্ট কামনা করে, অথবা অসুস্থতার যন্ত্রনায় কষ্ট পেতে দেখেও বলে, “তোদের কপালে আরো দু:খ আছে” শুধু এ কারনে যে তার আরেক ভাইকে একটু বেশি সম্পদ দিয়েছে অথবা একটু বেশি ভালবেসেছে।আর চাচা , মামা, খালা ফুফু সহ অনান্য আত্মীয়দের সাথে টানাপোড়েন সহজেই অনুমেয়। অথচ পরপারে যাত্রাপথে এগিয়ে দেবার জন্য এই আত্মীয়, প্রতিবেশীরাই সাধারণত একমাত্র অবলম্বন হয়ে থাকে। অথচ মহান আল্লাহ আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের ব্যাপারে বলেন “যারা আল্লাহর (ইবাদত করার) দেয়া প্রতিশ্রুতির পর তা লঙ্ঘন করে, আর (আত্মীয়তার) সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের উপর আল্লাহর লা’নত বা অভিশাপ। আর আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।” (সূরা আর রাদ : ২৫)

বর্তমান সময়ে আমরা রক্ত সম্পর্কীয়দের বাদ দিয়ে বন্ধু বান্ধব, কলিগ, বস দের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি। শহুরে মানুষদের মধ্যে এ প্রবণতা একটু বেশিই দেখা যাচ্ছে। বাসায় আগত মেহমানদের বেশিরভাগই কলিগ, অফিসের বস ইত্যাদি। নিকটাত্মীয়দের আগমন কালেভদ্রে দেখা যায়। আজ আমরা এতটাই দূরে যাওয়া শুরু করেছি যে, যেখানে কারো স্বজনরা সমাজের উচ্চ পদস্থ স্তরে থাকার ফলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে সেখানে কোন প্রয়োজন বা বিপদে তাদের জনানোর আগ্রহও হারিয়ে ফেল অনেক সময়। কেউ জিজ্ঞেস করলে হয়ত বলে ওরাতো শহরে থাকে, অনেক ব্যস্ত; আমাকে সহায্য করার এত অবসর তাদের কোথায়?” হয়ত কথা গুলো বলে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঢেকে রাখতে চায়। বর্তমানে যোগাযোগ যেন অনেকটা প্রয়োজন সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রিয় রাসুল (সঃ) বলেছেন: “সম্পর্কের বিনিময়ে সম্পর্ক স্থাপনকারী আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী নয়। বরং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী হল সে যে সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।” [বুখারী হাদীস নং : ৫৫৩২]

আমাদের সন্তানরা যখন দেখে নির্দিষ্ট কোন আত্মীয়ের সাথে পিতা মাতার সম্পর্ক ভাল নয় অথবা যদি দেখে পিতা বলছে ” অমুকের কথা আমার কাছে কখনো বলবে না”। তখন তার কাছে যে চিত্র প্রকাশিত হয়, ভবিষ্যৎ জীবনে একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে সে যেমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ফলশ্রুতিতে আমাদের সন্তানদের কাছে ” মামার বাড়ি আম কুড়াতে সুখ ” টাইপের কবিতা গুলো একসময় রুপকথার গল্প বলে মনে হতে পারে।

একটা দেশ বা সমাজ কতটা সুখী ও সুস্থ তা অনেকটা নির্ভর করে সেই সমাজের মানুষের মাঝের সম্পর্কের উপর। সেই সমাজ কিভাবে সম্পর্ককে মুল্যায়ন করছে, কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্পর্ক যত মজবুত হবে, মানুষগুলো তত বেশি কাছাকাছি, পাশাপাশি থাকবে সমাজও হবে সুখী সমৃদ্ধ।

যদিও আজ পশ্চিমা সংস্কৃতি অথবা অন্য অনেক কিছুর প্রভাবে নিকটাত্মীয়দের সাথে আমাদের সম্পর্ক ফিকে হয়ে যাচ্ছে তার পরেও বিজ্ঞানের কল্যানে আজ আমরা অনেক কাছাকাছি বসবাস করি। মজা করে অনেক সময় বলে থাকি আমাকে কোথাও খুঁজে না পেলে ফেসবুক, ইমু বা হোয়াটসঅ্যাপ এ খুঁজে পাবি।
তাই আসুন না, আমাদের সোস্যাল মিডিয়ায় হাজারো মেসেজের মাঝে অন্তত কিছু মেসেজ আদান প্রদান হোক রক্ত সম্পর্কীয় পরমাত্মীয় সাথে।পৃথিবীতে আসার পর যাঁরা সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন, স্বাগত জানিয়েছিলেন তাঁদের একটু খানি জায়গা হোক ফোন বা কল লিস্টের হাজারো নম্বরের মাঝে। উন্নত হোক সম্পর্ক গুলো, দূর হোক ভুল বুঝাবুঝি, সুখী হোক সমাজ, সমৃদ্ধশীল হোক প্রিয় দেশ।

রফিকুল ইসলাম
শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন