বাবা

আসাদুজ্জামান জুয়েল

আমি তখন রাজশাহীতে একটা মেসে থাকি। বাড়ী এসেছি মাসের শেষদিকে। আব্বা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তখন মাসের শেষটা চাকুরীজীবীদের জন্য কতটা খারাপ বুঝতাম না। বললাম এ মাসে একটু বেশি টাকা লাগবে।

বাসা থেকে বের হচ্ছি, আব্বা নেই। আম্মা আঁচল থেকে কিছু টাকা বের করে দিয়ে বললেন, বাজারে তোমার আব্বা টাকা নিয়ে বসে আছেন, সেখানে দেখা করে যাও। আমি গেলাম। আব্বা এটা সেটা খাওয়ালেন। অনেকক্ষণ গল্প করে সময় নষ্ট করলেন। আর এদিক ওদিক তাকালেন।

আমি রাজশাহী যাবো, দেরী হয়ে যাচ্ছে, একটু বিরক্ত হলাম। আব্বা বললেন, ” একটু ঘুরে দেখে এসো তো, রফিক মাস্টার এসেছে কি না।” আমি খুঁজে এসে বললাম, আসেনি। আরো অপেক্ষা করলাম। অবশেষে বিরক্তিটা রাগে পরিণত হলো। আব্বা বললেন, ” বিকেলে রাজশাহী গেলে কি অসুবিধা হবে?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তাহলে তাই করো। আমি ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে আসছি। দুপুরে খেয়ে তারপরে যাও।”

আমি বাড়ি ফিরে যাওয়ার ভান করে, রাগে-অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে রাজশাহী চলে গেলাম। বিকেলবেলা আম্মা মেসে হাজির হলেন। সাথে ইলিশের অসাধারণ সুগন্ধি। আমার অভিমান কিন্তু ভাঙলো না। আম্মা বুঝালেন। প্রত্যাশার চেয়েও বেশি টাকা দিলেন (যেটা আব্বা সবসময়ই দিতেন)। বললেন, ” রফিকের কাছে তোমার বাবা ধার চেয়ে রেখেছিল। সে আসতে দেরী করায় তোমাকে তখন টাকাটা দিতে পারেনি। তোমার বাবা সারাটা দিন মন খারাপ করে আছে। ইলিশ কিনে নিয়ে গেলো, তুমি রাগ করে চলে গেছো শুনে দুপুর বেলা আর কিছু খায়নি। তুমি খাওয়ার পরে আমি বাড়ী গেলে তোমার আব্বা খাবে।” আমি আম্মাকে বললাম, “একটু অপেক্ষা করো।” ব্যাগ গুছিয়ে বললাম, “চলো।”
-কোথায়?
-বাসায়।
আম্মা হাসলেন। বললেন, চলো।
বাসায় গিয়ে আমার লজ্জিত-পরাজিত আব্বার সাথে ইলিশযোগে আউসের মোটা চালের ভাত খেয়েছিলাম। সেই ইলিশটার মতো এতো স্বাদের আর কখনো খাওয়া হয়নি।

আজ থেকে চার বছর আগে ঠিক এইদিনে (৭ ই জানুয়ারি)  আব্বা চলে গেছেন। আমি জীবনের প্রতিটি ঘাত-প্রতিঘাতে, প্রতিটি সিচুয়েশানে আব্বাকে মিস করি। আব্বা তার বেতনের টাকা আমাদের পরিবারের জন্য যতটা না ব্যয় করতেন তার অনেক বেশি করতেন, পড়শীদের জন্য। এলাকার মানুষ যে তাকে অযুত পরিমাণ ভালবাসতো, তিনি ছিলেন তার যোগ্য অধিকারী।

ইয়া রাব্বুল আলামিন, প্রার্থনার ভাষা তো তুমিই শিখিয়েছো, ” তুমি সে রকম যত্নে তাকে রাখো, যে রকম যত্নে তিনি আমার ছোটবেলায় আমাকে রেখেছেন।”

আসাদুজ্জামান জুয়েল সাহিত্যিক ও ফটোগ্রাফার।

আরও পড়ুন