মধুর সেই শাসন

সৈয়দা শর্মিলী জাহান রুমি
———————

আমরা তিন বোন, ভাই নেই। আমার বাবা ছিলেন খুব রাগী ও রাশভারী মানুষ ।  সব সময় আমাদের একদম চোখে চোখে রাখতেন । কোথাও যেতে চাইলে সাথে করে নিয়ে যেতেন। একা কোথাও যাবার অনুমতি দিতেন না কখনো । এইচ,এস,সি পাশ করার পর একা চলাফেরার স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। আর ঘরে চলতো বাবার পুলিশী কার্যক্রম ! আর, বাবার প্রায় সব কেসের আসামী ছিলাম আমি, অন্য দুজন শান্তশিষ্ট নিরব কবি ।

দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময়, একদিন বাবা অফিস থেকে ফিরে, আমার দাদার দেয়া একটি টেবিল ঘড়ির সামনের কাঁচটি আড়আড়ি ফাটা আবিষ্কার করলেন । তদন্ত শুরু হলো , শুরু হলো জেরা ” রুমী ঘড়িটা কে ভেঙেছে?”

“জানি না”

” আচ্ছা, কিভাবে ভাঙতে পারে ঘড়িটা বল তো ?”

আমার কাছে বুদ্ধি চাচ্ছে বাবা? খুশিতে গদগদ হয়ে উত্তর দিলাম ” মনে হয় কেউ বুঝতে পারছিলো না ঘড়ির কাঁচটা শক্ত নাকি নরম? তাই টেবিলে গুতো দিয়ে বুঝতে চেয়েছিলো হয়তো।”

“আচ্ছা ! এরপর তুই আমার কোন জিনিস ধরবি তো বুঝবি মজা!” উত্তম-মধ্যম খেয়েছিলাম কি না মনে নেই ।

স্কুলের সামনে বিক্রি করা রাস্তার খোলা খাবার খাওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিলো বাবার । তবুও টিফিনের জন্য মার কাছে আবদার করে টাকা নিয়ে খেতাম ওগুলো । একদিন বাবার তদন্ত শুরু ” রুমী তুই কি ঐসব খোলা খাবার খাস?”

.” না না না খাই না। “

.” আচ্ছা খুব ভালো । তোদের স্কুলের সামনে আচার বিক্রি করে এক বুড়ো , রহমত মিয়া তার নাম । “

.” না না ওনার নাম কলিম মিয়া,খুবই ভালো। “

” আচ্ছা , দারুণ ব্যাপার । তোরেও দেখি একনামেই চিনলো । আর যদি ঐসব খাস তোর ঠ্যাং ভাইঙ্গা ঘরে ঝুলায়া রাখুম । “

তখন দশম শ্রেণীতে পড়ি । মডেল নোবেলকে খুবই ভালো লাগতো । একদিন নোবেলের একটি পোস্টার কিনে দরজায় আঠা দিয়ে সেঁটে দিলাম । দরজার উপর বাড়তি একটি কাপড় দিয়ে পোস্টারটা ঢেকে রাখতাম যেন বাবার নজরে না পড়ে । একদিন তদন্তে এসে দাঁড়ালেন ঠিক দরজার সামনে । একটানে কাপড়টি সরিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বললেন  ” আসসালামুআলাইকুম নায়ক সাহেব ।  কি কপাল আমার ! আপনি আমার ঘরের দরজায় আর আমি জানিই না । তা দরজায় কেন? আসেন আমার বুকে আসেন । “

একথা বলে এক টানে পোস্টার ছিঁড়ে, টুকরো টুকরো করলো নোবেলকে । সাবধান বানী দিলেন ” ভবিষ্যতে আর যেন কোন নায়ক না আসে আমার ঘরে । বোঝা গেছে আমার কথা ?”

দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় একটু স্টাইল আর ঢংঢাং করতে চাইতো মন । পার্লারে তো যাওয়া সম্ভব না ; তাই একদিন নিজেই মাথার সামনের চুল ঘ্যাচাং করে কেটে কপালের উপর ছড়িয়ে দিলাম ।  তবে বাবার সামনে ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখতাম। বাবা ধরতে পারেননি তৎক্ষনাৎ।  হাতের নখও বড় করেছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে । যথারীতি তদন্তে আবার ধরা পড়লাম ঠিকই। এবার বক্তব্য ছিলো ” বাহ! চমৎকার! মনের বসত তবে অন্যখানে । তাই তো বলি আশি আশি করে গণিতে চল্লিশ । কপালে ঘাস হাতে চাক্কু!”

তারপর বসে বসে নিজের হাতে সব নখ কেটে দিলেন । এরপর হাতের নখ আর বড় রাখতে পারিনি ।

গল্পের বই পড়ার নেশা ছিলো খুব। কৌশলে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম । পড়ার বই উপরে রেখে ভেতরে গল্পের বই রাখতাম । দেরিতে হলেও এই ফাঁকিবাজিও ধরতে পেরেছিলেন তিনি ঠিকই । একদিন তদন্তে এসে বললেন ” কি কপাল ! পড়ার টেবিলে স্বয়ং মাসুদ রানা যে ! তাই তো বলি ,  পড়ালেখায় এতো সাফল্যের কারণ কি?”

এরপর মাসুদ রানা সহ অন্যান্য হিরোদের বস্তায় ভরে নিজ আলমারিতে বন্দি করে রাখলেন অনির্দিষ্টকালের জন্য ।

আরো কতো কতো মধুর শাসনের ইতিহাস লেখা মনের অলিতে-গলিতে । আমাদের বোনদের বিয়ে হয়েছে ।  বাবা বুঝে গেছেন আমরা বড় হয়েছি , এখন আর শাসন করেন না । তবে শখ হয়, বড় শখ হয় বারবার মধুর সেইসব বকুনি খাবার ।

সৈয়দা শর্মিলী জাহান রুমি সাহিত্যিক

আরও পড়ুন