বনলতা, পদ্মা ও করলা- ইলিশ

আসাদুজ্জামান জুয়েল

আমার আব্বা একজন ভীষণ রকম মিথ্যাবাদী মানুষ ছিলেন। একজন শিক্ষক যে এরকম মিথ্যা কথা বলতে পারেন, দুনিয়ার কেউ তা বিশ্বাস করবে না।

একদিন নোয়াখালীর এক ভদ্রলোক স্কুল পরিদর্শক হিসেবে আসলেন। আব্বা সন্ধ্যার সময় বড় বড় করলা আর ইলিশ মাছ নিয়ে হাজির।
ব্যাপার কি!
ব্যাপার হলো নোয়াখালীর মানুষটি একটি নতুন রেসিপি বলেছেন। নোয়াখালীর খুব প্রসিদ্ধ সেই খাবার আজকে রান্না হবে। আম্মা রেসিপি শুনে ছিঃ ছিঃ করতে লাগলেন। তারপরও আমাদের উৎসাহে সেই রান্না শুরু হলো। আব্বার শেখানো পদ্ধতিতে প্রথমে  করলাগুলোকে মাঝখান দিয়ে ফাঁড়া হলো। তারপর ইলিশ দিয়ে রান্না যখন প্রায় শেষ তখন তারমধ্যে ছিটিয়ে দেওয়া হলো চিনি।

আমরা ভাইবোনরা মহানন্দে আব্বার সাথে মাদুর পেতে খেতে বসে গেলাম। আম্মা সকলের প্লেটে মোটা চালের ভাতের সাথে তুলে দিলেন মিষ্টি-তেতো করলা ইলিশ। খাওয়া শেষে সবাই বললাম এমন অমৃত কখনো খাইনি।
আম্মা খেলেন সবার পরে। মাছ যত বড়ই হোক, মায়ের ভাগে লেজটাই পড়ে। আজকেও তার ব্যত্যয় হলোনা। খাওয়া শেষ করে আম্মা বললেন, ” যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা খারাপ হয়নি, তবে চিনিটা না দিলে আর একটু ভাল হতো।”
আব্বা এবার প্রকৃত সত্যটা খুলে বললেন, ” নোয়াখালীর শালারা এইসব করলা- ইলিশ কোথায় পাবে। ওদের কি পদ্মা আছে না করলা আছে!  আসলে আমার খেতে ইচ্ছে করলো, তোমাদের মা তো বকাবকি করবে তাই ঐ নোয়াখালির মানুষটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি। না হলে কি এমন মজার একটা খাবার খাওয়া যেতো বলো!”

এ রকম রেসিপি মাঝে মাঝেই বাসায় আসতো। কখনো দিনাজপুরের টমেটো চিংড়ি, কখনো ফরিদপুরের আচারযোগে হাঁসের গোশত, কখনো বা কক্সবাজারের দইযোগে আলু ভর্তা। কত কি যে আব্বা আমাদেরকে দিয়ে খাইয়েছেন! যেটা বাজে লাগতো খেতে, সেটার জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের লোকদের গুষ্টিশুদ্ধ গালমন্দ দিয়ে আব্বা একেবারে চন্ডাল শ্রেণীতে নামিয়ে ছাড়তেন। ব্যাটারা খাওয়া জানেনা, কিপ্টার দল সব, ইত্যাদি গালিগালাজ আমরা খুব উপভোগ করতাম।

আম্মাকে নিয়ে বিয়ের পরের সপ্তাহে আব্বা আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মার পাড়ে গেছেন। পানিতে পা ভিজিয়ে আম্মা খোলা চুলে দূরে দৃষ্টি দিয়ে কি যেন ভাবছেন। আব্বা বাদাম নিয়ে ফিরে দেখলেন, নদীর কিনারায় নৌকায় বসে এক বাবরী চুলওয়ালা কি যেন লিখছে আর বারবার আম্মার দিকে তাকাচ্ছে।  আব্বাতো রেগে গিয়ে লোকটার পাঞ্জাবীর কলার ধরে দু’ঘা বসিয়ে দিলেন। লোকটা কোন মতে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ভাই মাফ করবেন। আমি একজন কবি। এই নৌকায় করে কলকাতা যাচ্ছি। উনাকে এরকম উদাস দেখে একটা কবিতা লিখছিলাম।”
এই নিন বলে কবি সাহেব অটোগ্রাফসহ কবিতাটি আব্বাকে উপহার দিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে পত্রিকার সাহিত্য পাতায় একটি পরিচিত কবিতা পড়ে আব্বা মিলিয়ে দেখেছেন যে অটোগ্রাফযুক্ত ঐ কবিতাটির লেখকের নাম জীবনানন্দ দাশ। আব্বাকে দেওয়া কপিতে কবিতার নাম লেখা না থাকলেও পত্রিকায় কবিতার নাম দেওয়া হয়েছে, ” বনলতা সেন”। আমাদের দেখানোর জন্য আব্বা তাঁর স্যুটকেসটি খুলে পুরাতন কাগজপত্র উলোট পালোট করেও যখন সে কবিতাটা পেলেন না তখন আম্মাকে খুব বকাবকি করলেন। আমরা বুঝতে পারলাম আম্মা ভুলবশতঃ পুরাতন খবরের কাগজের সাথে অপ্রয়োজনীয় মনে করে মহামূল্যবান সে কবিতাটিও বিক্রি করে দিয়েছেন। যাহোক, আমাদের আম্মাকে নিয়ে লেখা জানার পর থেকে বনলতা সেন কবিতাটি আমার ভীষণ প্রিয়।
প্রায় প্রতি মাসেই বেতনের দিন বাসায় এসে আব্বা বোবার মত মন খারাপ করে বসে থাকতেন আর একটু পরপর পাঞ্জাবীর পকেটে কি যেন খুঁজতেন। আমরা সবাই আব্বার অবস্থা দেখে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানতে চাইতাম কি হয়েছে! আব্বা বলতেন, “ডান পকেটে রাখা তিনটি পাঁচ শত টাকার নোট কোথায় যেন পড়ে গেছে। অন্য পকেটের চার হাজার টাকাটা ঠিকই আছে।”
আমার সহজ সরল মা, বাবাকে খুব বকাবকি করতেন। বলতেন তিনি ঐ কয়টা টাকায় আর সংসার চালাতে পারবেন না। পরে সব স্বাভাবিক হয়ে যেত। আমাদের লেখাপড়া, সংসারের অত্যাবশ্যকীয় খরচ আর আব্বার বিভিন্ন রেসিপির কারণে পড়ে থাকা দোকান বাকি পরিশোধ করার পর আমরা দিনের পর দিন শুধুমাত্র আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে কাটিয়ে দিতাম।
টাকা হারানোটা যে মিথ্যে গল্প ছিল তা ধরা পড়তো যখন দূর্গা পুজোর সময় সুধীর জেলের বড় ছেলে রতন নারকেল নাড়ু নিয়ে এসে আম্মাকে প্রণাম করে বলতো যে, গত মাসে আব্বার দেওয়া টাকাটা না পেলে পরীক্ষার ফি’ টা আর দেওয়া হতো না, লেখাপড়াটাও ওখানেই শেষ হয়ে যেতো।

আজ আমার মিথ্যেবাদী আব্বা নেই। বাড়ির পাশের পদ্মার পাড়ে ঘুরতে গেলে দেখি, সুধীর মাঝি মরা পদ্মার চরের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখি, আব্বার কথা ভাবি। ইলিশের কথা ভাবি।

আসাদুজ্জামান জুয়েল সাহিত্যক।

আরও পড়ুন