এই তো সময় নীড়ে ফেরার…….

হাবিবা মুবাশ্বেরা

ব্যস্ত রাস্তায় বেপরোয়া গাড়িগুলো যখন প্রচন্ড স্পীড নিয়ে ছুটে যায় তখন তার গতিরোধ করার জন্য একটু পরপর দেয়া হয় স্পীডব্রেকার। আমরাও তেমনি পার্থিব জীবনকেই প্রায়োরিটি ভেবে তাতে সাফল্যে অর্জনের জন্য বিরামহীনভাবে ছুটে চলছি । মাঝে মাঝে স্পীডব্রেকারের মতো বিভিন্ন বিপদ এসে আমাদের এই ছুটে চলার গতিকে ধীর করে দিতে চাইলেও আমরা ছুটে চলার নেশায় এতটাই মত্ত যে, এই বিপদগুলোর মমার্থ উপলব্ধি করার সময়টুকুও নেই আমাদের।

কিন্তু আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি তো আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তিনি চান আমরা যেন সঠিক পথে চলি, তাই হয়তো এবার তিনি ছুটে চলার নেশায় বিভোর আমাদের সম্বিৎ ফেরানোর জন্য আমাদের চলার পথে এবার স্পীডব্রেকার নয় বরং ব্যারিকেড বসিয়ে দিয়েছেন। গাড়ি ঘুরিয়ে যে রাস্তা দিয়েই ছুটে চলার চেষ্টা করি না কেন সামনে এগুতে পারছি না কেউ। অলি-গলি ঘুরে তাই আমাদের বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে আমাদের নীড়ে।

নীড়, যেই নীড়কে সুন্দরভাবে সাজাবো বলেই আমার প্রতিদিন বের হই, ছুটে বেড়াই। কিন্তু কেমন আছে আমাদের এই নীড়গুলো ? একটি নীড় মানে কি শুধু দামী আসবাবে সাজানো একটি বাড়ি , যে বাড়িতে প্রাচুর্য আছে ঠিকই কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মাঝে আত্মিক টান নেই। সারাদিন বাইরে যে যার কাজে ব্যস্ত এরপর বাসায় ফিরে নিজ নিজ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। হয়তো রাতের বেলা ডাইনিং টেবিলে একবার দেখা হয় কিংবা একসাথে কোনো পার্টিতে গেলে একসাথে একটা সেলফি তোলা হয়। পারিবারিক টান বলতে আজ অধিকাংশ পরিবারের চিত্র এমনই।

কিন্তু এমন কি হওয়ার কথা ছিল?? পরিবার তো জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে ওঠে না । পরিবার গড়ে ওঠে মানুষ নিয়ে, একের প্রতি অন্যের কেয়ারিং নিয়ে, ইমোশন শেয়ারিং নিয়ে। অথচ পরিবার গঠনের সেই মূল উদ্দেশ্যই আজ হারিয়ে গেছে আমাদের বাইরের জীবনের ব্যস্ততায়। সন্তানের কাছে আজ পিতা-মাতার চেয়ে বন্ধুরাই বেশি আপন, ভাই-বোনের চেয়ে অফিসের কলিগদের সঙ্গই আজ বেশি ভালো লাগে সবার। কারণ দিনের অধিকাংশ সময় আমরা এই বাইরের মানুষগুলোর সাথেই কাটাই। তাদের সাথে তথাকথিত সাফল্যের প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার জন্য আমরা এতটা্ই ব্যস্ত যে আজ বাহির হয়ে গেছে আপন, আর নীড় হয়ে গেছে রাতের বেলা আরামে ঘুমানোর জায়গা মাত্র।

তাই হয়তো সৃষ্টিকর্তা আমাদের হুঁশ ফেরানোর জন্য এবার বাধ্য হয়ে ঘরে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। অদৃশ্য এক ভাইরাসের ভয়ে ভীত হয়ে আজ বিশ্বের মানুষ বাধ্য হচ্ছে ঘরে বন্দী থাকতে। এই যে ঘরে থাকার বাধ্যকতা তার কি কোনোই তাৎপর্য নেই??

আমরা যারা মুসলিম তারা তো বিশ্বাস করি স্রষ্টা যা করেন ভালোর জন্যই করেন!! তাহলে আসুন না এই ভালোটুকু খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। বাইরে যখন বের হওয়া যাচ্ছেই না, তখন সেটা নিয়ে হা-হুতাশ না করে ঘরে থেকে পরিবারের মানুষগুলোর সাথে ফিকে হয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে জীবন্ত করে তুলি!!!

জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেয়া ঠিক হয়েছে কি হয় নাই, এই বিতর্কে ফেসবুক গরম না করে বরং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাসায় একসাথে নামাজ পড়ি। আজও অনেক পরিবার আছে যেখানে বাবা যখন মসজিদে নামাজ পড়ে তখন তার ছেলে বন্ধুদের সাথে পর্ণ দেখে !! আবার অনেক ছেলে আছে যারা নিজেরা দ্বীনের সঠিক জ্ঞান পেয়েছে ঠিকই কিন্তু নিজের বাবা যখন পীর-হুজুরের কাছ থেকে পানি পরা ,তাবিজ নিয়ে আসে তখন তাকে কিছু বলতে পারে না।

অনেক পরিবারে মা পর্দা করে কিন্তু মেয়ে যে বাইরে গিয়ে প্রেম করে তা বুঝতে পারলেও অশান্তির ভয়ে চুপ থাকে। অনেক মেয়ে আবার নিজে অনলাইনে আরবী পড়া শিখে অথচ মাকে টিভিতে জি-বাংলা দেখা থেকে, গীবত করা থেকে বিরত রাখতে পারে না।

দিনে পর দিনের আত্মিক দূরত্ব আজ পরিবারের সদস্যদের বন্ধনগুলো এতটাই আলগা করে দিয়েছে যে, নিজের পরিবারের সদস্যদের কথা শোনার, তাদেরকে সময় নিয়ে, যুক্তি দিয়ে বোঝানোর পরিস্থিতিটাই হারিয়ে গেছে। অথচ ইসলামে পরিবার প্রথাকে অপরিসীম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পরিবারই হওয়া উচিত ছিল আমাদের শিক্ষা অর্জনের, পারষ্পরিক আলোচনা-সমালোচনার মূল কেন্দ্রস্থল। কিন্তু আমরা আজ পরিবারগুলোকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করে ফেলেছি।

তাই এখনই সময় পরিবারের সবাই মিলে একসাথে রবের কাছে ফিরে আসার। নিজেদের মধ্যকার ইগো বিসর্জন দিয়ে যার যার সঠিক জ্ঞানটুকু অন্যকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলার। নিজেদের নীড়কে শুধু আধুনিক ফার্নিচারের শোরুম না বানিয়ে তাকে জান্নাতের একটুকরো বাগান বানিয়ে তোলার।

করোনা আজাব না পরীক্ষা –এই বিতর্কে সময় অপচয় না করে আসুন সময়টাকে কাজে লাগাই পারিবারিক সম্পর্কগুলো মেরামতের কাজে। তাহলে আপনি যদি করোনা তে আক্রান্ত না হয়ে বেঁচে থাকেন তবে পরবর্তীতে এর সাইড অ্যাফেক্ট হিসেবে যে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার দিনগুলো আসছে সেগুলো পরিবারের সবাই একসাথে নতুন ঈমানী শক্তি নিয়ে মোকাবেলা করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

হাবিবা মুবাশ্বেরা সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন