আমার মা

আবদুল হাই ইদ্রিছী

মা। বাংলা বর্ণমালার মাত্র একটি বর্ণ দিয়ে গঠিত শব্দ-মা। কিন্তু পৃথিবীর সকল মধুময়তা যেন এই শব্দেই গাঁথা। এ যেন অমৃতের খনি । মনে হয় এর মাঝেই পৃথিবীর সকল তৃপ্তি। আমার মা এক মহীয়সী নারী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আমার মায়ের ডজন ডজন সনদ না থাকলেও মাতৃত্বের প্রশ্নে আমার মায়ের সাথে জগতের অন্য কোন শিক্ষকের, কোন চিকিৎসকের কিংবা অন্যকোন মমতাময়ীর তুলনা চলে না ।

মা সারাটা জীবন সংসারের ঘানি টানছেন। এখনও টানতেছেন। মা বিয়ের পর থেকেই বাবার সংসার একাই পরিচালনা করছেন। বাবার বিয়ের আগে দাদা-দাদী ইন্তেকাল করেন। তখন চাচারা পৃথক হয়ে যান। বাবা তখনও পড়া-লেখায়। থাকতেন শাহেস্তাগঞ্জ। পড়া-লেখা শেষ করে চাকুরী নিয়ে বিয়ে করেন। তাই সংসারে মাকে সহযোগিতা করার মতো তখন থেকেই কেউ নেই।

আমরা চার ভাই-বোন। দুই বোনে বিয়ে হয়ে তারা স্বামীর বাড়ি। পরিবারে অসুস্থ বাবা, মা ও আমরা দুই ভাই। বাবা অসুস্থ প্রায় তিন বছর। আগে নিজেরটা কোন রকমে কিছু কিছু করতে পারলেও প্রায় এক বছর থেকে কিছুই করতে পারেন না। মা’কেই বাবার গোসল, খাওয়া-দাওয়া, বাতরুমসহ সব কিছু করাতে হয়। আমরা দু’ই যখন বাড়ি থাকি তখন যেটুকু সম্ভব সেটুকু সহযোগিতা করি। যখন বাবার অসুস্থতা বাড়ে তখন এক নাগারে ২-৩ দিন মা বিছানায় গা লাগাতে পারেন না। এরপরও কখনো মাকে বিরক্ত হতে দেখিনি। কখনো দেখিনি মায়ের মলিন চেহারা। দেখিনি বাবার একটুও সমস্যা হতে।

আজ কাল সব সময় কাজের মেয়ে পাওয়া বড় কঠিন। এরপরও মা আমাদের পরিবারকে যে ভাবে রেখেছেন তা দেখলে মানুষ মাত্রই ভাবার বিষয়। বিশাল ঘর খানা সব সময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, সাজানো গুছানো। পালং আলনা সব সময় পরিপাঠি। খাওয়া-দাওয়ার টাইম-টেবিলে, মেহমানদারী কোন কোন কিছুতে সমস্যা নেই। বাড়িতে মেহমান আসলে কখনো তাকে বিরক্ত হতে দেখিনি বরং খুশি হন। আমরা দুই ভাইয়ের প্রতি মা এতোই যত্নশীল কখনো কোন কিছুতে এক বিন্দু পরিমান অসুবিদা অনুভব করিনি আমরা। আমরা অনেক সময় বলতে চাইলেও অনেক কিছু তাকে বলি না কিন্তু তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে অথবা আমাদেয় কথায়ই বুঝে নেন কি বলতে চাই।

এতো ঝামেলা। এতো কাজের চাপ এরপরও মাকে কোন দিন এক ওয়াক্ত নামায় কাযা করতে দেখিনি। এমনকি তাহাজ্জুদও তার খুব কমই মিস হয়। নফল এবাদতগুলোও করারও যথা সাদ্য চেষ্টা করেন। এই তো আজ থেকে (লেখাটা যখন লিখছি) মা শাওয়ালের রোজা রাখতে শুরু করেছেন। সন্ধায় তার সাথে ইফতারী খেলাম। মা এখন বয়সের ভারে চোখে একটু সমস্যা এরপরও রুমে এনার্জি বাল্ব জ্বালিয়ে আবার বড় হরফের কোরআন শরীফের সামনে চার্জার লাইট জ্বালিয়ে এক দিনও তেলাওয়াত বাদ দেন না। দিনের বেলা সময় না পাওয়ায় রাতে যে কোন এক সময় তাকে তেলাওয়াত করতেই হয়। আমরা দুই ভাই বাড়িতে না থকলে মা বাড়িতে একাই থাকেন। তখন বাবাকে দেখার জন্য বা কোন না কোন কাজে কত পুরুষ লোক বাড়িতে আসেন। মা আড়াল থেকে তাদের সাথে কথা বলে ড্রইং রুমে বসান। মেহমানদারীও করান কিন্তু কখনো কোন বেগানা পুরুষের সামনে বের হননি। মা কখনো এঘরে সে ঘরে প্রয়োজন ছাড়া বেড়াতে পাননি। এলাকার কোন মহিলা অসুস্থ হলে মা রাতের বেলা আমাদেরকে নিয়ে দেখতে যান।

মায়ের আমানতদারীতা আরও কঠিন। এলাকা অনেক মহিলা মায়ের কাছে তাদের টাকা-পয়সা আমানত রাখেন। অনেকের টাকা সারা বছরই তার কাছে পরে থাকে কিন্ত মা কখনো এই টাকা থেকে কাউকে এক একশত টাকার ভাংতিও দেন না। কত দিন নিজের প্রয়োজনে মা’কে বলেছি তোমার কাছে তো অনেকের টাকা আছে এখান থেকে আমাকে কিছু টাকা দাও আমি দুই-একটা দিন পর দিয়ে দেবো। কিন্তু অনেক মিনতি করেও নিতে পারিনি। বলেন টাকার মালিক না দেখলেও তো আল্লাহ দেখছেন। এক দিন বললাম বললাম টাকার মালিককে আমি বললে কি দেবে? মা বললেন তুমি তাকে বললে সে হয় তো তোমাকে না করবে না কিন্তু ভাববে তুমি কি করে জানতে পারলে তার টাকা আমার কাছে আছে, তাতে কি আমি লজ্জিত হবো না? আমি এখানেই থেমে গেলাম। শুধু অন্যেও আমানত নয় পরিবারের প্রতি মা আরও কঠিন। বাবার অজান্তে কখনো ঘর থেকে কিছু নিতে পারিনি? বাবার অনুমতি ছাড়া মা কখনো আমাদেরকে দেননি।

মায়ের ব্যবহারে কখনো কোন মানুষ কষ্ট পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। মা গরিব দুঃখিদের প্রতি খুব দরদী। ওদের আদর যত্নে তিনি সব সময় সচেষ্ট। আমার বড় চাচা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মর্ডার পরে ইন্তেকাল করেছেন। তার সাথে ইন্তেকাল করেন ১০বছরে তার এক ছেলে। চাচার ইন্তেকালের পর চাচীর সংসারে এক ভাই ও তিন বোন ছিলেন। আর চাচার মৃত্যুর আগেই এক বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর পর চাচী এক এক করে বাকী তিন বোনেকে বিয়ে দিয়ে দেন। ভাই বিয়ে করে বিদেশে চলে যান। এবং তার স্ত্রী চলে যান বাবার বাড়িতে। চাচী হয়ে যান একা। ভাই সেই যে বিদেশে গিয়েছে আর আজ প্রায় ২৬বছর হলো আর দেশে ফিরেননি। তার স্ত্রীও আর বাবার বাড়ি থেকে শাশুরীর কাছে আসেননি। চাচীর দেখ  শোন করতাম আমরা ও তার মেয়েরা। চাচী মৃত্যুর তিন বছর আগ থেকে ব্রেন স্টোকে বিছানায় ছিলেন। মাঝে মধ্যে তার মেয়ে এসে দুই এক দিন দেখা শোন করে যাবার সময় রোদন করে কেঁদে যেতেন। মেয়েরা তো বিয়ের পর পরাধীন হয়ে যায়। নিজের সংসার রেখে কি আর মায়ের কাছে পরে থাকা যায়। তবুও তারা চেষ্টা করতেন। আমার মা’ই চাচীকে দেখা শোনা করতেন। নিজের সংসারের সম্পূর্ণ কাজ করেও চাচীকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করানো, গোসল করানো, খাওয়া দাওয়া করানো, ঔষধ খাবানো সহ যাবতীয় কাজ করতেন মা। চাচী বিচানা থেকে উঠতে পারতেন না। বিচানায় থেকে পাগলামী করতেন। সব সময় সব কিছু এলোমেলো করতেন। বিচানা ছিড়তেন। হাতের কাছে কিছু পেলে ছুড়ে মারতেন। পশ্রাব-পায়খানা করে সব নষ্ট করতেন। চাচীকে পরিস্কার করতে গিয়ে মা’কে কোন দিন দুই তিন বার গোসল করতে হতো। কিন্তু একবারও এজন্য মা’কে বিরক্ত হতে দেখিনি। এসব পাড়াপ্রতিবেশি যারা দেখেছেন বা শুনেছেন সবই আশ্চর্য হয়েছেন। একদিন শুনি মা চাচীর ধারে গিয়ে সব এলো মেলো দেখে বলছেন- ’আপা আপনে সব সময় ইতা করনই কেন। বুঝইননানি?’ মায়ের কথা শুনে আমি হেসে উঠলাম। হাসি শুনে মা বললেন হাসলে কেন? বললাম তোমার আপনে-জি শুনে! তিনি কি কোন কিছু বুঝেন? কিন্তু তুমি যেভাবে ভদ্রতার সাথে আপনে-জি করে কথা বলছো তাতে. . . . .। মা বললেন, বাবারে রড় বোন হিসাবে তার সাথে সারা জীবন আদবের সাথে কথা বলেছি এখন অসুস্থ বলে কি ব্যয়াদবি করতে পারি? তিনি বুঝতে না পারলেও আল্লাহ তো দেখতেছেন! মায়ের কথায় তখন আমি খুব লজ্জিত হয়েছিলাম।

গতকাল রাতে আমার ঘুম হয়নি। নিত্যদিনের মতো হাতের কাজ শেষ করে রাত ২টায় বিচানায় গেলাম। কিন্তু কোন ভাবেই ঘুম আসলো না। খুব অশান্তিতে বিছানায় গড়াগড়ি করে রাত কাটালাম। ফজরের আযান হলে বিচানা থেকে উঠলাম। মাও তখন উঠেগেছেন। তখন আমার পেটে খুব ক্ষিদে অনুভব করলাম। ভাবলাম মা কে বলবো পরোটা বানাতে। কিন্তু বিবেক বাধলো। নামায পড়ে আবার বিচায় আসলাম। কিন্তু খুব অশান্তি লাগছিলো। কিছুক্ষন পর উঠে পাক রুমে গেলাম কিছু খাবার জন্য। গিয়ে দেখি মা নামায পরে পরোটা বানিয়ে ভাজছেন। আশ্চর্য হলাম। বললাম তুমি এখন পরোটা বানাতে লাগছো কেন? মা বললে তুই ঘুম হয়নি বলায় ভাবলাম রাতে অঘুমা করলে ক্ষিধা লাগে তাই আগে পরোটা দুইটা বানাতে লাগলাম। (আল্লাহু আকবার)

গতকাল প্রায় সারাদিন একটু একটু বৃষ্টি ছিল। বাড়ি থেকে কোথাও যাইনি। বিকেলে একটা বইয়ের আলোচনা লিখতে বসছি। হঠাৎ মনে হলো যদি পিঠা খাওয়া যেত তাহলে ভাল লাগতো। কিছুক্ষন পর দেখি মা ডাকছেন। ভাবলাম হয়তো চা পান করার জন্য ডাকছেন কারণ আমাদের পরিবারে চার টাইম চা খাওয়া হয়। সকাল, দুপুর, বিকাল ও সন্ধার পর। মায়ের ডাকে উঠে গিয়ে দেখি মা নারিকেলের পিঠা বানিয়ে রেখে এবং চা বানাচ্ছেন। অবাক হলাম। হায়রে মা। আমার কলিজার টুকরা মা। শুধু গতকাল নয়, আমার মা সব সময়ই এমন।

এমন মায়ের কোলে জন্ম দেয়ার জন্য মহান মাবুদের দরবারে নতশীরে শুকরিয়া আদায় করছি। মায়ের ত্যাগেই আমার প্রতিটি রক্তকণা, কোষ গঠিত হয়েছে । আমার শরীর, মন এবং জ্ঞানের প্রতিটি পরতে পরতে মায়ের অবদান স্পষ্ট । মায়ের কাছে শিখেছি কথা বলতে, হাটতে এবং অন্যকে শ্রদ্ধা করতে। আমার মধ্যে যতটুকু নৈতিকতা তার সবটকুই মায়ের দান। মা আমার জন্য যা করেছে তার ভগ্নাংশের ঋণও আমি মায়ের তরে আমার জীবন কোরবানী করে শোধ করতে পারবো না। দোযা করছি আল্লাহপাক আমার মাকে সুস্থতার সাথে নেক হায়াত দান করুন এবং মায়ের শরীর স্বাস্থ্যের মধ্যে বরকত দিন।

 

লেখকঃ

আবদুল হাই ইদ্রিছী

(সাংবাদিক: প্রাবন্ধিক ও কবি)

সম্পাদক: মাসিক শব্দচর

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ স্মৃতি সংসদ

সভাপতি: জাতীয় কবিতা মঞ্চ, মৌলভীবাজার জেলা।

সহ-সভাপতি: কমলগঞ্জ রিপোটার্স ইউনিটি

সাধারণ সম্পাদক: অক্ষর সাহিত্য সংসদ (অসাস)।

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.