ইংল্যান্ড ও ইসলামঃ এক অনুসন্ধানী পথযাত্রা-৬

জিয়াউল হক 

সম্রাট ওফা ৭৭৪ খৃষ্টাব্দে একটি সোনার দিনার চালু করেছিলেন, লন্ডনের Duc de Blacas সেই দিনারটি ১৮৪১ খৃষ্টাব্দে আবিস্কার করেন, ১৯২২ থেকে কয়েক বৎসর আগ পর্যন্ত মুদ্রাটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের দ্বিতীয় তলার নুমিসমেটিক শাখার ৬৮ নম্বর কক্ষে প্রদর্শনীর জন্য রাখা ছিল।মধ্যখানে ল্যাটিন ভাষায় Offa Rex (ওফা’র শাসন) লিখিত স্বর্ণমুদ্রাটির কয়েকটি বৈশিষ্ঠ; (১) ১৭৫ হিজরী/৭৭৪ খৃষ্টাব্দে প্রবর্তিত এটিই ইংল্যন্ডের ইতিহাসে সর্বপ্রথম স্বর্ণমুদ্রা। পরবর্তি চারশত বৎসরেও এরকম কোন মুদ্রা চালু হয়নি (২) ইউরোপের মাটিতে কুরআনের বাণী খোদাইকৃত সর্বপ্রথম মুদ্রা (৩) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বাইরে, খৃষ্টবিশ্বের সর্বপ্রথম স্বর্ণমুদ্রা।

একপাশে কলেমা তাইয়্যেবা এবং অপর পাশে, প্রান্তজুড়ে কুরআনের বাণী খোদাই করা প্রমাণ করে তিনি তাওহিদে বিশ্বাস করতেন, অর্থও বুঝতেনও। এর আগে চালুকৃত মুদ্রাগুলোতে নিজের ছবি ও ক্রস চিহ্ন থাকলেও দিনারটি চালুর সময় কুরআনের তাওহিদ বাণীকে উৎকীর্ণ করে নিজের ছবি সরিয়ে দিলেন। এটা ইসলামী শিক্ষা আর আদর্শকে ধারণের ইংগিতবহ।

দিনার’টিতে খোদাই করার জন্য আল কুরআনের আয়াত নির্বাচনের বিষয়টি যেমন তার মানসিক দৃড়তার পরিচয় বহন করে, তেমনি তাতে ইতিপূর্বে তারই দ্বারা চালুকৃত রৌপমুদ্রার অনুকরণে এবং সমকালীন ইউরোপীয় সমাজে প্রচলিত প্রথার বিপরীতে নিজের ছবিকে ইচ্ছাকৃত বাদ দেয়ার ঘটনাও ইসলামি আদর্শের প্রতি তার আনুগত্য ও নিষ্ঠার বিষয়টিকেও ফুটিয়ে তোলে।

এর আগে স্ত্রী Cynethryth’র নাম খোদাইকৃত রৌপ্যমুদ্রাও বাজারে ছেড়েছিলেন। ইংল্যন্ডের ইতিহাসে সেইটাই নারীর নামে চালুকৃত সর্বপ্রথম মুদ্রা। সেই মধ্যযুগে যখন খৃষ্টবিশ্ব ‘নারীর আত্মা আছে কি না’ বা নারী ‘মানুষ‘ কি না, এমন গবেষণায় নিয়োজিত, তখন সেই একই খৃষ্টবিশ্বে নারীকে এতটা সম্মান প্রদানের ঘটনায় প্রশ্ন উঠে সমকালীন সকল সামাজিক প্রথা ভেংগে ওফা কিসের ভিত্তিতে, একজন নারীকে এতটা উচ্চে তুলে ধরলেন? এমন কালোত্তীর্ণ নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক ঔদার্যই পেলেন কোথা থেকে? তার পারিপার্শ্বিক সমাজ ও সময়কালে এমন ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য, অশ্রুতপূর্ব ও অকল্পনীয়। সে যুগে এক ইসলাম ছাড়া আর কোন সমাজ নারীকে এতোটা মূল্যায়ন করেনি।

কোন কোন পশ্চিমা ঐতিহাসিক বলার চেষ্টা করেন, আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর অর রশীদের সাথে ওফার কুটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে মুসলিম বণীকদের সাথে লেনদেনের সুবধিার্থে ওফা স্বর্ণমুদ্রাটির প্রচলন করেছিলেন। এক উদ্ভট যুক্তি! মধ্যযুগীয় প্রচন্ড প্রতাপশালী এবং আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এ্যংলো সেক্সন একজন রাজা কি করে বাগদাদের খলিফা বা অন্য কোন দেশের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনের সুবিধার্থে এমন একটা মুদ্রা চালু করবেন, যা তার নিজের দেশ, প্রশাসন, রাজ্য, আদর্শ আর বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব না করে বরং প্রতিনিধিত্ব করবে সম্পূর্ণ বিপরিত, বৈরি ও প্রতিদ্বন্দী একটা আদর্শের!

সম্রাট ওফা সেই সময়ে মুসলিম বিশ্ব থেকে কোন ধরনের ভূ রাজনৈতিক, কুটনৈতিক, সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ছিলেন যে, তাকে কয়েক হাজার মাইল দূরত্বের একটা বিপরিত আদর্শের রাষ্ট্রের বশ্যতা শিকার করার নামান্তর তাদেরই অনূকরণে একটা মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে? অথচ তিনি নিজেই প্রতিবেশী সকল রাজ্যগুলোকে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শক্তি দিয়ে গ্রাস করে করে চলেছেন!

তর্কের খাতিরেও যদি ধরা হয় যে, আসলেই কিং ওফা মুসলিম বণীকদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থেই স্বর্ণমুদ্রা চালু করেছিলেন, তা হলেও প্রশ্ন থেকে থেকে যায়; তিনি তাতে আল কুরআনের সেই বাণীকে কেন খোদাই করবেন যার প্রতি একজন খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীর বিশ্বাস স্থাপনের প্রশ্নই আসে না। বরং তা তাদের আক্বীদা-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরিত?

একদল পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের মতে ওফা’র রাজ্য মার্সিয়াতে তখন কোন আর্চবিশপ পদ ছিল না। পোপের প্রতিনিধি হিসেবে তখন আর্চবিশপ অব কেন্টারবারী কেন্ট রাজ্যে এবং আরও উত্তরে নর্থাম্বারল্যন্ড রাজ্যের ইয়র্কে পোপের নিযুক্ত একজন আর্চবিশপ ছিলেন। প্রতিবেশি দুই রাজ্যে দুইজন আর্চবিশপের উপস্থিতি, আর্চবিশপ অব কেন্টারবারী কর্তৃক মার্সিয়ার গির্জা ও পাদ্রিদের দেখভাল করাটা প্রচন্ড আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ওফার মনপূত ছিল না। তিনি পোপের কাছে মার্সিয়ার নিজস্ব আর্চবিশপ চেয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন সফল কুটনীতির কারণে পোপ মার্সিয়ায় আর্চবিশপ মনোনয়ন দেন। এবং তখন পোপের যে প্রতিনিধি দল মার্সিয়ায় কিং ওফার সাথে তার রাজ্যে আলাদা আচবির্শপ নিয়োগের ব্যপারে আলোচনায় আসা প্রতিনিধিদের সাথে ওফার চৃুক্তি হয়, ওফা তার রাজ্যে আলাদা আর্চবিশপ নিয়োগ দানের বিনিময়ে পোপকে প্রতিদিন একটি হিসেবে বছরে ৩৬৫টি স্বর্ণমুদ্রা দেবেন, ফলে পোপ ওফার আবেদন মঞ্জুর করেন। সেই চুক্তি রাক্ষার্থেই ওফা স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেছিলেন।

যুক্তিটি একেবারেই হাস্যকর। এমন যুক্তির সপক্ষে কোন দলিলের অস্তিত্বও নেই (লেখক লন্ডন মিউজিয়ামে খোঁজ করে এ সংক্রান্ত কোন দলিল পাননি)। কিং ওফা কর্তৃক খৃষ্টবিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপকে যদি ট্যাক্স হিসেবে স্বর্ণমুদ্রা দেবেনই, তা হলে তা খৃষ্টবাদের মূল মর্মবাণীর পরিবর্তে তার সাথে সাংঘর্ষির্ক কুরআনের আয়াতকে খোদাই করে কেন? এটা তো পোপ ও পুরো খৃষ্টজগতের প্রতি অপমানজনক!

মুদ্রাটিতে খোদইকৃত কুরআনের একটি আয়াতটি ছিলো; ‘তিনি তার রাসুলকে সত্যধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন তা সকল ধর্মের উপরে বিজয়ী হয়’
বুঝলেন কিছু? ঠিক সেই সময়টাতে ওফা পোপের কাটা ঘায়ে লবণের ছিটা দিলেন যখন পোপ গথিক স্পেন ও ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল মুসলমানদের হাতে হারিয়েছেন। ইতিহাসের পাঠ নিতে জানতে হয়। যদি সেটা পারেন, তবে দেখবেন প্রকৃত সত্য হলো, কিং ওফা ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামি শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইংল্যন্ডে ইসলামি সমাজব্যবস্থা চালুর দিকে এগুচ্ছিলেন (সংক্ষিপ্তকৃত)।

(চলবে)

আগের পর্ব-ইংল্যান্ড ও ইসলামঃ এক অনুসন্ধানী পথযাত্রা-৫

লেখক: ইংল‍্যান্ডের বেসরকারী মানসিক হাসপাতালের সাবেক সহকারী পরিচালক ও লেখক, ইংল‍্যান্ড

আরও পড়ুন