ইংল্যান্ড ও ইসলামঃ এক অনুসন্ধানী পথযাত্রা-২

জিয়াউল হক

এখানে ইতিহাসের এ পর্যায়ে এসে দু’জন নরনারী একে অপরের সাথে জড়িয়ে যান। এদের একজন হলেন ইংল্যান্ডের উপকুলীয় শহর কেন্টের Catuvellauni সম্প্রদায়ের রেজিনা ‘Regina’ নাম্নী এক যুবতি, তিনি ছিলেন একজন দাসী।
আর অপরজন হলেন সিরিয়া থেকে আসা একজন আরব যুবক। ইংল্যান্ডের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভােেগর রেকর্ড অনুযায়ী তার নাম ছিল বারাত্স। বারাত (‘Barates) বা বারা’আ ব্যবসায়ে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত সাউথশিল্ড থেকে সিরিয়া পর্যন্ত তার বাণিজ্য জাহাজ পরিচালনা করে রোমান সৈন্যদের জন্য রসদ আনা নেওয়া করতেন।

বারাত বর্তমান দামেস্কের ২১৫ কিমি উত্তর পূর্বে ও ফোরাত নদীর ১৮০ কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে প্রাচীন শহর ‘তাদমুর’ (আধুনিক সিরিয়ার হোমস শহর) থেকে এসেছিলেন। (ইংরেজি বা ল্যাটিন নাম ‘Palmyra’। প্রাচিন এই শহরটির ধংসাবশেষ এখনও রয়েছে, সেটি ইউনেস্কোর ওয়ার্লড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত। আর ধ্বংসপ্রাপ্ত এই শহরের পাশেই এখনও ‘আকা তাদমুর’ নামে একটি শহর আজও বিদ্যমান)।

এই আরাবিয়া দুর্গেই বারাত রেজিনার প্রেমে পড়েন। দাসত্ব থেকে রেজিনা মুক্তি পেলে বারাত তাকে বিয়ে করেন (সম্ভবত তিনি নিজ অর্থে রেজিনাকে কিনে নিয়ে তাকে মুক্ত করে দেন। যদিও এর কোন অকাট্য প্রমাণ আমাদের হাতে নেই এখন পর্যন্ত)। মাত্র তিরিশ বৎসরে রেজিনার মৃত্যু হলে ‘বারাত্স্’ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং তিনি মৃত স্ত্রীর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য সেখানে একটা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। এই স্মৃতিস্তম্ভটি আজও সেখানে রয়েছে।
বারাত্স্ নিজেও এই ইংল্যন্ডেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সমাহিত হয়েছেন নিউক্যাসল শহর থেকে প্রায় আঠারো মাইল দূরে অবস্থিত ‘ঈড়ৎপযবংঃবৎ’ নামক এক শহরে। উক্ত শহরে ‘Corbridge Roman Site’ নামীয় সে যুগের আরও একটি রোমান দূর্গের ধ্বংসাবশেষের সাথে তার কবরটিও আজও সেখানে রয়েছে। (সুত্র:সরেজমিনে লেখকের নিজস্ব অনুসন্ধান)

আজ থেকে দুই হাজার বৎসর পূর্বে, সিরিয়া, মেসেপটোমিয়া, তথা, ইরাক থেকে ব্যবসা ও চাকুরি কিংবা দাস হিসেবে রোমান বাহিনীর সৈন্য হয়ে এই ইংল্যন্ডে আরবরা (ইসা আ: এর উম্মত মুসলমান) এসেছিলেন। তারা এখানে বসবাস করতেন। বিয়ে শাদি করে এখানেই মারা গেছেন, সমাহিতও হয়েছেন।

এই তথ্যটি আমাদের গবেষণার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইরাক বা সিরিয়া হয়ে আগত এসব আরবরা এখানে সাথে করে এনেছেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এখানে বসবাসের সাথে সাথে তাদের সে কৃষ্টি-কালচার, বোধ-বিশ্বাসকেও লালন করেছেন। তা হলে অতি অবশ্যই এখানকার মাটিতে, এখানকার লোকগাঁথায়, জনপদের নামকরণে বা তাদের ধ্বংসাবশেষে সে সবের কোন না কোন চিহ্ন থাকবেই।
আমরা ইতোমধ্যেই বলেছি যে, প্রায় চুয়াত্তর মাইল দীর্ঘ হেড্রিয়ান ওয়ালে সোয়া এক মাইল পর পর একটা করে সেনাছাউনীতে রোমান সৈন্যদের নিয়োজিত রাখা হতো। এই দীর্ঘ প্রাচিরব্যাপী অন্তত সতোরোটি এরকম সেনাছাউনী নির্মাণ করা হয়েছিল। আর ছোট বড় এসব সেনা ছাউনীগুলোতে প্রায় দশ হাজার রোমান সৈন্য নিয়োজিত থাকত।

এই বিশাল সৈন্যবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ, খাদ্যদ্রব্য ও সামরিক সরঞ্জাম রসদ সরবরাহের মত দুরুহ ও জটিল কাজটি সম্পাদনের জন্যই টাইন নদীর উৎসমূখে প্রতিষ্ঠা করা হয় এই দূর্গটি। দূর্গটির নামকরণ নি:সন্দেহে একটা রহস্যময় বিষয়। আজ হতে দু’হাজার বৎসর আগের প্যাগান ইংল্যন্ডে ডেন, জুটস, কিংবা এ্যাংলো-সেক্সন কোন জাতিগোষ্ঠির ভাষার সাথেই এই ‘র্এ্যবিয়া’ বা ‘এ্যরবিয়ে’ (Arbeia) শব্দটির উৎপত্তিগত বা ধ্বনীগত কোন মিল নেই।

খৃষ্টপূর্ব ৫৫ এবং ৫৪ সালের সম্রাট জুলিয়াস সিজারের সময়কাল থেকে শুরু করে খৃষ্টপূর্ব ৩৪, ২৭ এবং ২৫ সালে সম্রাট অগাষ্টাস, ৪৩ খৃষ্টাব্দে ক্লাউডিয়াস কর্তৃক পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু আর ৭৭ খৃষ্টাব্দে ব্রিটেন দখল সমাপ্ত করে বর্তমানে ‘ইংল্যন্ড’ নামে পরিচিত এই দ্বীপটিকে রোমান সাম্রাজ্যভূক্ত করলেন এবং ‘ব্রিটানিয়া’ নামে নামকরণও করলেন । যে সম্রাট হেড্রিয়ান সরেজমিনে নতুন এই রোমান প্রদেশটি দেখতে দুইবার সুদুর রোম থেকে ছুটে এলেন, স্কটল্যন্ড থেকে আলাদা করতে প্রায় ৭৪ মাইল লম্বা প্রাচিরও নির্মাণ করালেন। সেইসব সম্রাট কিংবা যে রোমান সম্রাটের সময়কালে আলোচ্য এই দূর্গটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেই সম্রাট ‘Septimius Severus’ এদের কারো নামেই এর নামকরণ করা হয়নি। করা হয়েছে একটি গোত্র ব জাতি, আরব জাতির নামে।

তা হলে এর উৎসমূল কোথায়? আর এরকম নামকরণই বা কেন? এর জবাব হলো এই যে, রোমান সম্রাট ‘Septimius Severus’ নিজেই ছিলেন একজন ফিরিস্তিনি সিরিয়া  আরব। আরব, কিন্তু রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট। তিনিই এ দূর্গটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই এর নামকরণ করেছেন এভাবে। ইংল্যান্ডের বুকে আরব এবং ইসলামি ঐতিহ্য খুঁজতে এ তথ্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

(যাদুঘরে রক্ষিত রেজিনার প্রতিকৃতি বা মুর্তির এ ছবিটা ২০১৩ সালে আমার নিজ হাতে তোলা। নর্থ সি থেকে টাইন নদীতে ফেরি ঢুকছে, এ পথেই বারাত সিরিয়া থেকে তার জাহাজ আনতেন)

লেখকঃ ইংল্যান্ডের বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রাক্তন পরিচালক ও লেখক

আরও পড়ুন