ইংল‍্যান্ড ও ইসলাম: এক অনুসন্ধানী পথযাত্রা-৪

জিয়াউল হক
এখানে আরবরা, মুসলমানরা এসেছিলেন কি না, সেটা জানার আগে আমাদের জানতে হবে এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি কিভাবে ব্রিটেন, কিভাবে ইংল্যান্ড এবং কিভাবে আজকের এ পর্যায়ে উঠে এলো। এই উঠে আসার কোন একটা পর্যায়েই ঘটনা ও ভাগ্যক্রমে কিছু মুসলমান এসেছিলেন। আনা হয়েছিল। পরিণামে তার যে ভূ-রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সামাজিক প্রভাব, সেটা খুঁজতে গেলেই সেখানে ইসলামের দেখা মেলে।

ট্রোজান যুদ্ধে (Trojan War), গ্রিকদের বিজয় ও ট্রয় নগরী’সহ স্পার্টার ধ্বংসযজ্ঞ এজিয়ান সাগরের মাত্র চার মাইল দূরে আধুনিক তুরস্কের Hisarlik/Hissarlik শহরের উপকন্ঠে আজও দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ংকর যুদ্ধে পুরো ট্রয় নগরী’সহ পুরো স্পার্টা রাজ্যই ধ্বংস হয়ে যায়। বহু প্রাণহানী ঘটে। হাজার হাজার নারী পুরুষ বিভিন্ন জনপদে পালিয়ে জীবন বাঁচায়। আবার গ্রিক সমাজেও এক বিরাট অংশ দাসত্ব বরণ করে নেয়। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আগতদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন স্পার্টার সেনাপতি Aeneas। তিনি পুত্র Ascanius’সহ পালিয়ে এলে ইটালির তৎকালিন সম্রাট Latinus তাকে আশ্রয় দেন।

ট্রয়ের পরাজিত সেনাপতিকে আশ্রয় দেওয়ায় খোদ ইটালিতেই বিরোধিদের সাথে সম্রাটের যুদ্ধ বেধে যায়। পিতা-পুত্রও (Aeneas ও Ascanius) আশ্রয়দাতা বন্ধু ও ইটালির সম্রাট লাটিনাসের (Latinus ) পক্ষ হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন। এবং ইটালির এই গৃহযুদ্ধের সুত্রে শেষ পর্যন্ত পুরো ইটালিই দখল করে নেন। ইটালির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পাশাপাশি সম্রাট ল্যাটিনাসের কন্যা লাভিনিয়াকে (Lavinia) তারা বন্দী করে।

সম্রাট আনিয়াসের (Aeneas) মৃত্যুর পরে তার সন্তান আসানিয়াস (Ascanius) ইটালির ক্ষমতায় বসেন এবং সিলভিয়াস (Silvius) নামক এক পুত্রের জনক হন। এই সিলভিয়াস লাভিনিয়ার এক ভাইঝির সাথে গোপনে প্রেম ও পরবর্তিতে বিয়ে করেন। তাদের এক পুত্র সন্তান; Brutus জন্মগ্রহণ করে। স্থানীয় জোতিষীরা আগেই সম্রাট ‘আসানিয়াস’কে ভবিষ্যৎবাণী করে রেখেছিলো যে, এই সন্তান; Brutus তার বাবা ও মা উভয়ের মৃত্যুর কারণ হবে। হয়েছিলও তাই।

Brutus’কে জন্ম দিতে গিয়ে প্রসবকালেই তার মায়ের মৃত্যু হয়। আর ব্রুটাসের বয়স যখন পনেরো বসর, সে সময় বাবা সিলভিয়াসের সাথে শিকারে গিয়ে তার নিক্ষিপ্ত একটা তীর লক্ষ্যভ্রষ্ঠ হয়ে তারই বাবার বুকে বিদ্ধ হলে বাবা সিলভিয়াস’ও মৃত্যুবরণ করে। নিকটাত্মীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে এমন অলুক্ষুণে সন্তানকে ইটালি ছাড়তে বাধ্য করলে ব্রুটাস মাত্র অল্পসংখক অনুসারী ও শুভাকাংক্ষী’সহ সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে আশ্রয় নেন।

ট্রোজান যুদ্ধের পর বহু সংখক স্পার্টবাসী বন্দী হয়ে গ্রিসের বিভিন্ন শহর বন্দরে বসবাস করে আসছিল। স্থানীয় গ্রিকদেও দ্বারা নানাভাবে নিগৃহিত ও নির্যাতিত হতো। কিন্ত সে নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তির কোন পথ তাদের সামনে ছিল না। স্বজাতি ট্রোজানরা এ সময় Brutus’কে তাদের মাঝে পেলো। ব্রুটাসের সাথে প্রায় কয়েক হাজার অনুসারীও ইতোমধ্যেই জড়ো হয়েছে। এক সময় খোদ গ্রিস সরকারের সাথে গ্রিসেই অবস্থানরত ট্রোজানদের সংঘাত বেধে যায়, Brutus সেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন।

এ যুদ্ধে গ্রিসের রাজা Pandrasus পরাজিত হন। যুদ্ধে বিজয়ী হয়েও Brutus গ্রিসে অবস্থান করেন নি, বরং প্রচুর ধন সম্পদ হস্তগত করে এবং গ্রিক সম্রাটের কন্যা Ignog’কে বিয়ে করার মাধ্যমে বরং গ্রিস সরকার ও সমাজের সাথে তিনি আত্মীয়তা তৈরি করেন। এর পরে তিনি ৩২৪টি বড়ো বড়ো নৌকায় কয়েক হাজার অনুসারীসহ গ্রিস ত্যাগ করেন। গ্রিস ত্যাগ করলেও Brutus ইটালিও ফেরত গেলেন না, বরং তার অনুসারীগণ’সহ এক এক করে আফ্রিকার উত্তর উপকূলীয় বিভিন্ন বন্দর ও জ্রিবাল্টার হয়ে গউল, তথা, আধুনিক ফ্রান্সে উপনীত হলেন (১)

গউল, তথা, ফ্রান্সে থাকাকালীন পথিমধ্যে বেশ কয়েক বসর Brutus’কে স্থানীয় নানা গোত্র ও উপজাতির লোকজনের সাথে সংঘর্ষে জড়াতে হয়েছে। এইসব সংঘর্ষে তার বাহিনীর বহু লোকের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। তিনি নিজের বাহিনীকে নিয়ে একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজছিলেন যেখানে নিজেদের জন্য একটা আবাস গড়ে তুলতে পারেন। এ লক্ষ্য নিয়েই শেষ পর্যন্ত এখান থেকে এক সময় সদলবলে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে উঁচু নিচু পাহাড় আর গভীর ঘন বন জঙ্গল পরিবেষ্ঠিত একটি দ্বীপের মাটিতে পা রাখেন।

চারিদিকে সমুদ্র দিয়ে ঘেরা এ দ্বীপটির নাম ছিল; Albion। ঘন বন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি এ জনপদটি বলা চলে জনমানবিহীন একটি দূর্গম দ্বীপ যেখানে মানুষজন বসতি ছিল না বললেই চলে। কোথাও কোথাও খুব দীর্ঘাকায় ও রুক্ষ এক উপজাতির বসবাস ছিল। এদের সাথেই ব্রুটাসের বাহিনীর সংঘর্ষ ঘটে।

দ্বীপটি রাষ্ট্রটি বেশ কিছু নদীর দ্বারা আভ্যন্তরীণ ভূখন্ডে যোগাযোগের জন্য খুবই উপযোগী। এখানকার নদ নদীতে নানা প্রজাতির মাছ, আর বনে জঙ্গলে নানা পশুপ্রাণী, শত শত বসরের পুরোনো গাছ গাছালি, ফল মূল ও দামী কাঠের প্রাচুর্যে ভরা। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ভূমি চাষাবাদের জন্য খালি পড়ে রয়েছে। ব্রুটাসের খুবই পছন্দ হলো দ্বীপটি। তিনি সদলবলে স্থায়ী আবাস গাড়লেন।

এই দ্বীপটিকেই Brutus নিজের নামানূসারে ‘ব্রিটেন (Britain)’ এবং তার সাথে যে কয়েক হাজার ট্রোজান এসেছেন তাদেরকে ‘ব্রিটন (Briton)’ হিসেবে নামকরণ করে একটি সমাজ গড়তে মন দিলেন। তিনি নিজের লোকজনদের মাঝে ভূমি বন্টন করে দিলেন। তার সবচেয়ে কাছের লোক, সেনাপতি ও বন্ধু; Corineus’কে যে এলাকাটা দিলেন, সেটিরও নামকরণ হয়েছে তারই নামে; Cornwall হিসেবে। আজ সেটা ইংল্যান্ডের চমৎকার একটি আধুনিক শহর। (২)

এভাবে Brutus নিজেও আশে পাশে ভাগ করে দেয়া গোত্র ও Briton’দের সাথে সহজে যোগাযোগ রক্ষা করা যেতে পারে, এমন জায়গা খুঁজতে খুঁজতে টেমস নদীর পাড়ের জায়গাটা পছন্দ হলে সেখানেই নিজের বাসতি গাড়লেন। জন্মভূমি ট্রয়ের স্মৃতিকে ধারণ করে নাম রাখলেন ‘Troia Nova’ বা ‘নতুন ট্রয়’/‘নয়া ট্রয়’ হিসেবে এবং একে রাজধানী হিসেবে গড়তে লাগলেন। পরবর্তিতে এই নগরটিই গ্রিক বাকধ্বনী ও বাকরীতির অনুকরণে ‘Trinovantum’ হিসেবে পরিচিত পায়। এই ‘ট্রোয়া নোভা (Troia Nova) বা ট্রাইনোভান্টাম (Trinovantum)’ নগরটিই আজকের ‘লন্ডন’। (৩)
(তথ্যসুত্র মূল গ্রন্থে দেয়া থাকবে ইনশাআল্লাহ)

লেখক: ইংল‍্যান্ডের বেসরকারী মানসিক হাসপাতালের সাবেক সহকারী পরিচালক ও লেখক, ইংল‍্যান্ড

আরও পড়ুন