বখতিয়ার খিলজি (রহ.) বাংলার মানুষের মুক্তিদূত

জি. মোস্তফা

বাংলার মৃত্তিকার ওপর যখন শোষণ-নিপীড়ন ও ঘৃণার চাষ শুরু হয়েছিলো, গগনে নেমেছিলো নিকষ কালো অন্ধকার। ভোরহীন এক দীর্ঘ তিমির রাত্রি সূচিত হয়েছিলো। তখন এই বাংলার আকাশের কালো মেঘকে বিদীর্ণ করে যিনি নব সূর্যের উদয় ঘটিয়েছিলেন এবং সমস্ত জাতপ্রথা ও যুলুম পীড়নের শিকড় মূলোৎপাটন করে ভালোবাসা, রহমাহ,ইনসাফ ও আদালতের সূচনা করেছিলেন তিনি হলেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি।
তার আগমন ছিলো বাংলার জন্য আশির্বাদ স্বরূপ। আর এমন একজন ব্যক্তির আগমনের প্রত্যাশী হয়ে অপেক্ষায় ছিলো বাংলার নিপীড়িত মানুষ।

তার মাধ্যমেই বাংলায় সূচিত হয়েছিলো মুসলিম শাসনের। দীর্ঘ সাড়ে ছয়শো বছর এদেশে তা স্থায়ী হয়েছিলো।এতে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছিলো শিল্প,সাহিত্য,সংস্কৃতি ও প্রতিটি ক্ষেত্রে। মানুষের ভেতর তৈরি হয়েছিলো ভালোবাসার সম্পর্ক। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে মুক্তি মিলেছিলো তো নিশ্চয়ই। সাম্য ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো পুরনো বৃক্ষের শিকড়ের মতো দৃঢ়রূপে।

স্যার এডমন্ড বার্ক নামক জনৈক বিখ্যাত বৃটিশ পার্লামেন্টারিয়ান তাঁর এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বলেছিলেন,

“মুহাম্মদ (স.) এর অনুসারীরা যে শাসন ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন,তাতে করে অন্ততঃ পরবর্তী এক হাজার বছরের মধ্যে এমন কোনো দুঃসংবাদ আমরা পাইনা যে, তাদের দ্বারা শাসিত এলাকার মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে কিংবা কোনো মানুষ না খেয়ে মরেছে।”

তিনি আরো বলেছেন,

” মুহাম্মদ (স.) এর অনুসারীরা যেখানে যেথায় শাসন কার্য পরিচালনা করেছেন,সেখানে অন্ততঃ খাওয়া পরার একটা নিশ্চয়তা বিদ্যমান ছিলো।”

বাংলায়ও এই ব্যবস্থাপনার ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। মানুষ তখন চিরসুখে জীবন যাপন করছিলো।১৭৫৭ সালে ব্রাহ্মন্যবাদী ও ইংরেজদের চক্রান্তে পলাশী অভিনয়ের মাধ্যমে বাংলা ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য হয় অস্তমিত। শুরু হয় ইংরেজদের দৌরাত্ম,পিশাচের মতো আচরণ। জোঁকের মতো তারা শোষণ করে বাংলাকে।

পলাশী বিপর্যয়ের পর শোষিত বাংলার রূপ বদলে যায় ।

পলাশী বিপর্যের পর সাত দিন পর্যন্ত বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ বৃটিশরা লুণ্ঠন করে।মুর্শিদাবাদ হতে লুণ্ঠিত সোনা- চাঁদি,গহনা-পত্র এবং টাকা পয়সা ইত্যাদি সহ ৬০ টি নৌকা বোঝায় মালামাল কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। সে সব মূল্যবান সম্পদ কলকাতায় পৌঁছার পর সেখান হতে স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ চুরি করে ছয় লাখ পাউন্ড মূল্যমানের সম্পদ এবং তার চেলা চামুন্ডারা চুরি করে আরো চার লাখ পাউন্ড। সর্বমোট ১০ লাখ পাউন্ড চুরি হওয়ার পরেও অবশিষ্ট যে টাকাগুলো ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিলো, তা দ্বারা ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই সর্বপ্রথম ইউরোপের বুকে ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ এর জন্ম হয়। আর সেই ব্যাংকের অর্থের সাহায্যেই তৎকালিন ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়।

তারপর দুইশো বছর তারা বাংলা তথা ভারত বর্ষকে শোষণ করে। সবুজ শ্যামল সোনার বাংলা পরিণত হয় শুষ্ক খর্জুর পত্রের ন্যায়।অসার ও শূন্য হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক কোষাগার। সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গড়ে ওঠে শ্বেত চামড়াওয়ালাদের গোলামির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বাংলার সোনালি থালার সমস্ত খাবার ভক্ষণ করতে তারা হিন্দু বাবুদেরকে চামচ হিসেবে ব্যবহার করে। এতে খুশিতে গদগদ হয়ে যায় হিন্দুরা,ওই যে চামচে একটু খাবারের পরশ লেগেছে!

সব কিছু চুষে খাওয়ার পর পরিত্যাক্ত অবস্থায় বাংলাকে ফেলে যায় ব্রিটিশরা।১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়।শুরু হয় অস্থিতিশীল পরিবেশ। ১৯৭১ সালে শুরু হয় পুনরায় যুদ্ধ। বাংলাদেশকে সহযোগিতার নামে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুণ্ঠন করে ভারতীয় সৈন্যরা। টয়লেটের ফিটিংস পর্যন্ত তাদের লু্ণ্ঠন হস্ত থেকে রেহাই পায়নি।মেজর জলিল এই লুণ্ঠনের বিরোধিতা করায় স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম কারারুদ্ধ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন তিনি। এরপর ভারত এবং তাদের দোসররা এবং শিল্পপতি ও পুঁজিপতিরা আজো দেশটাকে শোষণ করে চলছে। কবে এই শোষণ।অবসান ঘটবে?

বাংলার মানুষ আজো খুঁজে ফেরে চলে সেই মুজাহিদ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজিকে।কখন তিনি আসবেন ঘোড়সওয়ার হয়ে বাংলার মানুষকে গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্ত করতে! কখন আসবে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা! মুসলমানদের সেই সোনালি শাসনের প্রয়োজনীয়তা দিকে দিকে অনুভব করছে এই বাংলার মানুষ। চাতক পাখির মতো ফেলে ফেল করে তাকিয়ে রয়েছে মুক্তিকামী জনগণ।

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন