ওসমানী সালতানাতের যতকথা (পর্ব-০২)

জান্নাত খাতুন

ওসমানের মৃত্যুর পর ওসমানের ছেলে ওরহান ওসমানী সালতানাতের প্রথম সুলতান হয়েছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ছোট ছোট সম্রাজ্যগুলো তাদের অস্তিত্বের হুমকিতে থাকতো। তখন তাদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকতো। এক, তারা তাদের প্রতিবেশী ছোট ছোট সম্রাজ্যগুলোকে নিজেদের অধীন করে নেবে। দুই, নিজেরা কোন সম্রাজ্যের অধীন হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব শেষ করে দেওয়া। এরকম হুমকি ওসমানী সালতানাতেরও ছিলো। তাও আবার দু দিক থেকে। পূ্র্বে ছিলো তুর্কী মুসলিম সম্রাজ্য কিরাছী (Karasi) এবং কারমানিয়া (Karmania)। কারমানিয়া ছিলো তৎকালীন সবচেয়ে বড় মুসলিম সম্রাজ্য মামলুক সম্রাজ্যের সমর্থনপুষ্ট। মিশর, সৌদি আরব, ইসরাইল, ফিলিস্তিন এবং লেবানন ছিলো মামলুক সম্রাজ্যের অংশ। ওরহানের একটি হুমকি ছিলো তুর্কী মুসলিমদের সম্রাজ্যগুলো। দ্বিতীয় হুমকি ছিলো রোমানদের বাইজেন্টিন সম্রাজ্য। যা খুব শক্তিশালী ছিলো। অন্যান্য খ্রিস্টান সম্রাজ্যগুলোও যাকে সাহায্য করতো। সুলতান ওরহান দু দিক থেকেই যুদ্ধের আশংকায় ছিলেন। তারপর কীভাবে দু দিক থেকে শত্রুবেষ্টিত ওসমানী সালতানাত দু দিক থেকে বাইজেন্টিন সম্রাজ্যকে ঘিরে ফেললো। চলুন ওসমানীয় সালতানাতের দ্বিতীয় পর্বে এ সম্পর্কে জানা যাক।

আনাতোলিয়ায় বাইজেন্টিনরা নিয়ন্ত্রণ প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলো। কিন্তু তাও তাদের হাতে আনাতোলিয়ার কিছু দুর্গ এবং শহরের অধিকার ছিলো। ওরহান এসব শহর ও দুর্গ দখল করতে চাইছিলো যাতে তাঁর সম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং আনাতোলিয়া থেকে খ্রিস্টানরা যেন সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়ে যায়। তাই ওরহান বাইজেন্টিনদের দুর্গ এবং শহরগুলো অবরোধ করলো। বাইজেন্টিন সম্রাটের কাছে খবর পৌঁছালো যে, ওসমানীয়রা আনাতোলিয়ায় তাদের শেষ শহর ও দুর্গগুলো অবরোধ করেছে। ১৩২৮ সালে বাইজেন্টিন সম্রাট এন্ড্রিনোসাস (Andrinocus) ৪০০০ সৈন্য নিয়ে ওসমানীয়দের সাথে যুদ্ধ করতে রওনা হন। বাইজেন্টিন সম্রাট এই প্রথম ওসমানীয়দের সাথে যুদ্ধ করতে স্বয়ং আসছিলেন, তাই খবর বিদ্যুৎের গতিতে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। সুলতান ওরহানও বাইজেন্টিন সম্রাটকে আক্রমণ করার জন্য সৈন্য নিয়ে এগিয়ে যান। সুলতান ও তাঁর সৈন্যরা মালটেপের (Maltepe) উচুঁ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। সুলতান ওরহান পাহাড়ের ওপর লুকিয়ে পড়েন যাতে তিনি বাইজেন্টিন সম্রাটের সৈন্য বাহিনীকে দেখতে পান। সুলতানের ওরহানের সৈন্যরা দেখতে পেল যে, বাইজেন্টিন সম্রাটের নেতৃত্বে বাইজেন্টিন সৈন্যরা আসছে। ওসমানীয়রা পাহাড়ের আড়াল থেকে তীর বর্ষণ শুরু করলো। এই আচমকা হামলায় বাইজেন্টিন সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো। তারপর খবর ছড়িয়ে পড়লো বাইজেন্টিন সম্রাট মারা গেছেন। তখন বাইজেন্টিন সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে যায় এবং বাইজেন্টিন সৈন্যরা কনস্ট্যান্টিনোপল এর দিকে পালাতে শুরু করলো। বাইজেন্টিন সম্রাটও কোন রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল ফিরে গেল। ওসমানীয়দের ছোট সেনাবাহিনীর হাতে বাইজেন্টিনদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এর আগে বাইজেন্টিনরা ওসমানীয়দেরকে একটি যাযাবর সম্প্রদায় থেকে অধিক কিছু ভাবতো না। বাইজেন্টিনরা নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও দক্ষ সামরিক শক্তি মনে করতো। কিন্তু ওসমানীয়দের হাতে সম্রাটের নেতৃত্বে পরাজয়ের পর তারা তাদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করলো। বাইজেন্টিনরা আনাতোলিয়ায় তাদের অধিকারে থাকা শহর ও দুর্গগুলোতে রসদ এবং সাহায্য পাঠানো বন্ধ করে দিলো। এসব শহর ও দুর্গ ওসমানীয়রা অবরোধ করে রেখেছিলো। বাইজেন্টিনি সাহায্য না পেয়ে ঐ শহর ও দুর্গগুলো ওসমানীয়দের কাছে আত্নসমর্পন করলো। এভাবে ওসমানীয়রা বেথেনিয়ার সকল শহর ও দুর্গ বাইজেন্টিনদের থেকে দখল করে নিল।

ওসমানীয়দের বিজয় বাইজেন্টিনদের মনোবল ভেঙ্গে দিলো অন্যদিকে বাইজেন্টিনিদের সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতি ক্যানটাককোজিনাস (Kantakouzenus) বুঝতে পারলো যে, ওসমানীয়রা অসাধারণ যোদ্ধা। তাই ক্যানটাককোজিনাস বুদ্ধিমানের মতো ওসমানীয়দের সাথে যুদ্ধ করার পরিবর্তে ওসামানীয়দেরকে বন্ধু বানানোর সিদ্বান্ত নিলো। কারণ ক্যানটাককোজিনাস নিজে বাইজেন্টিন সম্রাট হতে চেয়েছিলো। কিন্তু না সে সম্রাটের ছেলে ছিলো আর না সে সম্রাটের কোন আত্নীয় ছিলো। ক্যানটাককোজিনাসকে সম্রাট হতে গেলে বিদ্রোহ করতে হতো। তাঁর জন্য ক্যানটাককোজিনাসের কনস্ট্যান্টিনোপলের ভিতর সৈন্যের দরকার ছিলো। যা তাঁর কাছে ছিলো। আর বাইরের দিক থেকে বাইজেন্টিনদের মোকাবেলা করতে ওসমানীয়দের সাহায্য প্রয়োজন ছিলো। ক্যানটাককোজিনাস এর নিকট ওসমানীয়দের চেয়ে ভালো কোন সাহায্যকারী ছিলো না। তাই ক্যানটাককোজিনাস ওসমানী সুলতান ওরহানের সাথে গোপন যোগাযোগ করলো। এর ফলে বাইজেন্টিনিদের সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতি ওসমানীয়দের বন্ধু হয়ে উঠলো। ক্যানটাককোজিনাস ওসমানীয়দের কাছে সাহায্য চাইলো এবং এর বিনিময়ে অনেক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ক্যানটাককোজিনাস তার মেয়ে থিওডোরার বিয়ে ওরহানের সাথে দেন। ক্যানটাককোজিনাস এবং ওসমানীয়দের বন্ধু শুরু হওয়ার সাথে সাথেই এই বন্ধুতের কঠিন সময় শুরু হলো।

১৩৪১ সালে বাইজেন্টিন সম্রাটের মৃত্যুর পর তাঁর ৯ বছর বয়সী ছেলে পঞ্চম জন(John V) সিংহাসনে বসলো। আর তখন ক্যানটাককোজিনাসও বিদ্রোহ করলো। ক্যানটাককোজিনাস বললো – আমাকেও বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের সম্রাট বানাতে হবে। না হলে আমি যুদ্ধ করবো। ৯ বছর বয়সী সম্রাট তো এসব বুঝতে পারছিলো না। কিন্তু সম্রাটের মা (Anna of Savey) ঠিকই বুঝতে পারলো যে, ক্যানটাককোজিনাস কাদের সাহায্যে এসব করছে। তাই সম্রাটের মা ওসমানীয়দের শত্রু মুসলিম সম্রাজ্য কিরাছীর সাহায্য প্রার্থনা করে। কিন্তু সম্রাটের মা কিরাছীদের কাছ থেকে তেমন কোন সাহায্য পান নি। বাইজেন্টিন সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলো। যেখানে ক্যানটাককোজিনাসকে ওসমানীয়রা সাহায্য করছিলো। আর বাইজেন্টিনি সম্রাটকে সার্বিয়া, বুলগেরিয়া এবং কিরাছী সম্রাজ্য সাহায্য করছিলো। ৬ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলার পর ক্যানটাককোজিনাসকে বাইজেন্টিনি সম্রাজ্যের শরীক সম্রাট বানানো হলো। গৃহযুদ্ধের ফলে সার্বিয়া স্বাধীন হয়ে গেল। বুলগেরিয়া বাইজেন্টিনি সম্রাজ্যের অনেক অঞ্চল দখল করে নিল। ফলে বাইজেন্টিনি সাম্রাজ্য অনেক ছোট হয়ে গেল। ওসমানীয়দের সাফল্য ছিলো বাইজেন্টিনি সম্রাজ্যের ভিতর পর্যন্ত তাদের প্রভাব পৌঁছানো। কিরাছী সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ওসমানীয়দের কাছে পরাজিত হতে থাকে। তারপর ওসমানীয়রা কিরাছী সাম্রাজ্যও জয় করে নেয়।

কিরাছী সাম্রাজ্য জয়ের পর ওসমানীয়রা দানিয়ুল প্রণালীর কাছে পৌঁছে যায়। যেখান দিয়ে ইউরোপ জয় করা সম্ভব। ইউরোপ জয় করার দুটি পথ ছিলো। একটি হলো কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করে ইউরোপ যাওয়া। যা তৎকালীন সময়ে প্রায় অসম্ভব। অন্যটি হলো দানিয়ুল প্রণালী। যা পার হলেই ওসমানীয়রা পৌঁছে যাবে ইউরোপে। ওসমানী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান গাজী ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর দানিয়ুল প্রণালীতে পৌঁছে ওসমানীয়রা সেই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করার অবস্থানে পৌঁছে গেল। কিন্তু দানিয়ুল প্রণালী এবং ইউরোপের মাঝখানে ছিলো সমুদ্র। আর ইউরোপীয় খ্রিস্টানরাও কোন ভাবেই ওসমানীয়দের ইউরোপে প্রবেশ করতে দিতে চাইছিলো না। তাই ইউরোপে যাওয়া ওসমানীয়দের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিলো। কিন্তু বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। এমন একটি ঘটনা ঘটলো যা বিনা রক্তপাতে ওসমানীয়দের ইউরোপে পৌঁছে দিল। ১৩৫২ সালে ক্যানটাককোজিনাস তাঁর ছেলেকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করতে চাইলে ক্যানটাককোজিনাস এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। তাই ক্যানটাককোজিনাস আবারও সুলতান ওরহানের কাছে সাহায্য চাইলো। সুলতান ওরহান বললো – তোমাকে সাহায্য করার বিনিময়ে আমি ইউরোপে দানিয়ুল প্রণালীর ওপারে গ্যালিপুলিতে (Galipoli) একটি সামরিক ঘাঁটি বানাতে চাই। তখন ক্যানটাককোজিনাস এর দরকার ছিলো সুলতান ওরহানের সাহায্য। তাও আবার ইউরোপে। ফলে ক্যানটাককোজিনাস সুলতান ওরহানের প্রস্তাব মেনে নিলো। সুলতান ওরহান তাঁর ছেলে সুলেমানের নেতৃত্বে এক বিশাল সেনাবাহিনী ইউরোপ পাঠান। এভাবে ওসমানীয়রা বিনা রক্তপাতে দানিয়ুল প্রণালী পার হয়ে ইউরোপে পৌঁছে গেল।

ওসমানীয়রা গাজা করতো। মানে অমুসলিম অঞ্চলগুলোকে মুসলিম ওসমানীয়দের শাসনের অধীনে নিয়ে আসতো। তো সুলতান ওরহানের ছেলে সুলেমান গ্যালিপুলিতে সামরিক ঘাঁটি বানিয়েই ক্ষান্ত না হয়ে থ্রেসের পূর্বাংশ দখল করে নেন। এর ফলে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মনে বিপদ সংকেত বাজতে থাকে। ইউরোপীয়রা ওসমানীয়দের ইউরোপে শক্তিশালী হতে দেখছিলো। যা ক্যানটাককোজিনাস এর কর্মফল। ক্যানটাককোজিনাস এর ওপর ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের চাপ বাড়তে থাকে। বাধ্য হয়ে ক্যানটাককোজিনাস সুলতান ওরহানকে বললো – ওসমানীয়রা ইউরোপের অঞ্চল দখল করতে পারে না। দখলকৃত অঞ্চল ওসমানীয়দের ফেরত দিতে হবে। হয় শুধু সামরিক ঘাঁটি থাকবে ওসমানীয়দের। আর না হয় ওসমানীয়রা ইউরোপ থেকে বিদায় নেবে। এর জবাবে সুলতান ওরহান ক্যানটাককোজিনাসকে বার্তা পাঠান যে – অমুসলিমদের সেসব এলাকা যা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে গেছে তা আর কখনো ফেরত দেওয়া হবে না। এভাবে চিরদিনের মতো ওসমানীয়রা গ্যালিপুলি এবং থ্রেসের পূর্বাংশ দখল করে নেয়। যা আজও তুরস্কের অংশ। ইউরোপে ওসমানীয়দের প্রবেশ করতে দেওয়ার কারণে ক্যানটাককোজিনাসের বাদশাহী শেষ করে দেওয়া হয়। নতুন বাইজেন্টিন সম্রাট ওসমানীয়দের বন্ধু নয় প্রকাশ্য শত্রু ছিলো। তারপর ১৩৬২ সালে সুলতান ওরহানের মৃত্যু হয়। সুলতান ওরহান একজন সফল শাসক ও বিজেতা ছিলেন। যিনি তাঁর বাবার রাজ্যকে একটি সাম্রাজ্যতে পরিণত করেন। যা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বড় ছিলো। সুলতান ওরহানের মৃত্যুর পর সুলতান ওরহানের তিন ছেলের মধ্যে যে কোন নতুন সুলতান হওয়ার কথা।

সুলতান ওরহানের ছেলে সুলেমান মারা গিয়েছিলেন। তাই বাকী থাকে দুজন ছেলে। মুরাদ গাজী এবং খলিল গাজী। মুরাদ গাজী খলিল গাজীকে হত্যা করে ওসমানী সালতানাতের নতুন সুলতান হন। সুলতান প্রথম মুরাদ। সুলতান মুরাদ সিংহাসনে বসেই গাজা বা অমুসলিম অঞ্চল জয় করে সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেন। সুলতান মুরাদ সেনাবাহিনীতে একটি নতুন বিভাগ তৈরি করেন। আর তা হলো গোলাম বা দাসদের সেনাবাহিনী। এই গোলামদের সেনাবাহিনী কী? এবং এটা কেন তৈরি করা হয়েছিলো। ইনশাল্লাহ আমরা এ সম্পর্কে জানবো কিন্তু আগামী পর্বে।
(চলবে…)

তথ্যসূত্রঃ

The Ottoman Empire – DSJ DSJ Maps
A History Of The Ottoman Empire by Ottoman Empire by Douglas A  Howard
History Of The Ottoman Empire And Modern Turkey by Stanford Shaw
Between Two World The Construction Of The Ottoman State by Camel  Kafadar

আগের পর্ব-ওসমানী সালতানাতের যতকথা (পর্ব-০১)

লেখকঃ কলাম লেখক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক।

আরও পড়ুন