বাঙলা ভাষার উৎস পরিচয়

রেজওয়ান আহমেদ

বাঙলা ভাষার জীবনকাল তিনভাগে বিভক্ত। আদি, মধ্য এবং আধুনিক কাল। আমরা জানি ‘চর্যাপদ’ আদিযুগের বাঙলার প্রথম নিদর্শন। আবার ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ মধ্যযুগের বাঙলার প্রথম নিদর্শন। দুটো নিদর্শন দুবছরের ব্যবধানে পাওয়া যায় এবং এর কিছুদিন পর দুটোই প্রকাশিত হয় গ্রন্থাকারে।

বৌদ্ধ সহজিয়া মতাদর্শিক গীতিকবিগণ চর্যাপদের কবি। তাঁদের ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক যে পালি ভাষায় রচিত হয়েছে, বলা হয়ে থাকে সেই পালি এবং প্রাকৃত ভাষার মধ্য দিয়ে বাঙলা ভাষার উদ্ভব।

এবার মধ্যযুগের প্রসঙ্গে আসি। ১২০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময়কাল মধ্যযুগ বলে সূচিত। আধুনিক বাঙলা ভাষায় তুর্কি, ফারসি, আরবি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি প্রভৃতি বিদেশি ভাষার শব্দ অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙলা শব্দভাণ্ডার। এসব শব্দ কী করে এলো বাঙলায়? মধ্যযুগের সূচনাকালে মুসলমান শাসকদের বাঙলায় অনুপ্রবেশের পথটা ছিল তুরস্ক থেকে ইরান হয়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং সবশেষে ভারতের ভেতর দিয়ে এই পূর্ববঙ্গ। পরে মধ্যযুগের শেষের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ শাসকরাও এদেশে ব্যবসার নাম করে এসে ক্ষমতা দখল করে বসে। রাজনৈতিকভাবে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হলেও এ ব্যাপারটা আদতে আজকের বাঙলা ভাষার জন্য বিশাল একটা সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। বলা যায়, বিদেশী শাসকদের অনুপ্রবেশই বিদেশী শব্দগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে বাঙলায়। প্রসঙ্গত বাঙলা ভাষার শব্দভাণ্ডার প্রধানত এ সকল বিদেশি ভাষার শব্দ দিয়েই বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। মূলবিচারে ‘বাঙলা শব্দ’ আমাদের শব্দভাণ্ডারে একটিও আছে কিনা তা গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ এবং মজার একটি বিষয় হতে পারে বলে আমার ধারণা।

ভাষাবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অসংখ্য ভাষার পাঠ সহজীকরণের উদ্দেশ্যে সকল ভাষাকে বিভিন্ন ভাষাবংশ বা ভাষাপরিবারে বিভক্ত করেন। আমাদের প্রাণের ভাষা বাঙলা তেমনি একটি ভাষাবংশের সদস্য। তুরস্কের মুসলমানদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আগেই। এই সাম্রাজ্যের অর্ধেক পড়েছে এশিয়ায়, বাকি অর্ধেক ইউরোপে। দেখা যায়, ইউরোপ এবং এশিয়ার বেশ কিছু ভাষায় ধ্বনিগত ও শব্দগত গভীর মিল। যেমন গ্রিক podos থেকে ইংরেজি foot, সংস্কৃত পদ, বাঙলা পা। খেয়াল করলে দেখা যায় /প/ = p এবং f = pʰ – এরা উচ্চারণ স্থানের বিচারে ওষ্ঠ্যব্যঞ্জন। আবার d, t মুর্ধন্যব্যঞ্জন, /দ/ = d̪ দন্ত্যব্যঞ্জন। কোনো কোনো ভাষাজোড়ে মুর্ধন্যব্যঞ্জন এবং দন্ত্যব্যঞ্জন দিয়ে পরস্পরের ধ্বনিগত পার্থক্য মেটানো সম্ভব। যেমন ইংরেজি, গ্রিকসহ ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে মুর্ধন্যধ্বনি দিয়ে দন্ত্যধ্বনির প্রয়োজন মেটাতে হয়। কারণ ঐ সকল ভাষায় d, t ধ্বনিদ্বয় থাকলেও /দ/, /ত/ এর মতো দন্ত্যব্যঞ্জন নেই। অবশ্য আন্তর্জাতিক ধ্বনিতাত্ত্বিক বর্ণমালা এ সকল গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করেছে।

ত, এশিয়া এবং ইউরোপের এ ভাষাগুলোর প্রচলন যেখানে সে অঞ্চলটি পূর্বে-পশ্চিমে যথাক্রমে ভারত-ইউরোপ দ্বারা সূচিত। ভাষাবিজ্ঞানীরা তাই এই ভাষাগুলোকে ভারতী-ইউরোপীয় বা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশে স্থান দেন। একসময় এগুলোকে আর্যভাষাও বলা হতো। আর্যভাষার কয়েকটি শাখার একটি হচ্ছে ভারতীয় আর্যভাষা, যার প্রাচীন ভাষাগুলো প্রাচীন ভারতীয় আর্য হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার নমুনা বিভিন্ন বেদগ্রন্থের মন্ত্রে পাওয়া যায়। তাই একে বৈদিক ভাষাও বলা হয়। এই ভাষা সময়ের সাথে মানুষের মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়। ক্রমে দুর্বোধ্য ভাষায় পরিণত হয় বৈদিক ভাষা। বেদের এই ভাষাকে পরবর্তীতে সংস্কার করে যে মানভাষা তৈরি করেছিলেন তখনকার ব্যাকরণবিদেরা, সেটিই সংস্কৃত ভাষা। লিখতে-পড়তে মানুষ সংস্কৃত ব্যবহার করলেও কথা বলতো প্রাকৃত ভাষায়। এখন যেমন প্রমিত ভাষারীতি বইয়ে এবং আনুষ্ঠানিক পরিবেশে সমধিক প্রচলিত হলেও দৈনন্দিন পরিবেশে সকলে আঞ্চলিক বা বিশুদ্ধ মাতৃভাষা (যে ভাষা শিশু জন্মের পর প্রথম মায়ের মুখে শোনে, এটি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপের বাঙলা হতে পারে) ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

বৈদিক, সংস্কৃত এবং প্রাকৃত – ভারতীয় আর্যভাষার এই তিনটি স্তরের মধ্যে বৈদিক এবং সংস্কৃত ভাষাদ্বয়ের বিকাশ ঘটেনি আর। কিন্তু প্রাকৃত ভাষা মানুষের মুখে মুখে এবং লিখিতরূপে বিকশিত হতে হতে পৌঁছায় শেষ স্তরে, যাকে অবহট্ট বা অপভ্রংশ বলে সূচিত করা হয়। অপভ্রংশ বলতে বিকৃত হয়ে যাওয়া ভাষা বোঝানো হয়। এই বিকৃত ভাষারাশি থেকেই বাঙলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, পাঞ্জাবি প্রভৃতি আধুনিক ভাষা এসেছে।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, একটি অপভ্রংশের নাম মাগধী অপভ্রংশ যা তিনটি শাখায় বিভক্ত‌ – পূর্ব, মধ্য এবং পশ্চিম মাগধী অপভ্রংশ। অর্থাৎ তিনি মূলত জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের মতানুসরণ করেছেন। আমরা এখন দেখি বাঙলার সাথে অহমিয়া আর ওড়িয়া ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। শেষোক্ত ভাষা দুটিও পূর্ব মাগধী অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত। মাগধী অপভ্রংশের অন্য দুটি শাখা থেকে আসা মৈথিলি, মগহি ও ভোজপুরির সাথেও এরূপ কিছু মিল পাওয়া যাবে বাঙলার।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতটি অধিক সমর্থিত হলেও বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন। প্রাথমিকভাবে কেন্তুম এবং শতম নামে দুটি শাখায় বিভক্ত আর্যভাষার উচ্চারণ বিশ্লেষণে দেখা যায় বাঙলা এসেছে শতম শাখা থেকে। শতমের শ-কারপ্রাধান্য এবং তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের প্রয়োগে জ্ঞানতাপস দেখিয়েছেন যে বাঙলা ভাষা গৌড়ী প্রাকৃত থেকে এসেছে, মাগধী প্রাকৃত থেকে নয়। বলাবাহুল্য তাঁর এ মতের গ্রহণযোগ্যতা কম।

৭ জুলাই ২০১৯, মিরপুর, ঢাকা।
আপডেট ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, মিরপুর, ঢাকা।

(লেখক –
শিক্ষার্থী-গবেষক,
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়)

তথ্যসূত্র –

১. কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী – হুমায়ুন আজাদ

২. চর্যাপদের উৎসভূমি – ড. মোহাম্মদ আমীন

৩. বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত – ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

৪. বাংলাদেশের ভাষা-পরিকল্পনা পর্যালোচনা ও প্রস্তাব – জাহাঙ্গীর আলম জাহিদ

৫. কুমারখালীর ভাষার সামাজিক স্তর বিন্যাস – জাহাঙ্গীর আলম জাহিদ

(ছবি – অন্তর্জাল)

আরও পড়ুন