আফগানিস্তানের তুলনায় সুইজারল্যান্ডের ইতিহাস লেখা ঢের সোজা

জানার কোনো শেষ নেই। নিতান্তই সস্তা একটি শব্দ। তবে সস্তা দামেও ভালো কিছু পাওয়া যায়। এতে একটু জুতার সুকতলা ক্ষয় করতে হয় এই আর কি! অর্থনীতির ভাষায় এটাকে সুকতলার অর্থনীত বলে। যাই হোক সস্তা হলেও এই কথাটার মূল্য অনেক বেশি। গত কয়েকদিন ধরে একটি দেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। সমস্যা হয়েছে যতই পড়ছি ততই গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। একের পর এক ঘটনার আগমন ঘটছে। প্রতিটি ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে এর খুঁটনাটি জানতে চেষ্টা করছি। এর ব্যতয় ঘটলে আজকাল মন তৃপ্ত হয় না।

আলোচ্য দেশটির নাম আগগানিস্তান। এই দেশটি সম্পর্কে অল্পস্বল্প জানলেও বিস্তর জানাশোনা আমার নেই। অথচ এই দেশটি আমাদের ইতিহাসের নানা প্রকরণের সাথে মিশে আছে। সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসের চাপে পিছনের সমৃদ্ধ ইতিহাস চাপা পড়ে গেছে। এ নিয়ে খুব বেশি আলাপই পাওয়া যায় না। অথচ দেশটির প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ সুরের গান শুনিয়ে যায়।

১৯৭৩ সালের পর থেকে বর্তমান সময়ের ইতিহাস আফগানিস্তানের জন্য বিষাদময় কাব্য বললেও ভুল হবে না। অথচ দেশটি সাম্রাজ্যবাদীদের গোরস্থান নামে পরিচিত। ব্রিটিশদের কাছে দেশটি ‘বিষাক্ত পানীয়’, সোভিয়েতদের কাছে ‘রক্তাক্ত ক্ষত’ বলে চিহ্নিত হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও দেশটির নাম বিশেষভাবে জায়গা করে নিবে সন্দেহ নেই।

 

প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত জানার আগে আজ প্রাথমিক পাঠ হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ বইটি সহায়ক একটি গ্রন্থ হতে পারে৷ বইটিতে উল্লখিত তথ্য গভীর ও বিস্তৃত জানার অনেকগুলো পথের সন্ধান দিবে। আফগানিস্তান ভ্রমণের চিত্রই বইটির বিষয়বস্তু। বইটিতে আফগানিস্তান নিয়ে হরেক রকম তথ্য আছে। আজকের লেখায় বইটি থেকে আফগানিস্তান বিষয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরছি।

আফগানিস্তানে প্রাচীন অনেক সভ্যতায় বিকাশ লাভ করেছিল। মেসোপটেমিয়া, গ্রীক, পারস্য, সিন্দু সভ্যতার যুগ পেরিয়ে আধুনিক কালে আরব সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছে। বুঝতেই পারা যায় দেশটির ইতিহাসের আকার কত বৃহৎ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল দেশটির পূর্নাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয়নি। মুজতবা আলী দেশটির ইতিহাসকে ‘অরক্ষণীয়া কন্যা’ র সাথে তুলনা করেছেন। আবার দেশটির ইতিহাস রচনাকে কঠিন বলেও মন্তব্য করেছেন।

কঠিন বলার কারণটা তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দেশটির উত্তরভাগের বলখ-বদশখানের ইতিহাস তার সীমান্ত নদী আমুদরিয়ার ওপারের তুর্কিস্থানের সঙ্গে, পশ্চিমভাগ অর্থাৎ হিরাত অঞ্চল হিরাতের সঙ্গে, পূর্বভাগ অর্থাৎ কাবুল, জালালাবাদ ভারতবর্ষ ও কাশ্মীরের সঙ্গে মিশে নানা যুগে নানা রঙ ধারণ করেছে।’

আফগানিস্তানের ইতিহাস না জেনে ভারতবর্ষের ইতিহাস লেখবার জো নেই, আফগান রাজনীতি না জেনে ভারতের সীমান্ত প্রদেশ ঠাণ্ডা রাখার কোনও মধ্যমনারায়ণ নেই।’ লেখকের এই মন্তব্য যে কতটা প্রাসঙ্গিক বর্তমান সময়েও তা বুঝতে পারা যায়।

আবার বইটিতে লেখক বলেছেন, ‘আফগানিস্তানের প্রাচীন ইতিহাস পোঁতা আছে সে দেশের মাটির তলায়, আর ভারববর্ষের পুরাণ মহাভারতে। ইতিহাস গড়ার জন্য মাটি খুঁড়ার ফুসরত আফগানের নেই, মাটি যদি সে নিতান্তই খোঁড়ে তবে সে কাবুলি মন-জো-দড়ো বের করার জন্য নয়-কয়লা খনি পাওয়ার আশায়।’

আসলেই তো ইতিহাস রচনার ফুসরত আফগানিদের নেই। দশকের পর দশক জুড়ে দেশটি যুদ্ধ করেই যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পিদের প্রাচুর্য দেশটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরাশক্তিগুলোর দেশটিকে নিয়ে আগ্রহের কারণ যে এই সম্পদ তা সহজেই অনুমেয়। জানিয়ে রাখি, আফগানিস্তানকে বলা হয়, ‘The Saudi Arabia of Lithium‘.

আফগানদের ফুরসত না থাকায় ভারতীয় পণ্ডিতরা ইতিহাস রচনায় আফগানের কথাই ওঠান না। তারা বাবর নিয়ে আলাপ করলেও আফগানদের কথা বলেন না। অথচ বাবর হিরাত থেকে গৌহর শাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান শিল্পকলা টবে করে নিয়ে এসে দিল্লীতে পুঁতেছেন। বলে রাখি, রাখি গৌহর শাহ তৈমুর লং এর পুত্রবধু ছিলেন। সেই সময় হিরাত মধ্য এশিয়ার সর্বকলাশিল্পের মরুদ্যান ছিল।

লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি বলা হয় আফগানরা মুসলমান হয়ে গেল বলে তাদের জন্য অন্য ইতিহাস, তা হলে বলি, তারা একদিন অগ্নি উপাসনা করেছিল, গ্রিক দেব দেবীর পূজা করেছিল, দেববিরোধী বৌদ্ধধর্মও গ্রহণ করেছিল। তবুও যখন দুই দেশের ইতিহাস পৃথক করা যায় না, তখন তাদের মুসলমান হওয়াতেই হটাৎ কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল।’

বহু যুগ ধরে ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তান নানাভাবে পরস্পর যুক্ত ছিল, পারস্যের সাথেও কোনো সীমান্তভূমি ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলগুলোর সাথে আফগানিস্তানের ইতিহাসের গভীর যোগ আছে তা বুঝতে পারা যায়। মৌর্য পূর্ববর্তী যুগ থেকে শুরু করে মোঘল সাম্রাজ্যের পুরো সময় জুড়ে ভারতবর্ষের প্রতিটি ঘটনায় আফগানিস্তানের সংযোগ রয়েছে। সিকান্দার শাহের সিন্দু জয়, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য প্রতিষ্ঠা, বৌদ্ধধর্মের প্রসারের জন্য অশোক কর্তৃক মাধ্যন্তিক নামক শ্রমণকে আফগানিস্তানে প্রেরণ, শক ও ইন্দো-পার্থিয়ান্দের যুদ্ধ, সেন্ট টমাসের দ্বারা হিন্দুদের খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ, কুষান সাম্রাজ্যের উত্থান, গান্ধার শিল্পের বিকাশ, ফা হিয়েনের ভারতবর্ষ ভ্রমণ, হুণ ও আফগানদের সংমিশ্রণে রাজপুত বংশের সূত্রপাত, হিউয়েন সাং এর ভারত ভ্রমণ, ইয়াকুব বিন লায়েরসে কাবুল দখল, আফগানিস্তানের শেষ হিন্দু রাজার কাশ্মীরে আগমন, মাহমুদ, আল বিরুনী, আমীর খসরু সহ সর্বশেষ আমানউল্লা পর্যন্ত নানা ঘটনার মাঝেই রয়েছে আফগানিস্তানের ইতিহাস।

 

এসব কারণেই হয়ত লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘ আফগানিস্তানের তুলনায় সুইজারল্যান্ডের ইতিহাস লেখা ঢের সোজা- যদিও সেখানে তিনটে ভিন্ন জাত আর চারটে ভাষা।’

এমন কঠিনতর ইতিহাস নিয়ে আলাপ করার আগে নিজের জ্ঞান বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেই নিমিত্তে পাঠকর্ম চালিয়ে যাচ্ছি। প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি লেখা তৈরির ইচ্ছা জাগিয়ে রাখছি।

আরও পড়ুন