আমার শাশুড়ি

এরাবি জান্নাত ঝর্ণা

বউ-শ্বাশুড়ি সম্পর্ক আমাদের সমাজে সবচেয়ে আলোচিত যত সম্পর্কগুলোর একটি। এই সম্পর্কটাকে কেন জানি সবাই বেশ জটিল বলে মনে করে। কিন্তু আসলেই কি এটি জটিল সম্পর্ক?
আমি মনে করি না। এটি হতে পারে একটি মধুর সম্পর্ক। কিভাবে? আমি নিজের উদাহরণ দিয়েই বলি।

আমার শ্বাশুড়ি; অত্যন্ত সহজ-সরল এবং খুবই গোছানো একজন নারী। আমি উনাকে দেখে প্রায়ই মুগ্ধ হই। ভাবি, কীভাবে উনি এত বড় সংসারটাকে একা হাতে সামলাচ্ছেন!
উনি যেদিন আমাকে প্রথম দেখতে আসলেন আমার মায়ের বাসায়, সেদিন আমি একটুও সাজগোজ করিনি। এটা আমি ইচ্ছে করেই করেছি। কারণ আমি চেয়েছিলাম আমার সাধারণ রূপটাই উনার চোখে পড়ুক‌। পছন্দ হবার মত হলে উনি এভাবেই আমাকে পছন্দ করবেন। আমাকে উনি দেখলেন, আর সাথে সাথেই বলে ফেললেন, “হায় হায়! তুমি তো দেখি একটু লিপস্টিকও লাগাওনি!” এটা বলেই উনি হাসতে লাগলেন। তখনই বুঝেছিলাম উনি মনের দিক দেখে একদম সরল। মনে যা আসে তা-ই মুখে প্রকাশ করে ফেলেন।

আমাদের ফ্যামিলির অলরাউন্ডার আমার শ্বাশুড়ি। সেটা আমার শ্বশুরও স্বীকার করেন। কেননা উনি একা হাতে সংসারকে যেভাবে পরিচালনা করছেন তা সত্যিই অভাবনীয়। প্রয়োজনে তাৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দ্রুতগতিতে সংসারের কাজ সম্পাদন, নিখুঁত পরিকল্পনা এগুলোতে আমার শ্বাশুড়ি একদম পারফেক্ট। এগুলো দেখে আমি ভাবি, উনি না থাকলে আমি কিভাবে এই সংসারটাকে সামলাবো! আমি কখনোই উনার মতো হতে পারবোনা। এই নিয়ে প্রায়ই আমি আমার হাজবেন্ট এর সাথে কথা বলি। এগুলো ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে জল চলে আসে প্রায়ই।

আমি আমার মা কে রেখে এসেছি। আর এখানে আমার আরেক মা কে পেয়েছি। হ্যা, উনার প্রতি আমি আমার মায়ের মতোই ভালবাসা অনুভব করি। বিয়ের তিন বছর পার হলেও এখনও আমাকে রান্নার ভার দেননি। উনি একা হাতেই সব রান্না করেন আর আমি সাহায্য করি। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় যখন বেবি পেটে আসলো তখন উনার খুশি দেখে কে! পারেনা আমাকে মাথায় তুলে নাচতে। প্রেগন্যান্সির পুরোটা সময় উনি আমার মায়ের মতোই আমার পাশে থেকেছেন, আদর যত্ন করেছেন। কোনো কাজ করতে দেন নি। আমি একটু অসুস্থ ফিল করলেই উনি উঠে পরে লাগতেন কিভাবে আমাকে সুস্থ রাখা যায়। মানসিকভাবেও উনি আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছেন। সাহস দিয়েছেন। অবশেষে নাতির মুখ দেখে উনি তো মহাখুশি! এখন তো সারাক্ষণই শুধু নাতি আর নাতি!

আমার শ্বাশুড়ি স্বভাবে অনেকটা বাচ্চাদের মত। বাচ্চারা যেভাবে আনন্দ প্রকাশ করে,কোনো জিনিসের আবদার করে ঠিক তেমনই হচ্ছেন আমার শ্বাশুড়ি। ছোট ছোট ব্যাপারে উনি এতো উৎসাহ প্রকাশ করেন যে মাঝে মাঝেঝে দেখে আমি সত্যিই অবাক হই। উনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করেন। কিছুদিন পরপরই একেকটা বায়না নিয়ে হাজির হন আমার শ্বশুড়ের কাছে। আমার শ্বশুরও এমন বায়না ফেলতে পারেন না কিছুতেই।

আমার শ্বাশুড়ি উনার অতীত জীবনের গল্প করতে খুব পছন্দ করেন। আমি মাঝে মধ্যে উনার কাছে ইচ্ছে করেই আগের কোনো ইতিহাস বা ঘটনা জানতে চাই। উনি তখন এতো আগ্রহ নিয়ে বলা শুরু করেন যে, দেখে আমার খুব মায়া হয়। কত কষ্ট করে আমার শাশুড়ি এই সংসারের হাল ধরে রেখেছেন! উনার ইতিহাস শুনে আমি নিজে অনেক কিছু শিখতে পারি‌। তাই সময় বের করে উনার সাথে প্রায়ই এসব নিয়ে গল্প করি। এমনও হয়েছে যে একই ঘটনা উনার মুখ থেকে একাধিক বার শুনেছি। তবুও প্রতিবার যেভাবে উনি আগ্রহ নিয়ে গল্প করেন তা দেখে আমি একটুও বিরক্ত হই না। বরঞ্চ আমারও আগ্রহ হয় খুব।

আমার শ্বাশুড়ি যদি কোনোদিন অসুস্থ হয়ে পরেন তাহলে আমার মনটা খুবই খারাপ হয়। আমার মা যেমন অসুস্থ হলে আমার মন খারাপ হয় ঠিক তেমনই। রান্নার ভার, সংসারের ভার সাময়িকের জন্য হাতে পেয়ে আমি হিমশিম খাই। তখন বুঝি উনাকে ছাড়া আমি কতটা অসহায়।

কেউ যদি আমার শাশুড়িকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে সেই কষ্টটা আমার নিজের ফিল হয়। আম্মু কখনোই অন্যের কটু কথায় কষ্ট পান না ঠিক। খুব সহজেই মেনে নেন। কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না। কারণ আগেই বলেছি, তিনি হচ্ছেন একজন সহজ সরল মহিলা। কিন্তু আমি তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।

আমি জানিনা কোনো পুত্রবধু তার শ্বাশুড়ির জন্য এমনটা ফিল করে কিনা। তবে আমি মনে করি যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো পুত্রবধূ তার শ্বাশুড়ির কষ্ট নিজে অনুভব করতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে বউ-শ্বাশুড়ির সুমধুর সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হবে না।

আমি আশা করি এই শ্বশুড়ি দিবসের জন্য হলেও সকল পুত্রবধুরা যেন তাদের শ্বাশুড়িদের ভালো দিকটা নিয়ে ভাবেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক

আরও পড়ুন