আমিও কি ডাইনি মা?!

কামরুন নাহার মিশু

আজ কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপে। অনেকের ব্যক্তিগত টাইম লাইনে ‘ ডাইনি মা ‘ নামে সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটা গল্প ঘুরছে।

গল্পটা আমিও কয়েকবার পড়েছি। যতবার পড়েছি, ততবারই মনে হয়েছে গল্পের ঐ ডাইনি মা চরিত্রটি আমি নয়তো! বা আমার কাহিনী নিয়ে কেউ গল্প লিখেনি তো!

ঐ মহিলার সাথে সংঘটিত সমস্ত ঘটনাই আমার সাথে ঘটেছে। কীভাবে যে নিজেকে কন্ট্রোল করেছি, আজও চোখ বন্ধ করে ভাবতে গেলে ঐ সময়গুলো আমার কাছে বিভিষিকা মনে হয়।

আমার হুমাইরা সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক একটা বাচ্চা। স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই তার জন্ম হয়েছে। আমি এত শক্ত সামর্থ্য ছিলাম যে,পুরো জন্ম প্রক্রিয়ায় আমার পূর্ণ সেন্সে হয়েছে। আমি লেবার রুম থেকে কারো সহযোগিতা ছাড়া হেঁটে কেবিনে গিয়েছি। আমার সাথে রাতে থাকা সহযোগী মহিলাটা সারারাত ঘুমিয়েছে। আমি একা একাই ওয়াশরুমে গিয়েছি। নিজের সমস্ত কাজ নিজেই করেছি।

ঠিক মতো বুকের দুধ টেনে খেয়েছে, প্রশ্রাব -পায়খানা করেছে, ঘুমিয়েছে, কেঁদেছে -হেঁসেছে, খেলেছে।

হঠাৎ করে হুমাইরার ১১দিন বয়সে নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছে। সাতদিনের ইনজেকশানের কোর্স কমপ্লিট হওয়ার পর ও সুস্হ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সে আর কোনদিন বুকের দুধ জিব দিয়ে চেখেও দেখেনি।

তাকে কৌটার দুধ খাইয়েছি। মেয়েটা সারাদিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা কান্না করতো। জেগে থাকলে কিছু খেতো না। তাকে এক ঘণ্টা কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে হতো। তারপর ঘুমের ভেতর ফিডার খেতো। এভাবে তিন বছর। শুধু কোটার দুধ খেয়ে ও তিন বছর ছিল।

একটু চিপস ও মুখে দিতো না, একটা মুড়িও না। ও স্বাভাবিক খাবার খাওয়া বুঝতো না। এবার মোবাইল দেখিয়ে ওকে খাওয়ানো শুরু করলাম। এক চিমটি সাদা ভাত খাওয়াইতে এক ঘণ্টাও লেগে যেতে।

সাথে বোনাস হিসাবে বমি তো আছেই। এত বেশি বমি ও করেছে। এক ঘণ্টা হেঁটে ঘুম পাড়িয়ে, আধা ঘণ্টা ধরে খাওয়ালে ও ঠাস করে বমি করে দিতো। দিনে দশটা বিছানা চাদরও পাল্টিয়েছি। সারাদিন কাজের মেয়েটা শুধু হুমাইরার কাপড় ধুতো।

ওর বমির পরিমান আন্দাজ করার একটা উদাহরন হলো। ওর বমি মোটামুটি কন্ট্রোল হওয়ার পর একদিন দেখলাম দুটো তোসক, একটা জাজিম, একটা খাটের চাহনি সাথে মেজে পর্যন্ত স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।

রাতের দশটা থেকে ওকে পায়ে দোলানো শুরু করতাম একটা সময় আমি ঘুমিয়ে যেতাম কিন্তু ও ঘুমাতো না। আমার পা নাচানো বন্ধ হলেই ও কান্না শুরু করতো। ওর ঘুম গভীর হয়েছে ভেবে পা থেকে আলতো করে নামালেও ও আবার কান্না শুরু করতো। টানা তিন বছর দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।

সাথে যোগ হলো হুমাইরা কোনো কথা বলতে পারতো না। ওকে স্বাভাবিক বাচ্চার মতো বড়ো করব না-কি কথা বলা শেখাব কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।

ওর পাঁচমাস বয়সে তো পুনরায় কন্সিভ করলাম। ছেলেকে নিয়ে যে কীভাবে নয় মাসের জার্নি পার করলাম জানি না। অনেক সময় দিনের বারোটার সময় মনে পড়তো আমি তো সকালের খাবারই খাইনি।
কোথায় ঘুম, কোথায় গোসল, কোথায় খাবার জানি না। আমার সব চিন্তা চেতনা জুড়ে শুধু হুমাইরা।

একটা সময় আবিষ্কার করলাম। হুমাইরার আব্বুর সাথে আমার যোজন যোজন দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তার দিকে কখনো ফিরেও তাকাতে পারিনি। আমার ওজন বেড়ে এক লাফে পঁঞ্চাশ থেকে পঁচাত্তর হয়েছে। চোখের নিচে কালি, চুলে ঝট, শরীরে মেদ।

আমি ঘরের বউ হয়েও সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। কে রান্না করে, কে পরিবেশন করে, কে খায় আমি জানি না। আমার একটাই কাজ শুধু হুমাইরাকে দেখা। নিয়ম করে খাওয়া।

হুমাইরার জন্য আমি এত কষ্ট করেছি যে হুমাইরার জন্য আমার ভেতর কোনো মমতা কাজ করতো না। আমি শুধু রুটিন পালন করতাম। মাশাল্লাহ, ও এত মিষ্টি বাচ্চা ছিল। যে নিষ্ঠুর কোনো মানুষের হৃদয়ও কেড়ে নিতে পারত। ওকে আদর না করে কেউ যেতে পারত না।

হুমাইরা কান্না করলে আমার বুকের ভেতর কোনো তোলপাড় হতো না। শুধু ওর দাদুর ভয়ে কান্না করতে দিতাম না। একদিন ফিডার খায় না দেখে টেনে হাত ভেঙে দিয়েছি। হাত ফুলে লাল হয়ে গিয়েছে। আমি ঘরের সবার কাছে অস্বীকার করলাম। বললাম নতুন বসা শিখেছে তো হয়তো উল্টোভাবে পড়ে হাতে চোট পেয়েছে।

সাথে তাবিজ কবজ, পানি পড়ার অত্যাচার তো আছে।ওর বাবা, জেঠু কোথায় কোথায় গিয়ে পাঁচ হাজার, দশ হাজার টাকা কন্ট্রাক্ট করে তাবিজ নিয়ে আসতো। আমার রুমের দরজা- জানালায় তাবিজ ঝুলতো, হুমাইরার গায়ে ঝুলতো, আমার গায়ে ঝুলতো।
ওরা ভেবেছে জিন- পরির কোনো আলামত আছে। নাহলে একটা সুস্হ বাচ্চা এত কান্নাকাটি কেন করছে!

ওরা চলে গেলে আমি আস্তে করে তাবিজ ফেলে দিতাম। এই তাবিজকে কেন্দ্র করে হুমাইরার আব্বুর সাথে কত মনকষাকষি।

এবার ছেলের কথায় আসি। ছেলের জন্ম নেয়া, বেড়ে উঠা, খাওয়া শিখা, কথা শিখা কোনো কিছুই আমি জানি না। সব অটোমেটিক হয়ে গেছে। ছেলের বয়স সাড়ে চার বছর। মেয়ের একদিন লালন পালনে যত কষ্ট করেছি, ছেলের জন্য সাড়ে চার বছরেও ততটা কষ্ট করিনি।

একটা পাইকারি দোকান থেকে হুমাইরার জন্য ডায়পার আর দুধ, সেরেলাক কিনতাম বাকিতে। একদিন ওরা একলাখ টাকার একটা বিল ধরিয়ে দিয়েছে। কী পরিমান দুধ সেরেলাক নষ্ট করেছি। চিন্তা করা যায়। হুমাইরা দিনে পাঁচটা ডায়াপারও পরতো পাঁচমিনিটের জন্য খালি রাখলেই ও বালিশের উপর দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করে দিতো।
সারাদিন বাচ্চা লালন পালন করতে করতে আমি প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। প্রায় ইচ্ছে করতো হুমাইরাকে মেরে ফেলে নিজেও মরে যাই।

এত বেশি মেরেছি হুমাইরাকে। ও কখনো আমাকে পছন্দ করতো না। ওর চোখে আমি ছিলাম একটা মূর্তিমান আতংক। আমাকে দেখলেই ও ভয় পেতো। জেঠিমাদের পছন্দ করত, দাদুকে পছন্দ করত, বাবাকে পছন্দ করত।

সাথে যদি সংসারের কাজ করতে হতো কত আগেই মরে যেতাম। আমি হুমাইরাদের বাড়ির ধুলিকণার উপরও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে ওর দাদুর উপর, যিনি আমাকে তাঁর নাতনির স্বার্থে কোনো কাজ করতে দেননি। ওর জেঠিমারাও শাশুড়ির ভয়ে টু শব্দটিও করেনি। আমি এগারোটা বাঝে ঘুম থেকে উঠলেও কিছু বলতো না।

হুমাইরাকে আমি এখনো কোনকিছু নিজ হাতে খেতে দেই না। আমি খাইয়ে দেই। হুমাইরা যখন কোনকিছু খায় নিজে নিজে, আমি মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। হুমাইরা যখন ভুল উচ্চারনে কবিতা আবৃত্তি করে
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি।

প্রত্যেকটা মা সন্তান জন্মদানের পর কী পরিমান মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যায়। সেটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। সব মা এই কষ্ট অতিক্রম করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না। বেশিরভাগ মা’ই পারে। আবার কোনো কোনো মায়ের ভাগ্য জোটো ডাইনি মা খেতাব।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট 

আরও পড়ুন