একজন নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ

সালমা তালুকদার

ইদানিং থানা আর কোর্টকাছারিতে আসা যাওয়া করছি। বিভিন্ন রকম কেস দেখি চোখের সামনে। বিশেষ করে পারিবারিক আদালতের কেসগুলো। সেখান থেকেই একটা শেয়ার করার চেষ্টা করছি।
ইনি একজন ৫০/৫৫ বছরের নারী। কোনোদিন স্বামী সুখ পাননি। অনেক মেধাবী একজন স্টুডেন্ট ছিলেন। কিন্তু বাল্য বিবাহের কারনে লেখা পড়া এগোতে পারেনি। বিয়ের পর তিনটি মেয়ে সন্তান হয়েছে ঠিকই। কিন্তু স্বামী স্ত্রীর আর একসঙ্গে থাকা হয়নি। কারন এই নারীর শারীরিক চাহিদা মেটাতে তার স্বামী অক্ষম ছিল। এটা যেমন স্ত্রী বুঝে গিয়েছিল তেমনি স্বামীও বুঝেছিল। এবং বোঝার পর আর একসাথে থাকা হয়নি। প্রতিরাতে একজন নারীকে এনে শোবার ঘরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিত। আর স্ত্রী থাকতো রুমের বাইরে। কখনো কখনো পুরুষদেরও আনতো এবং দেখতে চাইতো তার স্ত্রী কোনোভাবে ঐ পুরুষের সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হয় কিনা।

কারণ তার মনে হোত যেহেতু সে তার স্ত্রীকে বঞ্চিত করছে সেহেতু স্ত্রী চাহিদা মেটানোর জন্য অন্য পুরুষের কাছে যাবে। আর যেহেতু স্ত্রীকে হাতেনাতে কারো সাথে ধরতে পারছে না, সেহেতু ঘরেই নিয়ে আসছে দেখার জন্য। এসবেও যখন কাজ হয়নি তখন মনের আক্রোশ মেটানোর জন্য মাঝে মাঝেই অত্যাচারের দিক পরিবর্তন করতো। আর সেসব অত্যাচারও কি ভয়ানক ছিল! কখনো বিয়ের বয়সী মেয়েদের সামনে শাড়ি,পেটিকোট, ব্লাউজ খুলে শারীরিক মিলন ঘটাতে চাইতো। কখনো উলঙ্গ করে উঠানে নামিয়ে দিত। আশেপাশের মানুষ এসে কাপড় জড়িয়ে দিত। অথচ লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারনে ততোদিনে সেই নারী এসএসসি সার্টিফিকেটধারি। স্বামীর অত্যাচারের কারনে গার্মেন্টসের চাকরীটাও হারাতে হয়েছিল। পরবর্তীতে আর চাকরী করতে পারেনি, কারন তার স্বামী তাকে মেরে হাঁটু ভেঙ্গে দিয়েছিল। বর্তমানে তার স্থান রাস্তায়। ভিক্ষা করতে পারে না বলে শুধু বসে থাকে। মানুষ দয়া করে কিছু দিয়ে গেলে পেটে কিছু জোটে।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এত অত্যাচার সহ্য করেছেন কেন? ঐ নারী বললেন, তিনি লিখতে চাইতেন তার জীবন কাহিনী। অন্য পুরুষের কাছে গেলে তো এই পুরুষের আচরণ লিখতে পারতেন না। এবং লেখার বিষয়বস্তু পাওয়ার জন্য তিনি নানাভাবে তার স্বামীকে পরীক্ষাও করতেন। যেমন, একদিন নিজে থেকে তার মেয়েদের সামনে বিবস্ত্র হয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। এবং অবাক হয়ে দেখলেন, তার স্বামী সেদিন তাকে পেতে চায়নি। তার ভাষ্য মতে ঐ লোকের উদ্দেশ্য ছিল, কেবলই তাকে অপমান অপদস্ত করা। আরকিছু নয়। সে কেনোদিনই তার স্ত্রীকে যৌনতৃপ্তি দিতে পারেনি। আর এত বছর পরে এসে এখন কোর্টে ডিভোর্স ফাইল করে। কেন? এটা হলো নির্যাতিতা নারীটির প্রশ্ন।

সারাজীবন শারীরিক মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত স্বামীকে পেল না। এই কষ্টেই ঐ নারীর অনেকটাই মস্তিষ্ক বিকৃত ঘটে। তবু আমি বলবো উনি যথেষ্ট সুস্থ আছেন। প্রচুর কথা বলেন কারন তার সারাজীবনের কষ্ট গুলো বার বার মনে উঠে আসে। ভুলতেই পারছেন না কিছুতে। এর আরো একটা কারন হচ্ছে, ডিভোর্স দেয়ার কারন হিসেবে ঐ লোক এই নারীকে চরিত্রহীনা বলে উল্লেখ করেছে। আমরা যতই বলি, যে যেমন সে অন্য লোককে তেমনই মনে করে। তবু তিনি তার কষ্ট ভুলছিলেন না। বার বারই বলছিলেন, আহারে! আমার যৌবন তো চলে গেল। আমি এত পরহেজগার ছিলাম। তবু আমার জীবনে কেন এমনটা ঘটলো!

কথা কিছু রেকর্ড করেছি। এর বাইরে যা শুনেছি মনে হলো নিত্য ঘটনা এসব। সেটা হোক উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারে। কারন শুধু এই নারী নয়। এর বাইরেও অনেকের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তাদের কাছে শুনেছি, স্বামী কেমন করে নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করে। কেমন করে পর নারীতে আসক্ত হয়ে স্ত্রীকে অবহেলা করে! কেমন করে এসব অত্যাচারে স্ত্রীর নির্লিপ্ততা মানতে না পেরে স্ত্রীর উদারতাকে অসহায়ত্ব ভাবে। এবং দিনশেষে নিজের কৃত অপকর্মগুলো সব স্ত্রীর গায়ে চাপিয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করতে চায়। এই নারী না হয় নিম্নবিত্ত। উকিলের চেম্বারে বসে আমি সমাজের উঁচু স্তরে বসবাস করা মানুষের বিরুদ্ধেও তার ঘরের লক্ষীকে রুখে দাঁড়াতে দেখেছি। কারন কিন্তু একই। স্বামীর অন্য নারীতে আসক্তি এবং পরবর্তীতে স্ত্রীর থেকে মুক্তির জন্য তাকে মানসিক বিকারগস্ত প্রমান করার চেষ্টায় ব্রত।

আমি অবাক হয়ে আরো কিছু বিকৃত পুরুষের কাহিনী শুনি উকিল আন্টির কাছে। আন্টির সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক প্রায় ত্রিশ বছরের। আমাকে বলেন, সুযোগ হলেই চলে আসবা মা। অনেক লেখার খোরাক পাবা। সেদিন আন্টি বললেন, ইদানিং নাকি নারীরা ডিভোর্স কেস ফাইল করতে আসেন স্বামীর বিকৃত রুচির প্রমান সহ। সেই বিকৃত রুচির একটা অংশ হচ্ছে, নিজের ছোট ছোট ছেলেমেয়ের সামনে স্ত্রী সঙ্গম করা। হায়রে! এসবও ভাবা যায়!
যাই হোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে এই ব্যাপারগুলোকে আমরা মুসলমানেরা কেয়ামতের আলামত বলতেই পারি। তবে এটা ভেবে বসে থাকলে তো হবে না। যে কোন সমাজ, রাষ্ট্রের, পরিবারের দায়িত্ব হচ্ছে অসুস্থ সমাজকে কিভাবে সুস্থ করা যায় সেই চেষ্টা করা। সেই জায়গা থেকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। অবশ্যই সেটা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে। এখনো এই সমাজে এমন মানুষ আছেন, যারা জানেই না এমন কিছু ঘটতে পারে। তাদের কাছে জীবনটা সহজ সরল। সেদিন এক বন্ধুর কাছে বর্ননা করছিলাম এই ঘটনা। সে অবাক হয়ে আমাকে বলে, বন্ধু এই প্রথম এমন কিছু শুনলাম। এমনটা ঘটতে পারে জানা ছিল না। আবার অন্যদিকে আমার এমন বন্ধুও আছে যারা নিজেদের সংসারে সুন্দরভাবে সবকিছু মেইনটেইন করছে এবং সুখীভাবে জীবনযাপন করছে। আসলে তিনটা জায়গায় মানুষের যাওয়া উচিৎ। থানা, কোর্ট আর হাসপাতাল। তাহলে মানুষের আহাজারি দেখে নিজের জীবনে আলহামদুলিল্লাহ বলা যায়। এবং সাবধান হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

প্রতিটা সম্পর্ক মেইনটেইন করতে হয়। সেটা হোক বাবা,মা, ভাই বোন, স্বামী স্ত্রী অথবা ছেলে মেয়ে বন্ধুত্ব। নয়তো সম্পর্ক গুলো টেকে না। বন্ধুত্বের সম্পর্ক গুলোতে এতটা চিন্তা করতে হয় না যতটা পারিবারিক সম্পর্কে চিন্তা করা উচিৎ। স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা এই সম্পর্ক গুলো মেইনটেইন করার প্রথম পর্যায় হচ্ছে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া। একটা পরিবার গড়তে অনেক কষ্ট করতে হয়। কিন্তু কষ্টটা তখনই সফল হয় যখন শেষ পর্যন্ত পরিবারের সবাই সুখী হয়। তবে এটাই সত্যি যে, জগতে সবাই সুখী নয়। হতেই পারে পরিবারের কোন একজন বা দুজন সদস্যকে পছন্দ হলো না। তাই বলে কি তাকে অবহেলা করতে হবে! পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেও তো নিজেকে সুখী করা যায়। একবার যদি ভাবা যায় যে, দুনিয়াটা দুই দিনের তাহলেই কিন্তু অনেক সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। আর যদি কেউ ভাবে পরিবার তো আছেই। যাবে আর কই। এখন সময় মাস্তি করার। বয়স চলে যাচ্ছে। নিজের আনন্দ শেষ হলে শেষ বয়সে পরিবারকে সময় দিব তাহলে সেই ভাবনাটা কিন্তু ভীষন অন্যায়। কারন ঐ যে সম্পর্ক নার্সিং না করলে সেই সম্পর্ক টেকে না। বিশেষ করে পারিবারিক বন্ধনগুলো ভেঙ্গে যায়। কারন পরিবারের সবাই তো ভালোবাসা চায়। অবহেলা পরিবারের প্রতিটা সদস্যকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়ে দেয়।

ইন্টারনেটের এই যুগে সবকিছু কেমন সহজলভ্য। হাত বাড়ালেই সম্পর্ক পাওয়া যায়। তাই প্রতিটা সম্পর্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে তাকে মেইনটেইন করা জরুরি। স্বার্থ ছাড়া কেউ এক পা ও এগোয় না। তাহলে কেন আজকাল কিছু মানুষ এই জায়গাটায় স্বার্থ দেখে না। কেন বোঝে না যে, মানুষের জীবনটা ক্ষনস্থায়ী। যৌবনের তেজদীপ্ত শিখা ম্রিয়মান হবেই। সুখের সময় কাছে থাকা মানুষগুলোও আর কাছে নাও থাকতে পারে। যখন সঙ্গ প্রয়োজন তখনই সঙ্গগুলো সব দূরে সরে যায় এটাই দুনিয়ার নিয়ম। অসহায় মানুষ তখন শিশুর মত একটু ভালোবাসা খুঁজে ফেরে। কিন্তু ভালোবাসা পাবে কোথায়!

যৌবনকালে যে সে ভালোবাসার অপমান করেছে। অবহেলিত কাছের মানুষগুলো তখন অনেকদূরে।
যাই হোক, শুরু করেছিলাম একজন নারীকে দিয়ে যিনি এখন তার কর্মফল ভোগ করছেন। হ্যা, এটা অবশ্যই কর্মফল। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে বিবেক বুদ্ধি শক্তি দিয়েছেন। প্রতিভা দিয়েছেন। অথচ একজন নারী এসব কিছুকে অস্বীকার করে কেবল সহ্যই করে যায়। ঘুরে দাড়ানোর শক্তি সে অর্জন করতে পারে না কারন সে ঘুরে দাড়াতে চায় না। আল্লাহর ভান্ডারে অফুরন্ত সম্পদ। যখন যে স্বাবলম্বী হতে চায় তাকেই তিনি স্বাবলম্বী করবেন। তবে এক্ষেত্রে মানসিক শক্তি ও সাহসটা ভীষন জরুরি। যেটা সবাই অর্জন করতে পারে না। অথবা সংসার মায়ায় বিচ্ছেদের সুরটা বাজাতে চায় না। তাই এখনো ঘরে ঘরে নারীরা আজো নির্যাতিতা। যেসব নারীদের সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দেখি, তাদের সংখ্যাটা এখনো অনেক কম। এখনো অনেক নারীরা শত প্রতিকূলতা দিয়েও নিজের হাতে গোছানো সংসারের মায়ায় জড়িয়ে আছেন বা থাকেন বছরের পর বছর। আমি সব সময়ই ঘুরে দাড়ানোর পক্ষে। তবে তাদের জন্য অনেক দোয়া যারা ধৈর্য্য ধরে শেষ পর্যন্ত সময়টাকে জয় করতে পারেন।

লেখকঃ সমাজকর্মী, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা

আরও পড়ুন