করোনাকাল ও নারীর গতিরোধ

তানিয়া সুলতানা হ্যাপি

অবন্তিকা সাহা অবনী। পরিচিত জনেরা ‘অবনী’ নামে ডাকেন। অবনী খেটেখুটে খাওয়া মানুষ। যাকে আরো সহজ শব্দে বলে দৃঢ়চেতা জীবন সংগ্রামী নারী। বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালের শুরুতেও অবনী ছিল খুবই দৃঢ়চেতা, সাহসী। লকডাউনে সাধারণ ছুটি বাড়তে থাকে আর অবনীর টেনশন বাড়তে থাকে। চলমান পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সামনের দিনগুলোতে জীবনযাত্রা কিভাবে চালিয়ে নিবে এসব চিন্তা অবনীর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। চারিদিকে করোনা আতঙ্ক! ভীষণ অস্থির সময় কাটছে! এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বাড়িওয়ালার চাপ, বাসা ভাড়া দেয়ার চাপ, বাসা ভাড়া না দিতে পারলে বাসা ছাড়ার চাপ!

অবনীর ভাই থাকেন গাজীপুরে। তিনি সরকারি চাকুরে। করোনা ভাইরাসের কারণে বাইরে বের হলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও, মাস শেষে বেতন পাচ্ছেন প্রণোদনাসহ। অন্তত অর্থনৈতিক সংকট নাই। যেমনটা অবনীর হচ্ছে। লকডাউনের শুরুতে অবনীর অফিস বন্ধ রয়েছে। এদিকে বেতনেরও কোন খবর নাই। অবনীর ভাই বার বার ফোন করে বলেছে গাজীপুরে চলে যেতে। কিন্তু অবনী ভাই-ভাবীর সংসারে বোঝা হতে চায় না। তাছাড়া একদিন-দুদিনের ব্যাপারও তো নয়, সময়টা অনির্দিষ্টকালের।

এই কঠিন সময়ে অবনী নিজেকে আরো শক্ত করতে চেষ্টা করলো যাতে কোনভাবেই মনোবল দুর্বল না হয়ে যায়। সারাদিন ঘরে বসে বিরক্ত যাতে না হয় তার জন্য একটা রুটিন ডিজাইন করেছে অবনী। যেমন বই পড়া, নাটক দেখা, সিনেমা দেখা, ডকুমেন্টারি দেখা, লেখালেখি করা, রান্না করা, প্রয়োজনীয় মানুষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, অনলাইনে লুডু খেলা।

অবনীর বাবা-মা থাকেন গ্রামে। লকডাউনের দীর্ঘ ছুটিতেও অবনী গ্রামে যায়নি কারণ গ্রামের মানুষ অনেকটা অসচেতন। তারা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি হাস্যরসে উড়িয়ে দেন। তদুপরি অবনী কেন এখনো বিয়ে করছে না তা নিয়ে নানান প্রশ্ন ছুঁড়ে, তাই অনেকটা নিজেকে প্রশান্তিতে রাখতে একরকম নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন অবনী।

একদিন সন্ধ্যারাতে আঁধো আলোতে অবনী গ্রিন টি হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে খেয়াল করছে, এতো বছর ঢাকায় থাকে অথচ এতো ভুতুড়ে ঢাকা কখনো দেখেনি সে! যেন গল্পে পড়া মুক্তিযুদ্ধের ঢাকা। একটু পর পর সেনাবাহিনীর টহল। একটু পর পর চলন্ত মোটর সাইকেল অথবা গাড়ীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানাচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের নিয়োজিত ব্যক্তিগণ। জানাচ্ছে সকলকে ঘরে থাকার বার্তা। বাসার নীচে যে রাস্তাটিতে থাকতো মানুষের ক্রমাগত পথচলা সেখানে যেন বিরানভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। ভরদুপুরে রাস্তায় কুকুর বেড়ালের ছায়াও দেখা যায় না।

১৮ মার্চ থেকে নিজের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করে ঘরে থাকছে অবনী। আজকাল সন্ধ্যার পর বারান্দার দিকে তাকানো যায় না। অথচ কদিন আগেও রাত ১০-১১ টায় ও থাকতো রিকসা- অটোরিকশার জ্যাম, ট্রাফিকের বাঁশি। চেনা শহরটা যেন হঠাৎই বদলে গেল।
কদিন আগেও অবনী অফিসের কাজে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছে, রাত-দুপুরে বাসায় ফিরেছে কই তখন তো এতো ভয় লাগেনি কখনো! আজকাল অবনী বাইরে বের হতে ভয় পায়। ভয়টা যে শুধু সংক্রমণের তা নয়। ভয়টা মনের ও মানসিক।

বোরিংনেস কাটাতে একদিন অবনীসহ তিন বন্ধু মিলে ঘুরতে বের হলো রবীন্দ্র সরোবরে। দু’একটা ছবি তুললো, ডাব খেলো। এর মধ্যেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ৭ঃ৩০ মিনিটে সেনাবাহিনীর টহল। গাড়ীতে বিগলের মতো করুন সুর বাজছে। সবাইকে ঘরে ফেরার তাড়া দিচ্ছে। অথচ কয়দিন আগেও রাত ১০টাকে সন্ধ্যেবেলা মনে হতো।

জরুরি কাজে লকডাউনের আড়াইমাস পর অবনী বের হলো বিদ্যুৎ কার্ড বিচার্জ করতে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল ৩ জন পুরুষের পর একজন নারী রিচার্জ করার সুযোগ পাবেন। করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবের আগে নারীরা যেখানে ladies first service পেত।

প্রথম ধাক্কাটা মাথায় এলো। অবনী ভেবেছিল করোনা পরবর্তী পৃথিবী অনেক পরিবর্তন হবে। অবনীর মনে হলো তবে কি করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে নারীর এগিয়ে চলাতেও বাঁধা আসবে!

দিন কি এমনি যাবে নাকি সুদিন আবার আসবে? আবার মানুষ ঘুরবে, ফিরবে, প্রাণ খুলে আড্ডা দিবে। নির্মল, হাস্যোজ্জ্বল প্রাণের পৃথিবী হবে সবার। করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে অবনীও ভাবছে কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। অনলাইনে ই-কমার্সের উপর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ চর্চা করছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় ও পড়াশোনা করছে। যাতে চাকরি হারানোর ভয় এবং জীবিকার জন্য হাজারো অবনীর মতো অবনীকেও দিশেহারা হতে না হয়।

২১ জুলাই ২০২০
আজিমপুর, ঢাকা।
[email protected]

আরও পড়ুন