নারীদের পিরিয়ড ও কিছু প্রশ্ন

অনিক কুমার সাহা

শুরু করি নিজের জীবনের একটা অভিজ্ঞতা থেকে।

আমি তখন খুব ছোট প্রায়ই (আসলে প্রতিমাসেই) সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করতাম আমার মা মাটিতে একটা পাতলা চাদর বিছিয়ে শুইয়ে থাকত। এভাবে তিনদিন চলত এবং শেষদিন সবকিছু নিয়ে পুকুরে গিয়ে স্নান করে আসত। এই তিনদিন মা আলাদা রুমে আলাদাভাবে থাকত, আমাদেরকে কাছে যেতে দিত না। জিজ্ঞেস করলে বলত অশুচি আমি যদি স্পর্শ করি তবে আমাকেও স্নান করতে হবে৷ এই তিনদিন আমি ঠাকুমার সাথে ঘুমাতাম। এমন নিয়ম প্রচন্ড শীতের সময়ও পালনীয় ছিল। একবার প্রচন্ড শীত পড়ল মানে পুরোপুরি শৈতপ্রবাহ। যেহেতু গ্রামে থাকতাম তাই শীত আরও দ্বিগুণ অনুভূত হতো তার উপর আবার আমাদের ঘর ছিল মাটির ফ্লোর। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে একই অবস্থা মা মাটিতে শুইয়ে আছে এবং রীতিমতো কাঁপছে। আমি স্পষ্টই অনুভব করছিলাম আমার মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু তথাকথিত নিয়মের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কি আমার মায়ের আছে? আমি খুব কান্না করলাম ঠাকুমার কাছে গিয়ে। ঠাকুমা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসত তাই হয়ত আমার দিকে তাকিয়েই মাকে একটা ভারী কাথা দেওয়া হলো। কিন্তু আমার ছোট মনে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন চলত কেন এমন নিয়ম? এটা কিসের শাস্তি? কিন্তু উত্তর মিলত না। বড় হলাম বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে নারীদের মাসিক এই ঋতুস্রাবের বিষয়টা পরিস্কার হলাম এবং অনুধাবন করলাম এই সময়টায় একজন নারীকে আরও বেশী পরিচর্যা করা প্রয়োজন। কিছুদিন হয়েছে বিয়ে করেছি আমার স্ত্রীও স্বাভাবিকভাবেই এমন শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হয়। কিন্তু আমার মা সেই টিপিকাল কালচারের ধার ধারে না। তিনি আমার স্ত্রীকে পর্যাপ্ত সেবাশুশ্রূষাই করে। এই কিছুদিন আগেই আমি আমার স্ত্রীকে আমার মায়ের গল্পটা বললাম কি ভয়াবহ সময় পার করতে হতো মাসের এই তিনটা দিন।

লকডাউনের এই সময়ে অফুরন্ত অবসর। বিভিন্ন গ্রন্থ খুঁজলাম, বিভিন্ন সাইট ভিজিট করলাম এবং সনাতন ধর্মের কিছু রেফারেন্স খুঁজে বের করলাম এই কুসংস্কারের বিরোধ্যে। আশাকরি আমার লিখাটা পড়ে সনাতন ধর্মালম্বী নারীরা উপকৃত হবে।

প্রশ্নোত্তর

★পিরিয়ড চলাকালীন নারীকে কি অপবিত্র ও অশুচি মানা হয়? ছোটবেলায় দেখে এসেছি এই সময়টাতে মাটিতে পাতলা চাদরে শুতে দেওয়া হয়। ঘরের কোনকিছু স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না, মন্দিরে যেতে দেওয়া হয় না যেন নারী অপবিত্র ও অশুচি। এগুলো কি কুসংস্কার নাকি সনাতন ধর্মের বিধান?

উত্তরঃ স্পষ্ট উত্তর হচ্ছে নারী কখনোই শারীরিকভাবে অপবিত্র হয় না তাই পিরিয়ড চলাকালীন সময়েও নারী অপবিত্র কিংবা অশুচি নয়৷ পিরিয়ড একটা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং সেটা প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। এই প্রক্রিয়া প্রতি মাসের আবর্তনে চলতেই থাকবে। এই প্রক্রিয়া দ্বারা একজন নারীর মা হওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করে। স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলেও এই সময়টায় নারীকে আরও অতিরিক্ত সেবা ও পরিচর্যা করা প্রয়োজন৷ পিরিয়ড নারীর জন্য অপবিত্রতার প্রতীক নয় গৌরবের প্রতীক। নারী কখনোই অপবিত্র হয় না যদি না তার মন অপবিত্র হয়। তাই নারীকে দেবীজ্ঞান করা হয় সনাতনে।

সনাতন ধর্মে নারীর পবিত্রতা বর্ণনা করতে গিয়ে বেদে বলা হয়েছে।

“শুদ্ধাঃ পুতা ঘোষিত যজ্ঞিযা ইমা আপশ্চরুমব সর্পন্তু শুভ্রা।
অদুঃ প্রজাং বহুলান্পসগুন্নঃ পন্তৌদনস্য সুকৃতামেতু লোকম্।।”

– অথর্ববেদ (১১/১/১৭)

অনুবাদঃ শুদ্ধ পবিত্র ও পূজনীয় রমনীগণ ও তাদের পবিত্র কর্ম জলের ধারার মত পবিত্র পাত্রে প্রবেশ করুক ও যজ্ঞের জন্য পবিত্র ভোগ্যবস্তু তৈরী হউক। তাহারা আমাদের উত্তম বংশধর ও প্রভূত ধনসম্পদ দান করুন। যারা অমৃতসত্তার জন্য উৎকৃষ্ট খাদ্য তৈরি করে তারা যেন জীবনের সর্বোচ্চ অর্জনের শিখরে পৌছান৷

#অর্থাৎ ঋতুস্রাব থেকে শুরু করে সন্তান জন্ম দেওয়া এই প্রক্রিয়াগুলোকে পবিত্রতা ও অমৃতের প্রতীক হিসেবে বলা হয়েছে।

যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি ৭১ এ স্পষ্ট বলা হয়েছে,

“নারীজাতি সোম থেকে শুদ্ধতাপ্রাপ্ত, গন্ধর্বদের থেকে সুমিষ্ট বাক্য প্রাপ্ত, অগ্নির কাছ থেকে শুদ্ধতাপ্রাপ্ত তাই নারীরা সর্বদা শুদ্ধ।”

পিরিয়ড যন্ত্রণা সম্পর্কে বশিষ্ট ধর্মসূত্র ২৮/৯ এ বলা হয়েছে,

“নারীদের একটা অন্য ধরনের পবিত্রতা আছে। তারা কখনোই পুরোপুরি অপবিত্র হয় না। মাসে মাসে কিছুদিনের অশৌচাবস্থা তাদের মনের পাপ ধুয়েমুছে দিয়ে তাদের পবিত্রতা আরও বৃদ্ধি করে।”

এবং পিরিয়ড চলাকালীন সহবাস না করার নির্দেশ হিসেবে বলা হয়েছে।

“কামে একান্ত উন্মত্ত হইলেও রাজোদর্শনে নিষিদ্ধ দিনত্রয়ে স্ত্রীগমন করিবে না এবং তাহার সহিত সহবাস করিবে না।”

– মনুসংহিতা (৪/৪০)

অর্থাৎ এই সময়টায় নারীকে আরও বেশী সম্মান করুন তার অতিরিক্ত পরিচর্যা করুন। তাকে অপবিত্র ও অশুচি বলে মাটিতে শুতে না দিয়ে তার কষ্টটা অনুভব করুন ও পরিচর্যা করুন৷ এই সময়টায় তার কাজগুলোতে বেশী বেশী সহায়তা করুন, পুষ্টিকর খাবার দিন।

 

লেখকঃ কলামিস্ট

আরও পড়ুন