নারীর মনের জানালা

হাবিবা মুবাশ্বেরা

জানালা হলো যে কোন ঘরের জন্য অপরিহার্য একটি অংশ; যা দিয়ে বাইরের আলো, বাতাস ঘরে প্রবেশ করে ঘরের ভেতরের বদ্ধ বাতাস ও অন্ধকারকে দূর করে। জানালা খোলার পর নির্মল বাতাস ও উজ্জল আলোর প্রবাহ সঞ্চালিত হয়ে ঘরের পরিবেশ হয় বিশুদ্ধ ও আলোকজ্জ্বল । তাই প্রতিটি ঘরের গুমোট ভাব দূর করার জন্য জানালা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি প্রতিটি হোমমেকার মেয়ের জীবনেও মনের একটি জানালা থাকা তার মানসিক সুস্থতার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়।

প্রতিদিনের গৃহস্থালীর কাজ যেমন রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিস্কার করা, বাচ্চাদের যত্ন নেয়া, আত্মীয়দের খোজঁ-খবর নেয়া- এ জাতীয় দায়িত্বগুলো সুষ্ঠভাবে পালন করতে করতে একটা সময় গৃহিণীদের মন হাঁপিয়ে ওঠে। কারণ দৈনন্দিন এই গার্হস্থ্য কাজগুলো একদিকে যেমন একঘেয়ে ,বৈচিত্রহীন অন্যদিকে তেমনি এসব কাজে দৈহিক পরিশ্রম হলেও মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায় না। সারা দিনের কাজ শেষে শরীর ক্লান্ত হলেও মননশীলতার চর্চা হয় না বলে একটা সময় মন মেজাজ হয়ে যায় খিটখিটে, বিরক্তিকর। তাছাড়া ভালো স্ত্রী , ভালো মা, ভালো মেয়ে / পুত্রবধূ –এই পরিচয়গুলো আপাতদৃষ্টিতে সুখকর মনে হলেও একটা সময়ে এসে নিজস্ব কোন পরিচয় না থাকার শূণ্যতা মনে হাহাকার তৈরি করে। কখনও কখনও এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে কেউ হীনমন্যতায় ভোগে কেউবা আবার কর্মজীবী নারীদের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়। দিনের পর দিন এভাবে চলতে থাকলে কেউ কেউ অহেতুক পরনিন্দার চর্চা শুরু করে কেউ বা আবার বাস্তব বির্বজিত টিভি সিরিয়ালে বুদ হয়। নিজের জীবনে যা হতে পারেনি টিভির নায়িকাদের তা হতে দেখে নিজেদের মনের কষ্ট ভোলার চেষ্টা করে। আর যারা নিজস্ব রুচিবোধের কারণে এসব নোংরামিতে অভ্যস্ত হতে পারে না তারা একসময় ডিপ্রেশন থেকে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়। নিজের হাতে সাজানো সংসারেও তখন নিজেকে বন্দী মনে হয় আর প্রিয়জনদের মনে হয় স্বাথপর। এই সব ধরনের মানসিক বৈকল্য থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে ‘মনের একটি জানালা’ তৈরি করা।

প্রতিদিনের সাংসারিক কাজ থেকে অন্তত দুই-তিন ঘন্টা সময় সম্পূর্ণ নিজের জন্য আলাদা করে রাখলে এবং এই সময়টুকু সৃজনশীল বা গঠনমূলক কোন কাজে ব্যয় করলে তা মনের এই স্থবিরতা দূর করে মনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। প্রতিটি মেয়েরই সাংসারিক কাজের প্রকৃতিপ্রদত্ত দক্ষতার পাশাপাশি কোন না কোন ভালো লাগার বিষয় থাকে। হতে পারে সেটা সেলাই করা, ছবি আঁকা, শো-পিস বানানো ,বাগান করা ,বই পড়া, লেখালেখি করা বা আউটসোর্সিং এর কাজ – এ ধরনের যে কোন কিছু। হোম মেকার মেয়েদের উচিত নিজের এই সুপ্ত প্রতিভার নিয়মিত চর্চা করা এবং এই বিষয়ক সমমনা মানুষদের সাথে একটি নেটওয়ার্কিং গড়ে তোলা। হতে পারে সেটা বাস্তবিক অথবা ভার্চুয়ালি। আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ্যাকাউন্ট নেই এমন মানুষ খঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে যদি নিজের পছন্দের বিষয়ের সমমনা মানুষদের সাথে গ্রুপ তৈরি করা যায় তবে সেখানে নিজের আগ্রহের বিষয় নিয়ে অন্যদের সাথে মতামত শেয়ার করা যায়। এধরনের গ্রপের মেম্বার হলে নিজের কাজের ব্যাপারে যেমন অন্যদের মূল্যায়ন জানা যায় তেমনি অন্যের কাজের ধরণ দেখে নিজের কাজের মানোন্নয়ন করার ব্যাপারেও আইডিয়া পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি নিজের এই ভালো লাগার কাজ থেকে সামান্য হলেও অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি করা যায়। সংসারের প্রয়োজনে এই সামান্য অর্থ কাজে না লাগলেও নিজের হাত-খরচ মেটানো, শখের কোন জিনিস কেনা কিংবা প্রিয় কারও জন্য উপহার কেনার মতো ছোট-খাটো বিষয়ে যখন অন্যের উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তখন তা মনের গভীরে অন্যরকম ভালো লাগার অনূভূতি তৈরি করে। এছাড়া রক্ত বা বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত আত্মীয়-স্বজনদের বাইরে নিজস্ব একটা সার্কেল তৈরি হলে তা মনের ভিতর আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। অন্যের স্ত্রী ,মা, মেয়ে কিংবা পুত্রবধূ পরিচয়ের বাইরেও নিজ যোগ্যতায় নিজস্ব একটা পরিচিতি তৈরি হলে তা মনের ভিতরের হতাশাজনিত বদ্ধ ভাবটাকে দূর করে দেয়। প্রফূল্ল মন নিয়ে তখন দৈনন্দিন গৃহস্থালীর কাজগুলো আরও দ্রুত শেষ করা যায়, কাছের মানুষদের সাথে সর্ম্পকও তখন হয়ে উঠে আরও উষ্ণ।

তাই প্রতিটি হোমমেকার মেয়েদের উচিত নিজের ও পরিবারের মানসিক সুস্থতার স্বার্থে নিজের জন্য একটি জানালা তৈরি করে নেয়া তা সেটার উপকরণ কাচ ,কাঠ বা থাই-গ্লাস যাই হোক না কেন, বাইরের জগতের সাথে আলো, বাতাস আদান-প্রদানের জন্য ইট-সিমেন্টের তৈরি ঘরের দেয়ালে এক প্রস্থ ফাঁক থাকা অবশ্যই দরকার।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন