আধুনিকতাবাদের বহুমুখী কবি এইচ বি রিতা

।। সুচন্দ্রা মুখার্জী।।

আমারা জেনে গেছি যুদ্ধ ছাড়া বিশ্ব এগোয় না। তাই অস্বস্তি নিয়ে একবিংশ শতাব্দী তথা তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রথম দশকটা কাটাচ্ছি আমরা। অথচ, শতাব্দীর শূন্যের দশকে দাঁড়িয়েও নানান প্রাকৃতিক বৈরিতার মাঝেও বাঙালি কবিরা লিখছেন কবিতা, পাঠক পড়ে যাচ্ছেন, জেনে যাচ্ছেন কবিদের মনের বাস্তব অভিজ্ঞতার রূপান্তরে নানান অজানা কথা। আধুনিক যুগের কবিদের শব্দ, কলমে যে ক্রিয়াশীল মন কাজ করে যাচ্ছে, তা আমাদের শুধু বর্তমান সময়কেই চিহ্নিত করছে না বা মূল্যায়ন করছে না, বরং অতীতের সাহিত্যের প্রভাব বিস্তর ভাবে লক্ষণীয় । মাত্র সাড়ে ছ-দশকে আধুনিক কবিতার যে-উৎপাদন ঘটেছে, তার তুলনা অভিনব ও বিস্ময়কর।

নিজ শব্দ ও কলমে এমনই নানান সামাজিক বিপর্যয়, নৈতিক, মানবিক-মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারী অধিকার, মানব অধিকার এবং একাকী-যুদ্ধ বিগ্রহে লড়াই করা জীবনের জটিল আশান্বিত সমীকরণে কখনো ক্লান্ত, কখনো বিষাদে জর্জরিত একবিংশ শতাব্দীর শূন্যের দশকের কবি এইচ বি রিতা আধুনিকতাবাদে বিভিন্ন শৈল্পিক চিত্র তুলে এনেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতায় আমরা খুঁজে পাই পরাবাস্তবতার স্বাদ। খুঁজে পাই কল্পনাবাদ এবং অভিব্যক্তিবাদ সাহিত্যের প্রভাব।

কটাক্ষের মোড়কে জড়ানো বিষণ্ণতার গুচ্ছ প্রহসনে আধুনিকতাবাদের গন্তব্যহীন ট্রেনে এইচ বি রিতার শব্দেরা দুঃখের খেলা খেলে যায় যখন তখন। সুই সূতোয় গেঁথে নেয় ভাবনার অন্ত:পুরের দহন । স্টেশনে নামতেই আঁচলের ভাঁজে আটকে যায় অগোছালো মানুষটির জীবন,  গুছিয়ে গুছিয়ে এগিয়ে চলে অনিশ্চিত বর্তমান, আততায়ী মাকড়সার জালে ঢুকে যায় তাঁর পুরানো বেহিসেবীমন যখন তখন। এক চিলতে কাব্য কারুকাজে নিপুণ হয়ে ওঠে কবির আঁধারি মনের অসমাপ্ত গল্প । মায়াবী আলোয় পূর্ণ গ্রহণেতাই তো কবি পরাবাস্তববাদে ডুবে গিয়ে “এস্কেপ রুম” কবিতায় লিখেন-

‘আবদ্ধ আমার এস্কেপ রুমটিতে/ একটা কলম, একটা কিবোর্ড আছে/ এখানে আমার পুরো পৃথিবী আছে।“

 

দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় জর্জরিত এইচ বি রিতার বাহিরের পৃথিবী তেমন দেখা হয়নি। রহস্যে ঘেরা, ব্রেইন সেলগুলোর মত অজানা এক তালাবন্ধ কুঠুরিতে সময় অতিক্রমে তিনি খুশী মনে প্রযুক্তির বদান্যতায় দেখে নেন বিশ্ব।

তাই তো তিনি বলেন,

“পর্দার আড়ালে কুশলাদিতে বিস্তর এক পৃথিবী/ এখানে, সব দেখি। দেখা যায়।/ কারো চোখের নেশাতুর ইশারা বুকে পোষা আদিকালের বস্তাবন্ধি ভালবাসার ঢেউ/ সব দেখি, সব শুনি/ বিচ্ছিন্নতার রৌদ্র-তাপে, বরফ জমা হীরক পথে হয়তো খুঁজে দেখিনি শালবন বৌদ্ধ বিহার /ছেঁড়া দ্বীপে বন-ময়ূরী/তবে, এখানেও হয় ছোট টবে গমের চাষ, ফুলের বাগান/ রোজ ভোরে প্রকৃতি জন্ম দেয়এক একটি সন্তান/’”

 

আবার, পরক্ষনেই বিশ্ব সাংঘর্ষিক ধর্মীয় লড়াইয়ে বিধ্বস্ত কবি ক্রোধের অবাস্তব কল্পনায় পরাবাস্তববাদে ডুবে গিয়ে বলেন, “এখানে দেখি, দ্যা হলোকাস্ট এখনো কারো মগজ খুঁটে খুঁটে খায়/জোসেফ স্ট্যালিনরা  ব্র্যান্ড নেইম পোষাকে দেখি।”

আমরা জানি যে, ‘দ্যা হলোক্যাস্ট’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি এন্টি-সেমিটিজম ধর্মীয় গণহত্যা যা ইহুদীদের উপর চালানো গণহত্যাকাণ্ড হিসেবে পরিচিত। আজকের দিনে সে গণহত্যা অতীত হলেও তিনি এখানে সার্বজনিক-ভাবে বিশ্ব ধর্মীয় লড়াইয়ের উপস্থিতি টানতে অবাস্তব ও যুক্তি-হীনভাবে দেখছেন যে, হলোকাস্ট এখনো আমাদের মগজ খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। এটাই কবির পরাবাস্তববাদের ধারণা। বিধ্বস্ত বিশ্ব রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের মৃত স্বৈরশাসক জোসেফ স্ট্যালিনকেও টেনেছেন যা পরাবাস্তববাদের ধারণাকেই সংজ্ঞায়িত করে।

সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ, পশু, মানবতা, নৈতিকতা, নিয়মের হত্যায় ক্রুদ্ধ কবি বলেন,

“পতিতার সস্তা মূল্যে এক রাতের মতই বিক্রি হয়ে যায় নৈতিকতা-বিশ্বাস/ দেখি, বুকের ভাঁজে ঘুমায় সাফল্য; নিশ্চিন্তে।হীনমন্যতায় অসহায় দুস্থ লোক চুষে খায় কবির রক্ত-মাংস, পারলে সত্তাটুকু।“

 

এখানে আমরা শান্ত প্রতিবাদে কবির গভীর পরাবাস্তববাদের স্পর্শ পাই। দুর্নিতিগ্রস্থ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ে পরাস্ত কবি তাঁর অযৌক্তিক কল্পনায় বুকের ভাঁজে মানুষের সাফল্যকে ঘুমাতে দেখছেন। আবার মানব সমাজের স্বভাবসুলভ আচরণে কবি দেখছেন একদল হিংস্রাত্বক লোক(অসহায় দুস্থলোক) কবিদের রক্ত-মাংস, সত্তাটুকু চুষে খাচ্ছেন।এখানেও আমরা অচেতন মনের ছোঁয়া পাই। কল্পনার ছোঁয়া পাই। এটা পরাবাস্তববাদ এবং কল্পনাবার দুটোকেই প্রতিফলিত করে।

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অচৈতন্যে মনে কবি এইচ বি রিতা লিখেছিলেন তার আরও একটি সেরা পরাবাস্তববাদী কবিতা ‘হাত থেকে জীবন ছুটে যায়।’প্রগতিশীল পাঠক এখানেও বুঝে নেন সেদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মানুষটা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ‘ছুটে যাওয়া টেন’কে তাঁর নিস্তেজ হয়ে যাওয়া জীবনের সাথে তুলনা করেছিলেন।

‘হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটি ছুটে চলে য়ায় গন্তব্যহীন, একা/ ওখানে কোন যাত্রী নেই, তুমি ছাড়া’-

কবি এখানে ‘ট্রেন’ বলতে ‘জীবন’কে নির্দেশ করেছেন যা নিস্তেজ হয়ে আসছে দ্রুত এবং যাত্রীহীন একা ট্রেনে ‘তুমি’ বলতে নিশ্চয়ই জীবন রক্ষাকারী ‘স্রষ্টা’কে বুঝিয়েছেন। এবং তিনি এখানে ট্রেনটি ধরার জন্য ব্যগ্র কারণ তিনি মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন, তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত নন। তাই তো এমন ভয়ানক রাতে মৃত্যুকে কাছে দেখে তিনি ভাবছেন, ছুটে যাওয়া জীবনটাতে একমাত্র স্রষ্টার নাগাল পেলেই তিনি ফিরিয়ে আনতে পারবেন একটি জীবন, তিনি বেঁচে যাবেন।এখানে লক্ষণীয় যে, স্রষ্টা অর্থাৎ যিনি আমাদের সৃষ্টিকারী তিনি কখনোই ট্রেনে চড়েন না। তিনি অদৃশ্য। অথচ তিনি এখানে তাঁর যুক্তিহীন কল্পনায়  স্রষ্টাকে ট্রেনের বগিতে তুলেছেন। এটা পরাবাস্তববাদ এবং কল্পনাবাদের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তিনি বলেন, ‘উথাল পাতাল বন্য হাওয়ায় বুকের আল ভাঙ্গতে থাকে ভীষণ শব্দে।‘-

কবি এইচ বি রিতা
কবি এইচ বি রিতা

কবি এখানে ভীষণ ক্ষুব্ধ। রাগ প্রকাশে বলছেন বন্য হাওয়ায় বুকের আল ভাঙে। আসলেই কি হাওয়া যত তীব্রতর হোক, তা বুকের হাড় ভাঙতে পারে? পারেনা। এখানেও কবি অবান্তর, যুক্তিহীন পরবাস্তববাদের স্পর্শ রেখেছেন তাঁর কবিতায়।

উদ্দাম শক্তিতে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে নিতে মাকড়শার সাথে নেতিয়ে পড়া আঙুলের তুলনা করে তিনি বলেন, ‘আঙ্গুলগুলো সব জীবন্ত হয়ে মাকড়শার মত উৎ পাতে।‘ অর্থাৎ এখানে কল্পনায় তিনি অসাড় আঙুলগুলোকে জাগ্রত করতে মাকড়সার অঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন। অথচ আট সন্ধিযুক্ত মাকড়সার শুধুমাত্র পা আছে, কোন ডানা নেই। কাজেই, এখানেও কবির অচেতন মনের যুক্তিহীন ভাব লক্ষনীয়।

অসহনীয় ব্যথায় কল্পনাবাদে ডুবে গিয়ে তিনি স্রষ্টাকে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলেন,

‘তুমি একইভাবে তাচ্ছিল্যতায় আমাকে দেখো দরজায় দাঁড়িয়ে।’

প্রচণ্ড যন্ত্রণায় থাকা কবি ভয়ংকর মৃত্যুকে সন্নিকটে দেখত পাচ্ছেন। তাই স্রষ্টার প্রতি রাগান্বিত তিনি এমন ভাবছেন।  মূলত, স্রষ্টা অদৃশ্য। কিন্তু কল্পনায় কবির দৃষ্টিতে স্রষ্টা তাঁকে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে “তাচ্ছিল্য’ করছেন। অবান্তর যুক্তি। অচেতন মনের বিভ্রম।অভিব্যক্তিবাদের একটি শৈল্পিক আঁচড় আমরা দেখতে পাই এইচ বি রিতার আ্যান নুয়্যেনকে নিয়ে লিখা “বুক ফুটো করে চলে গেলে” কবিতায়।

অকালে কোভিড তাঁর প্রিয় বন্ধুর প্রাণটি কেড়ে নেবার পর ভীষণ শোকে মর্মাহত তিনি বিশ্বকে দেখেছেন নির্মমতা নিয়ে। অন্তরের গভীর শোক প্রকাশে আবেগ সংযোগে তিনি লিখেছেন,

“যেতে যেতে তুমি কিছু বলতে চেয়েছিলে কি? /এই যেমন- স্প্রিং এর পাতা কুড়োনোর গল্প কিংবা/ অসমাপ্ত চিত্রশিল্পের কথা? /কিংবা বলতে চেয়েছিলে কি, বুকে আজ নিঃশ্বাসের বড্ডঅভাব?”

 

স্মৃতির এ্যালবাম হাতড়ে আজ কত কি দেখেন কবি। কিন্তু কোথাও আজ প্রিয় মুখটি নেই।

মর্মবেদনায় পুড়ে যেতে যেতে তিনি আবারো বলেন, “হলদে পাতাগুলোকে বৃক্ষ তলে ঝড়ে পড়তে দেখি/ দেখি, সবুজগুলো কেমন বুড়িয়ে যাচ্ছে/ যতদূর চোখ যায়, তোমাকে খুঁজি/ তুমি কোথাও নেই।”আমরা দেখতে পাই একটি বিষয়গত দৃষ্টিকোণ থেকে কবি কিভাবে তাঁর শোক, আবেগের উপস্থাপন করেছেন কবিতাটিতে।

বিভিন্ন শৈল্পিক ধারায় এইচ বি রিতা তাঁর কবিতায় নিত্য জীবনের যে চিত্রকল্প  তৈরি করেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে, তার সবটুকুই অযৌক্তিক, কল্পনীয় এবং বিশ্বাসযোগ্য নয়। একই সময়ে তিনি তাঁর “আ্যান নুয়্যেন” কবিতায় লিপিবদ্ধ করেছেন অভিব্যক্তিবাদ এর একটি কেন্দ্রিক ধারা যেখানে তিনি একজন মৃত সহকর্মীর করুণ বিদায় যাত্রাকে খুব নিখুঁতভাবে উপলব্ধি দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন।একজন সার্থক লেখক/ কবিই পারেন কেবল সুক্ষ্ম বা গভীর যে কেন বিষয়বস্তু, ঘটনাকেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে।

লেখকঃ কবি ও  লেখক, কলকাতা, ভারত 

 

আরও পড়ুন-খালেদ জিয়ার বিদেশ চিকিৎসা

আরও পড়ুন