বেগম রোকেয়া ধর্মহীনা না ধর্মমনা?

শারমিন আকতার

ইংরেজিতে একটি কথা আছে- “Literature is the reflection of human experience.” অর্থাৎ “সাহিত্য হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ।” সাধারণ জ্ঞানে আমরা এটুকু জানি যে, কোন ব্যক্তির রুচিবোধ এবং চিন্তা-চেতনা যেমন তার কথাবার্তা এবং কাজকর্মও সাধারণত তেমনই হয়ে থাকে । তেমনি একজন লেখকের মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, দর্শন যেরকম হয়ে থাকে তার সেই ধ্যান-ধারণাও কিন্তু তার সৃষ্ট সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় । যেমন কোন লেখক যদি আস্তিক হয়ে থাকেন তাহলে তার সাহিত্যে কিন্তু স্রষ্টার প্রতি তার আস্থার প্রতিফলন ঘটে ।

তদ্রূপ কেউ যদি নাস্তিক হয়ে থাকেন তাহলে সেটাও কোন না কোন ভাবে তার সাহিত্যে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে । আস্তিক মানুষের সাহিত্যে কখনও নাস্তিকতার ভাব এবং নাস্তিক মানুষের সাহিত্যে কখনও স্রষ্টার গুণ কীর্তন ফুটে উঠে না । আর আস্তিক বা নাস্তিক যেই হউন না কেন তা যদি সুকৌশলে এড়িয়ে যান তা ভিন্ন কথা । তবে দুই এক লেখায় এড়িয়ে গেলেও সারা জীবনের সাহিত্য কর্মের কোথাও তার প্রতিফলন ঘটেনি এমন ঘটনা আছে বলে আমার জানা নেই ।

বেগম রোকেয়ার সময়ের মুসলিম সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাকে বিপরীত স্রোতে ভাসা মানুষ হিসাবে বিবেচনা করলেও আমাদের এই শিক্ষিত ও অগ্রসরমান সমাজে তাকে নিয়ে বেশ একটা অস্বচ্ছ ধারণার উপস্থিতি খেয়াল করা যায় । যারা ধর্ম মানেন না তারা তাকে তথাকথিত নারী স্বাধীনতা ও প্রগতির অগ্রপথিক হিসাবে শ্রদ্ধা করেন । অন্য দিকে আর এক শ্রেণীর লোক তাকে ধর্মদ্রোহী নারী ভাবেন ।

অবশ্য এর মাঝামাঝিও কিছু লোক আছে যারা বেগম রোকেয়াকে যৌক্তিক কারণে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন । বেগম রোকেয়া আসলে কেমন ছিলেন? সত্যিকার অর্থে ধর্ম মানতেন না ধর্ম বিরোধী ছিলেন? এ নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় । আসলে কেমন ছিলেন তিনি? এখানে তার জীবন ও সাহিত্যকর্ম থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে শুধু বিশ্লেষণ ধর্মী কিছু বক্তব্য রাখা হবে, পাঠক নিজেই বিচার বিশ্লেষণ করে নিবেন তিনি কেমন ছিলেন।

পর্দা প্রথার প্রতি বেগম রোকেয়ার দৃঢ় সমর্থন

নারীর সম্মান রক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ইসলামের পর্দার বিধানকে তিনি কখনওই খারাপ মনে করতেন না। তিনি নিজে পর্দা করতেন এবং পর্দার সপক্ষে কথা বলেছেন। বেগম রোকেয়া মূলত অতিরঞ্জিত অবরোধ প্রথার বিরোধী ছিলেন, সঠিক পর্দা প্রথার বিরোধী তিনি কখনই ছিলেন না । তার কথায় জানা যায় তিনি নিজেও সম্ভবত পর্দা করতেন বোরকা পরে । এমনকি বোরকা নামে একটি অসাধারণ প্রবন্ধই লিখেছেন । যেখানে তিনি পর্দা প্রথার গুণগান করেছেন সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে। তিনি তার বোরকা প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছেন-

“আমি অনেক বার শুনিয়াছি যে আমাদের “জঘন্য অবরোধ প্রথা” ই নাকি আমাদের উন্নতির অন্তরায় । উচ্চ শিক্ষা প্রাপ্ত ভগ্নীদের সহিত দেখা সাক্ষাৎ হইলে তাঁহরা প্রায়ই আমাকে “বোরকা” ছাড়িতে বলেন । বলি উন্নতি জিনিসটা আসলে কি? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয় তাহলে জেলেনী, চামারিনী, ডুমিনী, প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে ।” [বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (পৃষ্ঠাঃ ৫৯, রোকেয়া রচনাবলী)]

বোরকা বা পর্দা করাকে অনেকে পশ্চাদপদতা মনে করায় তিনি তারও জবাব দিয়েছেন সুন্দর যুক্তি দিয়ে । তিনি বলেছেন-

“পৃথিবীর অসভ্য জাতিরা অর্ধ- উলঙ্গ অবস্থায় থাকে । ইতিহাসে জানা যায়, পূর্বে অসভ্য বৃটেনরা অর্ধনগ্ন থাকিত । ঐ অর্ধনগ্ন অবস্থার পূর্বে গায়ে রঙ মাখিত । ক্রমে সভ্য হইয়া তাহারা পোশাক ব্যবহার করতে শিখিয়াছে ।” [বোরকা, মতিচুর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৫৯)]

বোরকাকে অনেকে বিরক্তিকর ভারি পোশাক হিসাবে অভিযোগ উত্থাপনের প্রেক্ষিতেও তিনি সুন্দর যুক্তি দাড় করিয়েছেন । তিনি বলেছেন –

“অনেকে বোরকাকে ভারি বলিয়া আপত্তি করেন । কিন্তু তুলনায় দেখা গিয়েছে ইংরাজ মহিলাদের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হ্যাট অপেক্ষা আমাদের বোরকা অধিক ভারি নহে ।” [বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৫৯)]

সত্যিকারের পর্দার মর্মার্থ বুঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন-

“পর্দা অর্থে তো আমরা বুঝি গোপন করা বা হওয়া, শরীর ঢাকা ইতযাদি-কেবল অন্তপুরের চারি- প্রাচীরের ভিতর থাকা নহে । এবং ভালমতে শরীর আবৃত না করাকেই ‘বে-পর্দা’ বলি । যাহারা ঘরের ভিতর সম্মুখে অর্ধ-নগ্ন অবস্থায় থাকেন, তাঁহাদের অপেক্ষা যাহারা ভালোমতো পোশাক পরিয়া মাঠে বাজারে বাহির হন, তাঁহাদের পর্দা বেশি রক্ষা পায় ।”
( বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৬০)]

“আমরা অন্যায় পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব। প্রয়োজন হইলে অবগুণ্ঠনসহ (বোরকা) মাঠে বেড়াইতে আমাদের আপত্তি নেই। স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য শৈলবিহারে বাহির হইলেও বোরকা সঙ্গে থাকিতে পারে। বোরকা পরিয়া চলাফেরায় কোনো অসুবিধা হয় না। তবে সে জন্য সামান্য রকমের একটু অভ্যাস চাই, বিনা অভ্যাসে কোন কাজ হয়? ” (বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৫৯-৬০)]

তিনি আরও বলেন- “শাস্ত্রে পর্দা সম্বন্ধে যতটুকু কঠোর ব্যবস্থা আছে, প্রচলিত পর্দা প্রথা তদপেক্ষাও কঠোর। যাহা হউক কেবল শাস্ত্র মানিয়া চলিলে অধিক অসুবিধা ভোগ করিতে হয় না। আমার বিবেচনায় প্রকৃত পর্দা সে-ই রক্ষা করে, যে সমস্ত মানব জাতিকে সহোদর ও সহোদরার ন্যায় জ্ঞান করে।” [কূপমণ্ডুকের হিমালয় দর্শন, অগ্রন্থিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৩৪১)]

সভ্যতার সাথে যে পর্দা প্রথার কোন বিরোধ নেই তাও তিনি বলেছেন তার “বোরকা” প্রবন্ধে । তিনি বলেছেন-
“ আজিকালি যে সকল ভগ্নী নগ্নপদে বেড়াইয়া থাকেন, তাঁহাদের আত্বীয়া সুশিক্ষিতা (enlightened) ভগ্নীগণ সভ্যতার পরিচায়ক মোজা জুতার ভিতর পদযুগল আবৃত করেন । ক্রমে হাত ঢাকিবার জন্য দস্তানার সৃষ্টি হইয়াছে । তবেই দেখা যাই সভ্যতার সহিত অবরোধ প্রথার কোন বিরোধ নেই । ” [বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৬১)]

আধুনিকতার নামে পর্দা প্রথাকে ছুঁড়ে ফেলে নিজেদেরকে অনেক উন্নত নারী হিসাবে বিবেচনা করার অসারতা তিনি তুলে ধরেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে । তিনি বলেছেন- “বর্তমান যুগে ইউরোপীয় রমণীগণ সভ্যতার চরম সীমায় উঠিয়াছেন । তাঁহাদের পর্দা নাই কে বলে? তাঁহাদের শয়ন কক্ষে, এমনকি বসিবার ঘরেও কেহ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করেন না । এ প্রথা কি দোষণীয় ? অবশ্যই নহে । কিন্তু এদেশের যে ভগ্নীরা বিলাতী সভ্যতার অনুকরণ করিতে যাইয়া পর্দা ছাড়িয়াছেন, তাঁহাদের না আছে ইউরোপীয়দের মত শয়নকক্ষের স্বাতন্ত্র্য (Bedroom Privacy) না আছে আমাদের মত বোরকা ! ” [বোরকা, মতিচুর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৬০)]

তিনি এ ব্যাপারের আরও বলেছেন- “এখন পার্সী মহিলাদের পর্দামোচন হইয়াছে সত্য, কিন্তু মানসিক দাসত্ব মোচন হইয়াছে কি? অবশ্যই হয় নাই । আর ঐ যে পর্দা ছাড়িয়াছেন, তাহা দ্বারা তাদের স্বকীয় বুদ্ধি বিবেচনার ত কোন পরিচয় পাওয়া যায় না । পার্সী পুরুষগণ কেবল অন্ধভাবে বিলাতী সভ্যতা অনুকরণ করিতে যাইয়া স্ত্রীদিগকে পর্দার বাহিরে আনিয়াছেন । ইহাতে অবলাদের জীবনীশক্তির ত কিছু পরিবর্তন পাওয়া যায় না ।- তাঁহারা যে জড়পদার্থ, সেই জড়পদার্থই আছেন । পুরুষ যখন তাহাদেরকে অন্তঃপুরে রাখিতেন তাঁহারা তখন সেখানেই থাকিতেন। আবার পুরুষ যখন তাঁহাদের “নাকে দড়ি” ধরিয়া টানিয়া তাঁহাদিগকে মাঠে বাহির করিয়াছেন, তখনই তাঁহারা পর্দার বাহিরে হইয়াছে! ইহাতে রমণীকূলের বাহদুরী কি? ঐরূপ পর্দা-বিরোধ কখনও প্রশংসনীয় নহে ।” [অর্ধাঙ্গী, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৪৩)]

বোরকা প্রবন্ধের শেষে তিনি এভাবে ইতি টেনে বলেছেন- “যাহা হউক। পর্দা কিন্তু শিক্ষার পথে কাঁটা হইয়া দাঁড়ায় নাই । এখন আমাদের শিক্ষয়িত্রীর অভাব । এই অভাবটি পূরণ হইলে এবং স্বতন্ত্র স্কুল কলেজ হইলে যথাবিধি পর্দা রক্ষা করিয়াও উচ্চশিক্ষা লাভ হইতে পারে । প্রয়োজনীয় পর্দা কম করিয়া কোন মুসলমানই বোধ হয় শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রসর হইবেন না । আশা করি, এখন আমাদের উচ্চশিক্ষা-প্রাপ্তা ভগিনীগণ বুঝিতে পারিয়াছেন যে বোরকা মোটের উপর মন্দ নহে ।” [বোরকা, মতিচূর, প্রথম খণ্ড (রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৬৩)]

পর্দাকে বেগম রোকেয়া নারীর অনগ্রসরতা নয় বরং একে নারীর উন্নয়নের প্রতীক হিসাবে দেখেছেন । তিনি নিজেও পর্দা মেনে চলতেন বলে আমরা জানতে পারি তার বিভিন্ন লেখনি  ও তাকে নিয়ে প্রকাশিত নানা গবেষণা গ্রন্থের মাধ্যমে । তাহলে যিনি ইসলামের বিধানকে শুধু মেনেই নেননি বরং সেটার প্রশংসা করেছেন যৌক্তিকতা উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি কীভাবে ধর্মহীন হতে পারেন ?

(চলবে)

লেখকঃ সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন