কারো মা বা স্ত্রীর পরিচয়ের আগে আসে নিজের পরিচয়

উম্মে সালমা কলি 

কয়েকজন বান্ধবী বহুদিন পর সুযোগ পেলেন আড্ডা দেবার। সংসারের চাপে সুযোগই হয় না আড্ডা দেবার আপনার। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, আড্ডার জন্য আপনার কাছে স্বামী, বাচ্চা আর শ্বশুড়বাড়ি ছাড়া আর কোনো টপিক নেই। কি অদ্ভুত না? আপনি খুঁজেই পাচ্ছেন না আর কিছু, যা নিয়ে কথা বলা যায়। আপনার জগৎ আটকে আছে একবৃত্তে। আপনিও কি এই দলে?

আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীর জীবন যেন আটকে থাকে স্বামী আর সন্তানের গল্প নিয়ে। তাদের ধ্যান জ্ঞান সব এখানেই আবর্তিত হয়। এদের স্বপ্ন থাকে না, স্বাধীন ভাবনা থাকে না। সংসারের বাইরে এক পা ফেলতে পারে না। এরা পাঁচ মিনিটও স্বামী/সন্তান/সংসার ছাড়া অন্য বিষয়ে কথা বলতে পারে না। কিছু কিছু মেয়ের সারাদিন স্বামী নিয়ে আদিখ্যেতা দেখে প্রশ্ন জাগে, তাদের স্বামীপ্রবর কি বন্ধুমহলে গিয়ে এভাবেই স্ত্রী নিয়ে আদিখ্যেতা করে?

বাচ্চা নিয়ে অবসেশন, সেতো আরো মারাত্মক। সবটুকু জীবনীশক্তি এরা ঢালে বাচ্চাকে খাওয়াতে আর পারফেক্ট (তাদের চোখে) সন্তান গড়তে। এরা কোথাও ঘুরতে যায় না, বাচ্চার পড়ার ক্ষতি হবে তাই। আশেপাশের ভাবিদের কথা শুনে শুনে বাচ্চার পড়ার রুটিন বানায়, খাবারের চার্ট বানায়। বাচ্চা একটু বেগড়বাই করেছে তো দমাদম পিটুনি। নিজের কথা ভাবার সময় নেই এদের। সন্তানকে স্বাধীনতা দিতেও রাজি নয় এই মায়েরা। এরাই বয়স হলে, ছেলে বিয়ে করে বউকে ভালোবাসলে আর সহ্য করতে পারে না, ইন্সিকিউরিটিতে ভোগে। ভাবে, হাত হতে বেরিয়ে গেল সন্তান।

কিছু মেয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়িকে যেই সেবা করে বা মানে, তার ১০০ ভাগের একভাগ সেবাও নিজের মা বাবার করে না। আমি শশুর-শাশুড়ির সেবা করাটাকে কখনো খারাপ বলছি না । কিন্তু আমি মনে করি, এটা কেবলমাত্র সমাজের চোখে ভালো বউ হওয়ার প্রানান্তকর চেষ্টা মাত্র!  মন থেকে ভালো মেয়ে হবার ইচ্ছা আছে বলে মনে হয় না ।

এরকম মেয়েরা ভেবেই নেয়, মা বাবা তো করবেই। এটা তাদের দায়িত্ব। পরিচিত একজনের কথা বলি। মেয়েটার মা বাবার খুব একটা সামর্থ্য নেই, কিন্তু শ্বশুড়বাড়িতে ভালোই জাঁকজমক। মুখরা শ্বাশুড়ির মন পেতে ওর কি আপ্রান চেষ্টা। এদিকে মায়ের বাসায় আসলে প্রতিবেলায় মাংস না পেলে চিৎকার ও অশান্তি করে বাড়ি মাথায় তোলে। স্বামীটি ভালোই, ওর খরচের টাকা দিয়ে দেয় যে কদিন মায়ের বাসায় থাকবে। কিন্তু ওই মেয়ে একটাকা খরচ করে কোনোদিন মা বাবার জন্য কিছু কেনে না, পাড়ার মোড়ের সিংগাড়াও নয়।

মেয়েদের এই স্বামী /সন্তান /সংসারের বাইরেও একটা জীবন দরকার। কবিতা লিখতে ভালোবাসেন? লিখুন কবিতা। ছবি আঁকুন, গল্প লিখুন, সেলাই করুন, নিজের পছন্দের কিছু রান্না করুন (স্বামী বা সন্তানের পছন্দেরই খাবার সব সময় হতে হবে এমন নয়), গান গাইতে ভালোবাসলে সেটা করুন। ঘুরতে যান, বৃষ্টিতে ভিজুন, জোছনা দেখুন, খোলা আকাশের নিচে বুক ভরে শ্বাস নিন। পুরোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিন । সেই আড্ডায় নিজের কথাই বলুন। নিজের যে একটা স্বত্বা আছে তা ভুলে যাবেন না। কারো মা বা কারো স্ত্রীর পরিচয়ের আগে আসে আপনার নিজের পরিচয়, যা একান্তই আপনি। নিজের সেই পরিচয় শেষ বয়সে গিয়ে আপনাকে সংগ দেবে, একা হতে দেবে না।

নিজেকে ভুলে যাবেন না। দেখবেন তখন সবকিছুই ভালো লাগছে। স্ট্রেস , অকারণ রাগ, অন্যের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা সবই কমে আসবে। জীবনটাকে অনেক আনন্দময় মনে হবে। Until you value yourself, you won’t value your time. Until you value your time, you will not do anything with it.

লেখকঃ প্রবাসী লেখক, টরেন্টো, কানাডা 

আরও পড়ুন