মেনোপজ

 

রেণু আক্তার সরকারি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে অধ্যায়নরত অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।রেণুর যখন পিরিয়ড শুরু হয়,তখন থেকে তার পিরিয়ড ছিল অনিয়মিত। যতদিন দিন যেতে থাকে রেণুর এ সমস্যা বাড়তে থাকে।স্থানীয়ভাবে অনেক চিকিৎসা করেও রেণুর এ সমস্যার কোন সমাধান হয়নি।

আটমাস যাবত রেণুর পিরিয়ড বন্ধ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা শারিরীকও মানসিক সমস্যা। এরমধ্যে অন্যতম হলো হটফ্লাশ অর্থাৎ হঠাৎ করে গরম লাগতে থাকার অনুভূতি।এ লক্ষণ ক্রমাগত বাড়তেই থাকল।

এবার রেণু বাধ্য হয়েই একজন গাইনি মহিলা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। ডাক্তার রেণুর সব কথা শুনে কিছু ঔষধ লিখে দেয় এবং একমাস পর দেখা করতে বলে।তবে অন্যকোন সমস্যা হলে তা জানাতে বলে।

রেণুর ঔষধ গ্রহণের একমাস শেষ হয়।এইএক মাসে হটফ্লাশ কিছুটা কম থাকলেও তার পিরিয়ড বন্ধই রয়ে যায়।

সে আবার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে যায়।ডাক্তার তাকে কিছু টেস্ট দেয় এবং পরেরদিন রিপোর্টসহ আসার জন্য বলে।

পরেরদিন রেণু রিপোর্টসহ ডাক্তারের কাছে যায়।

ডাক্তার রেণুর রিপোর্ট দেখে,তাকে বলে দেখ মানুষের অনেক কঠিন রোগ হয়,যেমন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।তুমি মনে কর তোমার ভাগ্যভালো সেরকম কিছু হয়নি।তাছাড়া খারাপ কিছু ঘটার আগে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তারপরও ভাগ্যে যা থাকে তা মানুষকে মেনে নিতে হয়।

আমার মনে হয় তোমার মেনোপজ হয়ে গেছে।মেনোপজ একটি সাধারণ শারিরীক প্রক্রিয়া। সাধারণভাবে পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সে নারীদের পিরিয়ড বন্ধ হয়ে আসার ঘটনা ঘটে।

তবে পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিশ বছরের কম বয়স্ক নারীদের প্রতি দশহাজার জনএর মধ্যে মাএ একজনের এরকম সমস্যা হয়ে থাকে।

আর দুর্ভাগ্যবশত তুমি সেই দশহাজারের মধ্যে একজন। তবে নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে তুমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারো। আর সৃষ্টিকর্তা চাইলে এর ব্যতিক্রম ও ঘটতে পারে।

রেনু জানতে চায় এর চিকিৎসা কি?
ডাক্তার বলে
নারীদের শরিরে মেনোপজ আসার পিছনে মূল কারণ হচ্ছে ওয়েোস্ট্রোজেন নামের একটি হরমোন। কিন্তু বয়স হতে থাকলে নারীদের শরীরে ওয়েস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদন কমে যেতে থাকে। এই হরমোনই
প্রজননের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

তাই বয়স হতে থাকলে নারীদের ডিম্বাশয়ে ডিম্বের পরিমাণ ও কমতে থাকে। আর সেজন্য পিরিয়ড এর পরিমাণ ও কমতে থাকে।

এর ফলে নারীর শরীরে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মেনোপজ এর পর শরিরে অদ্ভুত সব আচরণ শুরু হয়। যেমন
আকস্মিকভাবে আগুনের উল্কার মতন শরীরে গরম অনুভূত হয়, রাতের বেলা ঘাম হয়, ঘুম হয়না,দুঃশ্চিন্তা হয়, মন মরা ভাব থাকে এবং যৌনতায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
এছাড়া মূত্রথলিতে সমস্যা হয়।
আর ওয়োস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদন যখন শরীরে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় তখন এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে নারীদের হাড়ও হৃদপিন্ডের উপর।

তবে মেনোপজ হলে যদি নিচের বিষয়গুলো নারীরা মেনে চলে তবে সুস্বাস্থ্য পাওয়া সম্ভব। যেমন

ব্যালেন্সড ডায়েট বা ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাওয়া। চর্বিযুক্ত খাবার না খাওয়া। হৃদপিণ্ড ও হাড়কে সুরক্ষা দিতে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। দুশ্চিন্তা চাপ হৃদরোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা।
রেণুর মনে হল সে যদি চিৎকার করে কাদতে পাারত।তাহলে কিছুটা হালকা লাগতো। কেনো আমার সঙ্গে এমন হলো?
ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে তার।দেহে ওয়োস্ট্রোজেন উৎপাদন কমে গেছে।এই হরমোনের অভাব পূরণকরার জন্য সে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ( এইচআরটি) নেয়।
তাকে প্রতিদিন একটি করে বড়ি খেতে হয়।কোন কারণে একদিন বড়ি না খেলেই তার হটফ্লাশ শুরু হয়ে যায়।
ধীরে ধীরে রেনু স্বাভাবিক হয়। সে চিকিৎসার পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যায়।লেখাপড়া শেষে সে পিটি আাইএর ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুর করে।

চোখের সামনে অনেকের সুখের সংসার দেখে রেণুর চোখদুটো অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।কিন্তুু পরক্ষণেই সে ভাবে,সে ভালোভাবে বেচে আছে এটাই বা কম কিসে? সব কিছু থেকেও এপৃথিবীর বুকে কত নারী পুরুষ সংসারের সুখথেকে বঞ্চিত হয়।সবার ভাগ্যে সব সুখ থাকে না।আমি না হয় সংসার ও মাতৃত্বের সুখ থেকে বঞ্চিতই থাকলাম।

লেখকঃ তাজ রহমান, কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন